(দিনাজপুর২৪.কম) বেশি মুনাফার আশায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত আসছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বৈঠকে প্রস্তাব পাঠানো হবে। আগামী সপ্তাহে পরিচালনা পর্ষদের এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সংশ্লিষ্ট এক সূত্র থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বড় একটি অংশ বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখা হয়। আর কিছু অংশ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে। বর্তমানে ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে বিভিন্ন দায় পরিশোধের জন্য চলতি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের একটি অংশ রাখা হয়েছে। কিন্তু ওইসব দেশে চাহিদা কম থাকায় এ থেকে মুনাফার হার ১ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। আর চলতি হিসেবের মুনাফা ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে।

এ দিকে বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কটের কারণে স্থানীয় ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী তহবিল জোগান দিতে পারছে না। চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সমন্বয় না হওয়ায় বর্তমানে প্রতিটি ব্যাংকেরই চরম অর্থসঙ্কট চলছে। এ অবস্থায় টাকার সঙ্কট মেটাতে ব্যয় কমানো এক দিকে যেমন উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ শুরু করেছে, অপর দিকে বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে হাত পাতছে। বাংলাদেশ ব্যাংক টাকার মান ধরে রাখতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করছে। এক সময় সব শ্রেণীর ব্যাংকগুলোর কাছেই ডলার বিক্রি করা হতো। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বেড়ে যাওয়ায় এখন শুধু অত্যাবশ্যকীয় পণ্য যেমন, জ্বালানি তেল, এলএনজি আমদানির দায় মেটাতে সঙ্কটে পড়া ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা সঙ্কট মেটাতে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। স্থানীয় মুদ্রায় উচ্চ সুদের নাকাল থেকে বাঁচতে বেসরকারি উদ্যোক্তারা আবার ঝুঁকে পড়েছেন বিদেশী ঋণের দিকে। লাইবরের (লন্ডন ইন্টার ব্যাংক রেট) সাথে অতিরিক্ত চার শতাংশ দিলেই মিলছে বিদেশী ঋণ। ফলে বিদেশী ঋণের সুদ পড়ছে সাড়ে ৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিদেশী ঋণের সুদ আপাত দৃষ্টিতে সস্তা মনে হলেও ডলার টাকার বিনিময় হারের হিসাব করলে কার্যকর সুদহার অনেক বেড়ে যাচ্ছে। সেই সাথে দেশের ওপর বাড়ছে সুদসহ বিদেশী ঋণের দায়। প্রতি বছর মুনাফা হিসেবে কোটি কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, বেসরকারি পর্যায়ে বৈদেশিক ঋণ বেড়ে যাওয়ায় দায় বাড়ছে দেশের ওপর। কারণ, এসব ঋণ হলো সরবরাহ ঋণ, যা হার্ড লোন হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ এ ঋণের সুদ নির্ধারণ হয় বাজার রেটে। এ কারণে এসব ঋণের সুদ তুলনামূলকভাবে বেশি। আবার এসব ঋণ নেয়া হয় বিদেশী মুদ্রায়, পরিশোধও করা হয় বিদেশী মুদ্রায়। সুতরাং এসব ঋণ বেশি হলে দেশের ওপর চাপ বাড়ে। এ কারণে এসব ঋণ সীমার মধ্যে রাখাটাই দেশের জন্য ভালো।

প্রসঙ্গত, অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট হলো, স্থানীয় ব্যাংকগুলো যার মাধ্যমে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় আমানত সংগ্রহ করে। পরে তা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মূলধনী যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রায় দায় পরিশোধ করে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিদেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ বিনিয়োগ করে মুনাফা কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক শতাংশের নিচে পাওয়া যাচ্ছে। আবার চলতি হিসাবের মুনাফা ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের মাধ্যমে রিজার্ভ থেকে বিনিয়োগ করলে এক দিকে যেমন বেশি মুনাফা পাওয়া যাবে; অপর দিকে, বৈদেশিক মুদ্রায় যে পরিমাণ মুনাফা বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করতে হতো এখন তা আর করতে হবে না। বরং দেশের মুনাফা দেশেই থেকে যাবে। এসব বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের যে অংশটুকু বিদেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে কম মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে তা প্রত্যাহার করে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিনিয়োগ করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যবসায়ী বা শিল্পগ্রুপকে সরাসরি বিনিয়োগ করবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটকে বিনিয়োগ করবে। অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট তাদের মনোনীত ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঋণ দেবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যবসায়ী বা শিল্পগ্রুপ ঋণ পরিশোধ না করলে তার দায় বাংলাদেশ ব্যাংক নেবে না। এর দায় নেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক। ঋণ আদায়ের সময় পার হয়ে গেলেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার অ্যাকাউন্ট থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক তা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কেটে নেবে। সুতরাং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করলে কোনো প্রকার ঝুঁকির মুখে পড়বে না বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। তবে সবকিছু নির্ভর করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের ওপর। এ বিষয়ে পর্ষদ ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিলেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে। আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে এ প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে বলে ওই সূত্র জানিয়েছে। -ডেস্ক