(দিনাজপুর২৪.কম) বাগেরহাটের সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের চাঁদপাইরেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের পঁচিশ নম্বর কম্পার্টমেন্টের তুলাতলা এলাকায় লাগা আগুন আজ তৃতীয় দিনেও নেভাতে পারেনি বনবিভাগ ও ফায়ার সার্ভিস। ওই এলাকার বিভিন্ন স্থানে এখনো ধোঁয়ার কুন্ডলী পাকিয়ে আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে।  ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এলাকাটি দূর্গম হওয়ায় এবং পানির সুব্যবস্থা না থাকায় সবাইকে আগুন নেভাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই আগুন পুরোপুরি কখন নেভানো যাবে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। তবে সুন্দরবনে লাগা আগুন এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রনের মধ্যে রয়েছে বলে দাবী করেছে বন বিভাগ।  এদিকে সুন্দরবনে আগুন লাগার কারনে শুক্রবার সকাল থেকে গোট পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ জুড়ে জেলে, বাওয়ালী, মৌয়ালদের পাশ পারমিট দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে বন বিভাগ। তবে বিদেশী পর্যটকরা অনুমতি নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারবেন।

এর আগে বৃহষ্পতিবার শুধুমাত্র চাঁদপাই রেঞ্জে সকল ধরনের পাশ পারমিট বন্ধ করে দেয়া হয়। এর একদিন পরই গোটা পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ জুড়ে এই নির্দেশ দেয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে না আসা পর্যন্ত জেলে বাওয়ালী, মেীয়াল ও সাধারন মানুষের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ন নিষিদ্ধ করে রেড এলার্ড জারি করেছে। এ দুটি রেঞ্জ জুড়ে টহল দিচ্ছে র‌্যাব ও কোস্টগার্ড সদস্যরা।

শুক্রবার দুপুরে বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মো. জহির উদ্দিন আহমেদ নাশকতার আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘটনাস্থল পরিদর্শনে করেছেন।

প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) মো. ইউনুছ আলী বলেন, এ সব অপরাধীদের বিষয়ে বন অধিদপ্তর জিরো টলারেন্স দেখাবে। ইতিমধ্যে তিন জন বনকর্মীকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। যাদের অবহেলায় সুন্দরবনে নাশকতা হচ্ছে সেসব বিভাগীয় কর্মীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সকল বিভাগের সাথে যোগাযোগ রাখছি। সুন্দরবন সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে কোন দ্বিধা করা হবে না।

বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মো. জহির উদ্দিন আহমেদ এই প্রতিবেদককে বলেন, দফায় দফায় সুন্দরবনে আগুন লাগার কারনে সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগের দুটি রেঞ্জ শরণখোলা এবং চাঁদপাইয়ে সব ধরনের পাশ পারমিট বন্ধ করে রেড এলার্ড জারি করা হয়েছে। তবে বিদেশ থেকে আসা পর্যটকরা সুন্দরবনে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন। সুন্দরবনের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে না আসা পর্যন্ত জেলে বাওয়ালী, মেীয়াল ও সাধারন মানুষের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বর্তমানে যারা পাশ পারমিট নিয়ে সুন্দরবনে অবস্থান করছে তাদের দ্রুত সুন্দরবন থেকে বের হয়ে যাওয়ার র্নিদেশ দেয়া হয়েছে।

তদন্তের পাশাপাশি জিপিএস সিষ্টেমের মাধ্যমে ধরিয়ে দেয়া আগুনে পুড়ে যাওয়া এলাকাসহ ক্ষয়ক্ষতির পরিমান নিরুপনের কাজ চলছে বলেও এই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনে এবারে দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনের ধরনটা একটু ভিন্ন। এই দুর্বৃত্তরা তুলাতলা এলাকার কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত ২০ টি স্থানে আগুন দিয়েছে। যা আমাদের সনাক্ত করতে সময় লেগেছে। যার কারনে আগুন নিভাতে সময় লাগছে। আগুন নিয়ন্ত্রনের মধ্যে রয়েছে। তবে, এখনই ফায়ার সার্ভিসকে সুন্দরবন থেকে সরিয়ে নেয়া হবে না। তারা সুন্দরবন বিভাগের সঙ্গে আগুন লাগার এলাকায় থেকে পর্যবেক্ষণ করবে। তবে ফায়ার সার্ভিসকে কয় দিন সুন্দরবনে থাকবে তা তিনি নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি।

বাগেরহাট ফায়ার সার্ভিসের উপ সহকারী পরিচালক মানিকুজ্জামান মানিক বলেন, বুধবার সন্ধ্যা থেকে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট বিরতিহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ঘটনাস্থলের দুই কিলোমিটার দূর থেকে আমরা পানি এনে আগুন নেভানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। দমকল কর্মীরা প্রখর তাপদাহে অসুস্থ্য হয়ে পড়ছে। এজন্য খুলনা ফায়ার সার্ভিস থেকে ১২ জনের একটি দল শুক্রবার সকালে সুন্দরবনে এসে কাজে যোগ দিয়েছে। তাছাড়া তীব্র বাতাসের কারনে আগুন নেভানোর কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় এখনো ধোঁয়ার কুন্ডলী পাকিয়ে আগুন জ্বলে উঠছে। একারনে যেখানে আমরা ধোঁয়া দেখছি সেখানেই পানি ছিটাচ্ছি। পুরোপুরি আগুন কখন নিভাতে পারবো তা বলতে পারছি না।

এদিকে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সেভ দ্যা সুন্দরবন ফাউন্ডেশন’র চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম সুন্দরবনে আগুন লাগার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সুন্দরবনে বারবার আগুন লাগার ঘটনা প্রমাণ হয়েছে সরকারসহ সংশ্লিষ্টরা সুন্দরবন সুরক্ষায় মোটেও আন্তরিক নয়। সুন্দরবনে শুধু অগ্নিকাণ্ডই নয়, প্রতিনিয়ত বিষ দিয়ে মাছ ধরা, বাঘ-হরিণ শিকার ও গাছ পাচারসহ নানা ধরণের অপরাধমুলক কর্মকাণ্ড চলছে যার অধিকাংশই দৃশ্যমান নয়। বন সন্নিহিত লোকালয় শরণখোলা ও মোড়েলগঞ্জের শাসকদলের কতিপয় জনপ্রতিনিধি এবং তাদের আশ্রিত দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, সুন্দরবন রক্ষায় বনে অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ করা প্রয়োজন। বর্তমানে বন জুড়ে যা হচ্ছে সবই অবৈধ, বেআইনি ও পরিকল্পিত। তাই এই বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন সুরক্ষয়া সরকারকেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সুন্দবন সন্নিহিত পাঁচ জেলার সাংবাদিকদের সংগঠন ‘সুন্দরবন সাংবাদিক ফোরাম’ এর আহবায়ক মো. মনিরুজ্জামান নসিম আলী ও সদস্য সচিব শেখ আহসানুল করিম সুন্দরবনে বার বার অগ্নিকান্ডে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে তারা বলেন, সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে লোক চলাচল ও বনের সব ধরণের সম্পদ আহরণ বন্ধ করাসহ এসব দুস্কর্মের সাথে জড়িত সব পক্ষকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই বাঁচবে সুন্দরবন।

উল্লেখ্য, এর আগে চলতি বছরের ২৮ মার্চ বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের নাংলী এলাকায় লাগা আগুনে প্রায় দেড় একর  এবং ১২ ও ১৮ এপ্রিল লাগা আরো দুটি নাশকতার আগুনে পুড়ে যায় সুন্দরবনের ১০ একর বনভূমি। ১২ ও ১৮ এপ্রিল এ দুটি নাশকতার আগুনের ঘটনায় শরনখোলা উপজেলার রায়েন্দা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শাহজাহান হাওলাদার ওরফে শাহজাহান শিকারীসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের ১১ নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করে সুন্দরবন বিভাগ পরিকল্পিত আগুন ধরিয়ে দেয়ার অভিযোগে পৃথক দু’টি মামলা দায়ের করেন। মামলা হলেও শরণখোলা থানা পুলিশ আওয়ামী লীগের ওই ১১ নেতা-কর্মীর একজনকেও এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করতে পারেনি। -ডেস্ক