(দিনাজপুর২৪.কম) রেলওয়ের টেলিকম নেটওয়ার্ক নিয়ে একরকম হরিলুট চালাচ্ছে দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন। এ খাত থেকে বছরে সরকারের হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। বিটিআরসি সূত্রমতে, যেখানে ফাইবার অপটিক প্রতি মিটারে সরকার অনুমোদিত লিজ রেট ২ টাকা, সেখানে গ্রামীণফোন রেলওয়েকে ফাইবার লিজ বাবদ দিচ্ছে মাত্র ৬৮ পয়সা।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, তারা গত বছরের ডিসেম্বরে এনটিটিএন (ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক) লাইসেন্স পেয়েছে। তাই গ্রামীণফোনকে সরকারের অনুমোদিত রেটেই ভাড়া দিতে হবে। কিন্তু অপারেটরটি তাদের ২০২৬ সাল পর্যন্ত চুক্তির দোহাই দিয়ে রেলওয়েকে মাত্র ৬৮ পয়সা রেটে ফাইবার অপটিকের ভাড়া পরিশোধ করছে।
বিটিআরসি বলছে, এনটিটিএন লাইসেন্স পাওয়ার পর গ্রামীণফোনের সঙ্গে রেলওয়ের পুরনো চুক্তি বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা। কারণ এটা কমন নেটওয়ার্ক। রেলওয়েকে এ লাইন সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে।
সূত্র জানায়, গ্রামীণফোনের চেয়ে আরও বেশি দামে এয়ারটেলসহ বেশ কয়েকটি টেলিকম অপারেটর এ নেটওয়ার্ক ভাড়া নিতে চেয়েছিল। কিন্তু রেলওয়ের একটি সিন্ডিকেট তা দেয়নি। গ্রামীণফোন এ নেটওয়ার্ক লিজ নিয়ে বছরে রেলওয়েকে ১০৬ কোটি টাকা রাজস্ব দিচ্ছে। অপরদিকে তারা এটা ব্যবহার করে আয় করছে বছরে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। একই সঙ্গে দেশব্যাপী বাংলাদেশ রেলওয়ের সব স্টেশন, স্থাপনা, অফিস, টেলিফোন, এয়ারকন্ডিশন ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছে। টেলিকম আইন অনুযায়ী গ্রামীণফোনের কোনো ধরনের ট্রান্সমিশন ব্যবসা করার সুযোগ নেই। কিন্তু তারা অবৈধভাবে এ ফাইবার অপটিক্যাল লাইন ব্যবহার করে চুটিয়ে ট্রান্সমিশন ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন আইএসপির কাছে (ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার) এসটিএম ভাড়া দিচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে গ্রামীণফোনের হেড অব এক্সটারনাল কমিউনিকেশনস তালাত কামাল জানান, তারা বৈধভাবে রেলওয়ের সঙ্গে চুক্তি করে এ ব্যবসা করছে। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি। সরকার ও রেলওয়েরও কোনো আপত্তি নেই। আইনেরও কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। বছরে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর তথ্যটি সঠিক নয়। এ পরিমাণ টাকার ব্যবসাও নেই এ সেক্টরে।
এদিকে রেলওয়ে সূত্র জানায়, ফাইবার লে আউটের বিধান লংঘন করেছে গ্রামীণফোন। একই সঙ্গে অনুমতি ছাড়াই গ্রামীণফোন রেলওয়ের ৬ কোরের ফাইবার ফেলে দিয়ে ৪৮ কোরের ফাইবার লে আউট করেছে। সেখান থেকে তারা মোটা অংকের টাকায় তৃতীয় পক্ষের কাছে ফাইবারের ক্যাপাসিটি বিক্রি করছে। এটা সম্পূর্ণ অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অভিযোগ রয়েছে, রেলওয়ের কাছ থেকে যাতে এ ফাইবার অপটিক্যাল লাইন অন্য কেউ নিতে না পারে সে জন্য গ্রামীণফোন রেলওয়ের ২৪৫ জন স্টাফের মাসিক বেতন-ভাতাসহ সব ধরনের আনুষঙ্গিক খরচ বহন করে যাচ্ছে। যার কারণে কেউ এ নিয়ে মুখ খুলছে না।
বিটিআরসির আইন অনুযায়ী কোনো মোবাইল ফোন অপারেটর ফাইবার লে আউট করতে পারে না। যদি কেউ করে তাহলে তাদের টেলিকম লাইসেন্স বাতিল করার ক্ষমতা রাখে সরকার। কিন্তু অদৃশ্য শক্তির ইশারায় ও রহস্যজনক কারণে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে সরকার ও রেলওয়ের কেউ কোনো অ্যাকশনে যাচ্ছে না।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় বলছে, লাইসেন্স সরকারি প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু ব্যবসা করছে গ্রামীণফোন। এটা অপরাধ ও অবৈধ। রাষ্ট্রের বিনিয়োগের ‘সর’ খাচ্ছে বিদেশী মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন। এরপরও রহস্যজনক কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের ২ হাজার ৭শ’ কিলোমিটারের বেশি দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান অপটিক্যাল ফাইবারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখন গ্রামীণফোনের হাতে। আর রেলওয়ের এ ফাইবার ব্যবহার করে বছরে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে গ্রামীণফোন।
সরকারের এক অডিট অধিদফতরের হিসাবে বছরে একটি খাতে ৫০ কোটি টাকার রাজস্ব খেয়ে ফেলছে গ্রামীণফোন। জমি লিজ নেয়ার ক্ষেত্রে গ্রামীণফোন অনিয়ম করে এ রাজস্ব নিয়ে যাচ্ছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুসারে গ্রামীণফোন তাদের টাওয়ার বসানোর জন্য রেলওয়ে খুলনা অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ জমি লিজ নেয়। এ জমি থেকেই সরকার ৫০ কোটি টাকা হারাচ্ছে। ২০০৭ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বছরে এ পরিমাণ টাকা সরকারের কোষাগারে ঢুকছে না। অথচ আইন অনুযায়ী পাওয়ার কথা।
এখন পুরো রেলওয়েকে গিলে খাওয়ার টার্গেট নিয়েছে অপারেটরটি। নিজেরা ফাইবার অপটিক, ই ওয়ান, এসটিএম ব্যবসা করছে সরকারের অনুমতি ছাড়া। উপরন্তু রেলওয়ের প্রাপ্ত এনটিটিএন লাইসেন্স নিয়ে এখন পুরো রেলওয়ের এ সেক্টরকে নিয়ন্ত্রণে নেয়ার ফাঁদ পেতেছে।
এ বিষয়ে রেলওয়ে বলছে, রেলওয়ের অপারেশন ফাইবার সম্পর্কে তাদের কাছেই বর্তমানে কোনো তথ্য নেই। গ্রামীণফোন সবই নিজের হাতে আটকে রেখেছে।
সম্প্রতি বিটিআরসিতে ফাইবার ম্যাপিং সংক্রান্ত এক বৈঠকে রেলওয়ের অতিরিক্ত চিফ সিগন্যাল ইঞ্জিনিয়ার আবদুল্লাহ আল বাকী বলেন, তারা আসলে জানেন না তাদের কতটুকু ফাইবার গ্রামীণফোন ব্যবহার করছে আর বর্তমানে এর সঠিক অবস্থানই বা কোন পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে কীভাবে এ চুক্তি হয়েছে, চুক্তির শর্ত কি, কত বছরের জন্য চুক্তি হয়েছে গ্রামীণফোন এর কিছুই তাদের জানাচ্ছে না। গ্রামীণফোন নানা কৌশলে রেলওয়ের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীকে হাত করে অপটিক্যাল ফাইবার সংক্রান্ত চুক্তির সব কাগজপত্র নিয়ে গেছে। এ কারণে তারা গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে আইনানুগ কোনো ব্যবস্থাও নিতে পারছে না। এ কর্মকর্তা আরও জানান, গ্রামীণফোন নামকাওয়াস্তে লিজ নিয়ে রেলওয়ের ফাইবার ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে তারা রেলওয়ের ফাইবার ও সিগন্যাল কোরেও তাদের অধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। এ খাতেও তারা গোপনে চুটিয়ে ব্যসা করছে বলে অভিযোগ আছে। তিনি পুরো বিষয়টি নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল দিয়ে তদন্ত করানোরও দাবি জানান বিটিআরসির কাছে। তার দাবি এতে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসবে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বর্তমানে গ্রামীণফোনে দেশী-বিদেশী নামিদামি অনেক প্রকৌশলী কাজ করছেন। তারা এখন এটা-সেটা বুঝিয়ে রেলওয়ের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা নিজেদের হাতের মুঠোয় নিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বিটিআরসির বৈঠকে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বৈঠকে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানকে এভাবে জিম্মি করে শত শত কোটি টাকার ব্যবসা করছে গ্রামীণফোন। অথচ বিটিআরসি ও মন্ত্রণালয় এ সম্পর্কে অবগত হলেও ব্যবস্থা নিচ্ছে না। গত বছরের ২০ নভেম্বর বিটিআরসি রেলওয়েকে এনটিটিএন সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে লাইসেন্স দিয়েছিল। এপর মার্চ ও এপ্রিলে এ নিয়ে একাধিক সভায় গ্রামীণফোনের কাছ থেকে রেলওয়ের এ ফাইবার চুক্তি বাতিল করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু একপর্যায়ে সেটা আবার চুপসে যাচ্ছে। সূত্র-যুগান্তর