(দিনাজপুর২৪.কম) বাংলা ছবির নায়কদের মধ্যে যার ফ্যাশন, স্টাইল তরুণরা অনুসরণ করেন এখনো যিনি ১৯৯০-এর দশকে চলচ্চিত্রে অন্যতম জননন্দিত শিল্পী অভিনেতা মডেল জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ। তার ২২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে লিখেছেন-জিয়া উল ইসলাম

পরিবারের বড় ছেলে সালমান। বাংলাদেশি বাংলা ছবির প্রায় ৫০ বছরের ইতিহাসে সেই প্রাচীন আমলে রহমান, নায়করাজ রাজ্জাক এবং জাফর ইকবাল এর পর সালমানই একমাত্র নায়ক যিনি সর্বমহলে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে এবং তরুণদের স্টাইল আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন। বাংলা ছবির নায়কদের মধ্যে সালমান ছাড়া অন্য কারো ফ্যাশন, স্টাইল তরুণরা সেইভাবে অনুসরণ করেনি। সকল শ্রেণির লোকজন নায়ক হিসেবে সালমানকে বরণ করে নিয়েছিল। সেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে অভিনেতা ও মডেল সালমান শাহ ১৯৭১ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের সিলেট জেলায় অবস্থিত জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন, এবং তার রাশি ছিল বৃৃশ্চিক। তার পিতা কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মাতা নীলা চৌধুরী। তিনি পরিবারের বড় ছেলে। যদিও তার জন্মনাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন, কিন্তু চলচ্চিত্রে তিনি সবার কাছে সালমান শাহ বলেই পরিচিত ছিলেন। সালমান শাহ ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার অধিকারী ছিলেন।

খুলনায় সালমান-মৌসুমী সহপাঠী ছিলেন:
সালমান পড়াশুনা করেন খুলনার বয়রা মডেল হাইস্কুলে। একই স্কুলে চিত্রনায়িকা মৌসুমী তার সহপাঠী ছিলেন। ১৯৮৭ সালে তিনি ঢাকার ধানমন্ডি আরব মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও ধানমন্ডির মালেকা সায়েন্স কলেজ থেকে বিকম পাস করেন।

খালার বান্ধবীর মেয়েকে বিয়ে করেন:
সালমান শাহ ১২ আগস্ট ১৯৯২ তাঁর খালার বান্ধবীর মেয়ে সামিরা হককে বিয়ে করেন। সামিরা হক ছিলেন একজন বিউটি পার্লার ব্যবসায়ী। তিনি সালমানের ২টি চলচ্চিত্রে তার পোশাক পরিকল্পনাকারী হিসেবে কাজ করেন।

যেভাবে মিডিয়ায় সালমান:
১৯৮৫-৮৬ সালের দিকে হানিফ সংকেতের গ্রন্থনায় কথার কথা নামে একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান প্রচারিত হত। এর কোন একটি পর্বে ‘নামটি ছিল তার অপূর্ব’ নামের একটি গানের মিউজিক ভিডিও পরিবেশিত হয়। হানিফের সংকেতের স্বকন্ঠে গাওয়া এই গান এবং মিউজিক ভিডিও দুটোই অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত। একজন সম্ভাবনাময় সদ্য তরুন তার পরিবারের নানারকমের ঝামেলার কারনে মাদকাসক্ত হয়ে মারা যায়, এই ছিল গানটার থিম। গানের প্রধান চরিত্র অপূর্বর ভূমিকায় অভিনয়ের মাধ্যমেই সালমান শাহ মিডিয়াতে প্রথম আলোচিত হন। তখন অবশ্য তিনি ইমন নামেই পরিচিত ছিলেন। মিউজিক ভিডিওটি জনপ্রিয়তা পেলেও নিয়মিত টিভিতে না আসার কারনে দর্শক আস্তে আস্তে ইমনকে ভুলে যায়। আরও কয়েক বছর পর অবশ্য তিনি আব্দুল্লাহ আল মামুনের প্রযোজনায় পাথর সময় নাটকে একটি ছোট চরিত্রে এবং কয়েকটি বিজ্ঞাপনচিত্রেও কাজ করেছিলেন। সালমান ১৯৮৫ সালে বিটিভির আকাশ ছোঁয়া নাটক দিয়ে অভিনয়ের যাত্রা শুরু করেন। পরে দেয়াল (১৯৮৫), সব পাখি ঘরে ফিরে (১৯৮৫), সৈকতে সারস (১৯৮৮), নয়ন (১৯৯৫), স্বপ্নের পৃথিবী (১৯৯৬) নাটকে অভিনয করেন। নয়ন নাটকটি সে বছর শ্রেষ্ঠ একক নাটক হিসেবে বাচসাস পুরস্কার লাভ করে। এছাড়া তিনি ১৯৯০ সালে মঈনুল আহসান সাবের রচিত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত পাথর সময ও ১৯৯৪ সালে ইতিকথা ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের হাত ধরে সালমান শাহ চলচ্চিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পান। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আনন্দ মেলা তিনটি হিন্দি ছবি ‘সনম বেওয়াফা’ ‘দিল’ ও ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ এর কপিরাইট নিয়ে সোহানুর রহমান সোহানের কাছে আসে এর যে কোন একটির বাংলা পুনঃনির্মাণ করার জন্য কিন্তু তিনি উক্ত ছবিগুলোর জন্য উপযুক্ত নায়ক-নায়িকা খুঁজে না পেয়ে সম্পূর্ণ নতুন মুখ দিয়ে ছবি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। নায়িকা হিসেবে মৌসুমীকে নির্বাচিত করলেও নায়ক খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তখন নায়ক আলমগীরের সাবেক স্ত্রী খোশনুর আলমগীর ‘ইমন’ নামে একটি ছেলের সন্ধান দেন। প্রথম দেখাতেই তাকে পছন্দ করে ফেলেন পরিচালক এবং সনম বেওয়াফা ছবির জন্য প্রস্তাব দেন, কিন্তু যখন ইমন ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ ছবির কথা জানতে পারেন তখন তিনি উক্ত ছবিতে অভিনয়ের জন্য পীড়াপীড়ি করেন। তার কাছে কেয়ামত সে কেয়ামত তক ছবি এতই প্রিয় ছিলো যে তিনি মোট ২৬ বার ছবিটি দেখেছেন বলে পরিচালক কে জানান। শেষ পর্যন্ত পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান তাঁকে নিয়ে কেয়ামত থেকে কেয়ামত চলচ্চিত্রটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন এবং ইমন নাম পরিবর্তন করে সালমান শাহ রাখা হয়। পরে মৌসুমীর বিপরীতে তিনি আরও তিনটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ছবি তিনটি হল অন্তরে অন্তরে (১৯৯৪), স্নেহ (১৯৯৪) ও দেনমোহর (১৯৯৫)। শিবলী সাদিক পরিচালিত অন্তরে অন্তরে হিন্দি চলচ্চিত্র আও পেয়ার করের আনঅফিসিয়াল রিমেক, স্নেহ পরিচালনা করেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার ও শফি বিক্রমপুরী পরিচালিত দেনমোহর হিন্দি চলচ্চিত্র সনম বেওয়াফার অফিসিয়াল রিমেক। তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র জহিরুল হক ও তমিজউদ্দিন রিজভী পরিচালিত তুমি আমার চলচ্চিত্রটি ব্যবসাসফল হয়। পরিচালক জহিরুল হক চলচ্চিত্রটির কিছু অংশ নির্মাণ করার পর মারা যান। পরে তমিজউদ্দিন রিজভী বাকি কাজ শেষ করেন। এই চলচ্চিত্রে প্রথমবারের মত তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেন শাবনূর। পরে তার সাথে জুটি বেধে একে একে সুজন সখি (১৯৯৪), বিক্ষোভ (১৯৯৪), স্বপ্নের ঠিকানা (১৯৯৪), মহামিলন (১৯৯৫), বিচার হবে (১৯৯৬), তোমাকে চাই (১৯৯৬), স্বপ্নের পৃথিবী (১৯৯৬), জীবন সংসার (১৯৯৬), চাওয়া থেকে পাওয়া (১৯৯৬), প্রেম পিয়াসী (১৯৯৭), স্বপ্নের নায়ক (১৯৯৭), আনন্দ অশ্রু (১৯৯৭), বুকের ভিতর আগুন (১৯৯৭) সহ মোট ১৪টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। সবকটি ছবি ব্যবসাসফল হয়। সালমান শাহ ২৭টি চলচ্চিত্র অভিনয় করেন তার মধ্যে মধ্যে ১৪টিতেই সালমানের নায়িকা ছিলেন শাবনুর।

২২ বছরেও অজানা সালমানের মৃত্যুরহস্য …
দিনটি ছিল শুক্রবার ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে রাজধানীর নিউ ইস্কাটন গার্ডেন এলাকায় ভাড়া বাসায় পাওয়া যায় অভিনেতা সালমান শাহর লাশ। বাংলা সিনেমায় তার জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি তখন মধ্যগগনে। সালমান শাহ স্ত্রী সামিরা হক পুলিশকে জানান, সকালবেলা ড্রেসিংরুমে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় সালমানের দেহ তারা শনাক্ত করে দেহটি নামিয়ে আনেন। সালমান শাহকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সালমানের বাবা কমর উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী রমনা থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেন। ২০০২ সালে মারা যান সালমান শাহর বাবা।
এদিকে সালমানের মা নীলা চৌধুরীর বর্ণনা ছিল এ রকম, ‘দারোয়ান বলেন, স্যার এখন তো ওপরে যেতে পারবেন না। কিছু প্রবলেম আছে। আগে ম্যাডামকে (সালমানের স্ত্রীকে) জিজ্ঞেস করতে হবে। এক পর্যায়ে তিনি (সালমানের বাবা) জোর করে ওপরে গেছেন। কলিং বেল দেওয়ার পর দরজা খুলল সামিরা (সালমানের স্ত্রী)। সালমানের বাবা সামিরাকে বললেন, ইমনের সঙ্গে কাজ আছে, ইনকাম ট্যাক্সের সই করাতে হবে। ওকে ডাকো। তখন সামিরা বলল, আব্বা ও ঘুমাচ্ছে। সালমানের বাবা তখন বললেন, আমি তা হলে বেডরুমে গিয়ে সই করিয়ে আনি। কিন্তু সালমানের বাবাকে সেখানে যেতে দেওয়া হয়নি। তিনি প্রায় দেড় ঘণ্টা সেখানে বসে ছিলেন।’ বেলা ১১টার দিকে একটি ফোন আসে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর বাসায়। ঐ টেলিফোনে বলা হলো, সালমানকে দেখতে হলে তখনই যেতে হবে। টেলিফোন পেয়ে নীলা চৌধুরী দ্রুত ছেলের বাসার দিকে রওনা হয়েছিলেন। বাসায় গিয়ে ছেলেকে বিছানার ওপর দেখতে পান তিনি। নীলা চৌধুরীর ভাষ্য, ‘খাটের মধ্যে যেদিকে মাথা দেওয়ার কথা, সেদিকে পা। আর যেদিকে পা দেওয়ার কথা, সেদিকে মাথা। পাশেই সামিরার এক আত্মীয়ের একটি পার্লার ছিল। সে পার্লারের কিছু মেয়ে সালমানের হাতে-পায়ে শর্ষের তেল দিচ্ছে। আমি তো ভাবছি ফিট হয়ে গেছে। হঠাৎ দেখতে পেলাম আমার ছেলের হাত-পায়ের নখগুলো নীল। তখন আমি সালমানের বাবাকে বলি, আমার ছেলে তো মরে যাচ্ছে।’ ইস্কাটনের বাসা থেকে সালমান শাহকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানকার ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করে। এর পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে বলা হয় সালমান আত্মহত্যা করেছেন। সালমানের মৃত্যুর দিনই অনেকটা পরিবারের অজান্তে সালমানের বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরীর স্বাক্ষর নিয়ে রমনা থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করে পুলিশ। সেই মামলার তদন্ত চলছিল। এর মধ্যে ১৯৯৭ সালে রিজভি আহমেদ নামের একজন অন্য এক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে আদালতে জবানবন্দিতে স্বীকার করেন, সালমান শাহকে হত্যা করে আত্মহত্যার ঘটনা সাজানো হয়েছে এবং তিনি (রিজভি) নিজেও সেই হত্যায় জড়িত ছিলেন। সালমানের বাবা কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে আদালতে নালিশি হত্যা মামলা করেন। আদালত দুটি অভিযোগ একসঙ্গে তদন্তের নির্দেশ দেন।
কখন হয়েছে সালমানের মৃত্যু! মা নীলা চৌধুরী বলেন, কমরউদ্দিন ঘটনার দিন সালমানের সঙ্গে দেখা করতে গেলেও তাঁকে দেখা করতে না দেওয়া অত্যন্ত সন্দেহজনক। এ নিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক বাদল খন্দকার (যিনি ওই দিন সালমানের বাসায় গিয়েছিলেন) বলেন, ছবির কাজের শিডিউল নিতে তিনি সকালে সেখানে গেলে বাসার নিচে দারোয়ানেরা তখন বলাবলি করছিল, সালমান রাতেই ফাঁস দিয়ে মারা গেছেন। এরপর সালমানের বাসায় গিয়ে তিনি দেখেন, ড্রেসিংরুমে সালমানের মরদেহ পড়ে আছে। সালমানের বাবা-মাকে এ খবর দেওয়া হয়নি জানতে পেরে তিনি সেলিম নামের চলচ্চিত্রের একজন প্রডাকশন ম্যানেজারকে সালমানের বাসায় খবর দিতে বলেন। সালমানের তখনকার সহকারী আবুল হোসেন খান বলেন, ওই দিন শুক্রবার বেলা ১১টায় ঘুম থেকে উঠে পানি ও চা পান করে ড্রেসিংরুমে ঢোকেন সালমান। পরে সালমান জুমার নামাজ পড়তে যাবেন কি না তা জানার জন্য ওই রুমের দরজায় টোকা দিয়ে আবুল হোসেন বুঝতে পারেন, দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। পরে সালমানের স্ত্রী সামিরা চাবি দিয়ে দরজা খুলে দেখতে পান, সালমানের দেহ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে। রশি কেটে তার দেহ নামানো হয়। সালমানের বাসার লিফটম্যান আবদুস সালাম বলেন, ‘ইস্কাটন প্লাজার এই বাসায় ২৯ বছর ধরে কাজ করছি। ঘটনার দিন সকালে শুনতে পারি, সালমান ভাই আত্মহত্যা করেছেন। এর বেশি কিছু আমি জানি না।’ মামলায় যা বলা হয় অপমৃত্যুর ওই মামলায় বলা হয়েছে, ঘটনার দিন সকাল সাড়ে নয়টার দিকে গ্রীনরোডের নিজ বাসা থেকে ইস্কাটনে সালমানের ভাড়া বাসায় ছেলের সঙ্গে দেখা করতে আসেন কমর উদ্দিন। সালমানের ব্যক্তিগত সহকারী আবুল ও তাঁর স্ত্রী সামিরা তাদের বলেন, ‘সালমান রাত জেগে কাজ করেছে। এখন তাকে ঘুম থেকে ডাকা যাবে না।’ তিনি প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে বাসায় ফিরে আসেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সেলিম নামের একজন ফোন করে জানান, সালমানের কী যেন হয়েছে। সালমানের বাবা, মা ও ভাই ওই ফ্ল্যাটে ছুটে যান। গিয়ে শয়নকক্ষে সালমানের নিথর দেহ দেখতে পান তারা।

রহস্যজনক মৃত্যুবরণ:
তিনি ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অকালে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন এবং তাকে সিলেটে সমাহিত করা হয়। -ডেস্ক