কামরুল ইসলাম হৃদয়, চট্টগ্রাম (দিনাজপুর২৪.কম) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পা রাখলেই কানে ভেসে আসে রোহিঙ্গাদের আর্তনাদ। চিকিৎসাধীন রোহিঙ্গাদের ব্যথা-বেদনার কান্না-চিৎকারে ভারী হয়ে আছে পুরো হাসপাতালের পরিবেশ। কেউ পায়ে গুলিবিদ্ধ, কেউ পেটে, কারো এক পা নেই, কারো হাত নেই, কারো মুখ মাথা শরীর বোমার আঘাতে ঝলসানো। সব মিলিয়ে এক বিবর্ণ পরিবেশ পুরো হাসপাতাল জুড়ে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এখন চিকিৎসাধীন রয়েছেন নানাভাবে গুরুতর আহত ৮৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক। চিকিৎসাধীন এসব রোহিঙ্গা নাগরিকের কারো সঙ্গী আছে, কারো সঙ্গে কেউ নেই। কেউ সন্তান, স্বামী কিংবা অন্য স্বজন হারিয়ে নিজে আহত হয়ে এখানে চিকিৎসার জন্য আসতে সক্ষম হয়েছেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও রোগির সঙ্গে থাকা রোহিঙ্গা স্বজন কিংবা অন্য কেউ আনুসাঙ্গিক অন্যান্য খরচের জন্য আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। আসলে বিভিন্ন জনের সহায়তার ওপরই নির্ভর করছেন বিপদে পড়া এসব রোহিঙ্গারা। এ অবস্থায় চিকিৎসাধীন ৮৩ রোহিঙ্গার পাশে দাঁড়িয়েছেন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী কলেজিয়েট স্কুলের ৮৫ তম ব্যাচের ছাত্র-ছাত্রীরা। শনিবার দুপুরে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন এসব রোহিঙ্গাদের হাতে নগদ তিন হাজার টাকা করে মোট দুই লাখ ৪৯ হাজার টাকা তুলে দিয়েছেন তারা। কলেজিয়েট স্কুলের ৮৫ তম ব্যাচের ছাত্র ডা. আনম মিনহাজুর রহমানের নেতৃত্বে এই আর্থিক সহায়তা প্রদানকালে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডা. সমর বড়য়া, মো. জাহেদুল হক, আসিবুল হকসহ ওই ব্যাচের প্রাক্তন ছাত্ররা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জালাল উদ্দিন জানান, বর্তমানে ৮৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক চিকিৎসাধীন রয়েছে। হাসপাতালের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া এসব রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন সংগঠন নানাভাবে আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে। এই অর্থ আহত রোহিঙ্গাদের আনুসাঙ্গিক ব্যয় লাঘবে তাদেরই হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। কলেজিয়েট স্কুলের ৮৫ তম ব্যাচের ছাত্র এবং বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘কক্সবাজারের কুতুপালং-এ শরণার্থী ক্যাম্পেও আমরা একটি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছি। সেখানে কমপক্ষে এক হাজার রোহিঙ্গা নাগরিককে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের মধ্যে বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করা হবে।’ চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসাধীন আজিজা বেগম (২৫) জানান, গুলিবিদ্ধ হয়ে সে ও তার স্বামী গত এক সপ্তাহ ধরে চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার ৪টি সন্তানের মধ্যে ৮ বছর বয়সী আনোয়ার নামের একটি সন্তানকে মিয়ানমারের মংডুতে মগরা গলা কেটে হত্যা করেছে। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিন সন্তান ও স্বামীসহ তিনি বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। হাসিনা (১৮) নামের আর এক রোহিঙ্গা তরুণী পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে এখন চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি আছেন। তার স্বজনরা কে কোথায় আছে তা তিনি বলতে পারেন না। আদৌ তারা কেউ বেঁচে আছেন কি-না, তাও হাসিনার জানা নেই। হাসপাতালের চিকিৎসাধীন রোহিঙ্গাদের করুণ আর্তনাদ দেখলে সবার চোখেই পানি আসে। হাসপাতালে সুস্থ হওয়ার পর এসব রোহিঙ্গাদের পুলিশের মাধ্যমে শরণার্থী ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন।