(দিনাজপুর২৪.কম) আজ রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পঞ্চম বার্ষিকী। সেই ট্র্যাজেডির পোশাক শ্রমিকরা সুবিচার পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। সাভারের রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩০ জন শ্রমিক নিহত হন। ওই ঘটনায় যারা এখনো বেঁচে আছেন, তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অপরদিকে রাজধানীর জুরাইনে বেওয়ারিশ ব্যক্তিদের লাশের ডিএনএ করা হলেও এখনো অনেকের পরিবারকে সনাক্ত করা যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ফলে প্রকৃত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ অন্যরা ভোগ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শ্রমিকদের নিরাপত্তা, ট্রেড ইউনিয়ন, মজুরি ও ভবন নির্মাণ বিষয়ে যথাযথ আইন ও উদ্যোগের অভাবে পোশাক খাতের নিরাপত্তা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের এক গবেষণায় এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গবেষণা ও বিশ্লেষণপত্র তুলে ধরে অ্যাকশনএইড। গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর প্রতি বছরের মতো এবারও পরিস্থিতি তুলে ধরতে দুর্ঘটনার শিকার জীবিত ২০০ শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে এই গবেষণাপত্র তৈরি করেছে। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, জীবিত শ্রমিকদের মধ্যে ১২ শতাংশের শারীরিক অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর ২২ শতাংশ শ্রমিক এখনো মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। গবেষণায় ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ শ্রমিক এখনো কোনো কাজ করতে পারছেন না। আর ২১ দশমিক ৬ শতাংশ শ্রমিক পোশাক কারখানায় আবারো যুক্ত হতে পেরেছেন।
রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর ধ্বংসস্তূপ আর মৃতদেহের চাপায় ১০ ঘণ্টা আটকে ছিল নিলুফার বেগমের পা। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু এখনো তিনি সুবিচারের আশায় একপ্রকার যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছেন। আর সেই ট্র্যাজেডির রানা প্লাজার ঘটনা বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহতম বলে বার্তা সংস্থা এএফপি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। রানা প্লাজার কারখানায় তৈরি হতো পশ্চিমা নামকরা সব ব্র্যান্ডের পোশাক। শ্রমিকদের দেওয়া হতো কম মজুরি। সেই সব কিছু উপেক্ষা করে বেঁচে থাকা শ্রমিকরা সুবিচারের আশা করছেন। আর রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। কিন্তু আদালতে এ মামলার ধীরগতির কারণে ট্র্যাজেডির বার্ষিকীতে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাভারের রানা প্লাজা ধসে আহত পোশাক শ্রমিকের ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ এখনো বেকারত্ব জীবনযাপন করছেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে কোনো কাজ করতে পারছেন না। আর ৫১ দশমিক ৩ শতাংশ আহত শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাদের মধ্যে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ পোশাক কারখানায়, ২১ দশমিক ৬ শতাংশ দিনমজুরি, ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ ছোট ব্যবসা, ৭ দশমিক ৮ শতাংশ গৃহকর্মীর কাজ করেন। তারা আহত শ্রমিকদের পরিবারের ৬০ দশমিক ৬ শতাংশের মাসিক আয় ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। সাড়ে ৪ শতাংশের মাসিক আয় ৫ হাজার টাকার নিচে। ১০ হাজার টাকার ওপরে আয় করেন মাত্র ১৪ দশমিক ১ শতাংশ শ্রমিক। আর ২০ হাজার টাকার ওপরে আয় আছে সাড়ে ৪ শতাংশের। আহত শ্রমিকদের ১২ শতাংশের শারীরিক অবস্থা এখনো খুব খারাপ। ঘটনার দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও অনেকেই মাথাব্যথা, হাত-পা ব্যথা, পিঠব্যথার মতো সমস্যায় ভুগছেন। সাড়ে ৭০ শতাংশ শ্রমিকের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল নয়। বাকি সাড়ে ১৭ শতাংশ শ্রমিক পুরোপুরি সুস্থ। এছাড়া সাড়ে ১৪ শতাংশ আহত শ্রমিক এখনো ট্রমায় ভুগছেন
শ্রমিক নেতা বাহারানে সুলতান বাহার জানান, ২৫৬ জন বেওয়ারিশ ব্যক্তির লাশের পরিবারকে এখনো সনাক্ত যায়নি।
আর আহত শ্রমিকরা বাসাবাড়িতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অধিকাংশ শ্রমিক ও তাদের পরিবার ক্ষতিপূরণ পেলেও তা অনেক কম পেয়েছেন। তিনি আরও বলেন, সাভারের রানা প্লাজার ঘটনার সময় সাভারের এনাম মেডিকেলে খুলনার এক কৃষক অন্য ঘটনায় আহত হয়ে ভর্তি ছিলেন। পরে সরকারি-বেসরকারি এবং বিদেশি বিভিন্ন দাতা সংস্থা তার নাম রানা প্লাজায় আহত বলে নথিভুক্ত করেন। এরপর তাকে বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়। এখন পর্যন্ত মোট ১৭ লাখ টাকা সহযোগিতা পেয়েছেন বলে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। ওই নেতা আরও বলেন, প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের কোথাও কোনো পোশাক কারখানায় এক সঙ্গে এত ব্যক্তির প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
এই ঘটনার পঞ্চম বর্ষ হলেও এখনো একটি বিচার হয়নি। আর এ ঘটনায় প্রতি বছর ২৪ এপ্রিল শোক দিবস ঘোষণার দাবি জানান তিনি। আর রানা প্লাজার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে সেখানে পোশাক শ্রমিকদের জন্য একটি হাসপাতাল করার দাবি জানান তিনি। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি থেকে বেঁচে গেছেন নিলুফার বেগম। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল নিলুফার ডান পায়ের ওপর পড়ে ছিল তিনটি মৃতদেহ আর ধ্বংসস্তূপ। এ জন্য তিনি সেখানে আটকা পড়েছিলেন। তাকে উদ্ধার করার পর অপারেশন করা হয়েছে। তিনি ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩ হাজার ৫০০ ডলার পেয়েছেন। কিন্তু অপারেশনে তার ব্যয় হয়েছে তার দ্বিগুণ টাকা। ফলে তিনি আত্মীয়স্বজন ও বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার কাছ থেকে ঋণ করেছেন। রানা প্লাজা ধ্বংসস্তূপের কাছেই একটি মুদি দোকান চালান তিনি। এখন তিনি মৃত্যুর প্রহর গুনছেন বলে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন।
জানা গেছে, রানা প্লাজা ৯তলাবিশিষ্ট ভবন ছিল। সেখানে ২০০০-র বেশি শ্রমিক আহত হয়েছিলেন। আহতদের সকলের একই অবস্থা। এ্যাকশনএইড বাংলাদেশের মতে, আহতদের বেশিরভাগই ক্ষতিপূরণ হিসেবে যে অর্থ পেয়েছেন তার পুরোটাই খরচ করেছেন চিকিৎসা করাতে। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্ষোভ দেখা দেয়। পাইমার্ক, ম্যাঙ্গো ও বেনেটনের মতো ইউরোপিয়ান ও মার্কিন পোশাকের ব্র্যান্ডগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। আর বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি ও তাদের কর্মপরিবেশ উন্নত করার জন্য চাপ রয়েছে। বাংলাদেশে নিয়োজিত রয়েছেন প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। তাদের মাসিক বেতন ৬৫ ডলার থেকে শুরু। আর এই বেতন বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন বলে শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেছেন। আর যেসব গ্রুপ কারখানার নিরাপত্তা আধুনিকায়ন দেখাশোনা করে তারা বলেছে, বাংলাদেশের গার্মেন্ট কারখানাগুলোর মান উন্নত হয়েছে। গত বছর ২০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এটি সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন এমন সংখ্যা। এখনো ইউরোপিয়ান শতাধিক ব্র্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করে এমন একটি গ্রুপ সতর্কতা উচ্চারণ করেছে। আর এখনো ৪ হাজার ৫০০ জন পোশাকশিল্পে বড় ধরনের জীবনের প্রতি হুমকির মধ্যে রয়েছেন। শুধু তাই নয়, এ খাতে ঝুঁকি বিদ্যমান রয়েছে।
আরেক সূত্র জানায়, রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা ও অভিযুক্ত অন্য ৪০ জনের বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। দুদকের মামলায় ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ প্রকাশে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৭ সালের আগস্টে সোহেল রানাকে তিন বছরের জেল দেওয়া হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে হত্যামামলাও করা হয়েছে। মামলার প্রসিকিউটরগণ বলেছেন, রায় ঘোষণা হতে আরও পাঁচ বছর লাগতে পারে। আর এখন পর্যন্ত কোনো সাক্ষী তার সাক্ষ্য দেননি। আবার অনেক সাক্ষীর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা বলেছেন, যে ধীরগতিতে মামলা চলছে তাতে দায়মুক্তির একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। শ্রমিক অধিকার আদায়ের নেতা মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেছেন, কোনো প্রতিবাদ বিক্ষোভের আভাস পেলেই কারখানা মালিকরা স্থানীয় গু-া, পুলিশদের ব্যবহার করে। আর সরকার চালায় দমন-পীড়ন। গত ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বেশি বেতনের দাবিতে শ্রমিকরা যখন আন্দোলন করছিলেন তখন মোহাম্মদ ইব্রাহিমসহ ৪১ নেতাকে আটক করা হয়েছিল। পুলিশ তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। আর আন্দোলন করায় ১ হাজার ৭০০ শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়নের সভাপতি ড. ওয়াজেদুল ইসলাম এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান করতে হলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। শ্রমিকদের ইউনিয়ন কার্যত নেই। যাও আছে শুধু লোক দেখানোর জন্য।’ -ডেস্ক