(দিনাজপুর২৪.কম) অনেকে মুক্তিযুদ্ধ না করেও জায়গা করে নিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায়। আবার অনেক স্বীকৃত রাজাকারও মুক্তিযোদ্ধাদের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। এসব অভিযোগ বেশ পুরোনো। তবে এবার ঘটলো ঠিক উল্টো ঘটনা। মুক্তিযোদ্ধাদের ঠাঁই হলো রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের তালিকায়। শুধু তাই নয়, গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা, বেশ কয়েকজন সুপরিচিত মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ঢুকে পড়েছেন সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রীর প্রকাশিত স্বাধীনতা বিরোধীদের এ তালিকায়। তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌশলীকে। এ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক, দেশজুড়ে বইছে সমালোচনার ঝড়।

কেউ কেউ ক্ষোভ ঝাড়ছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে এ তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এ ব্যাপারে আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত ছিলো। যাচাই-বাছাইয়ের দরকার ছিলো।

রোবাবার প্রকাশিত রাজাকারের এ তালিকায় ঠাঁই হয়েছে ভাষা সৈনিক মিহির লাল দত্তের। প্রয়াত ভাষা সৈনিক ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মিহির লাল দত্তের নামও রয়েছে বরিশাল বিভাগের ২২নং পাতার ৯৪ নম্বরে। বরিশালের সুপরিচিত সাংবাদিক মিহির লাল দত্ত একাধারে কবি, নাট্যকার, গীতিকার, ছোট গল্পকার ও ভাষাবিদ ছিলেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। পিতা জিতেন্দ্র লাল দত্ত এবং মেজো ভাই সুবীর দত্ত পান্থ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। রাজাকারের তালিকায় পিতার নাম আসায় মিহির লাল দত্তের ছেলে শুভব্রত দত্ত ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, তার বাবা একজন ভাষা সৈনিক এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। তার মুক্তিযোদ্ধা গেজেট নং- ২৮৯ ২১/০৫/২০০৫ এবং মুক্তিবার্তা নং- ০৬০১০১১০৬০। রাজাকারের তালিকায় বাবার নাম তালিকাভুক্তি জাতির জন্য অপমানের বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাজাকারের তালিকায় রয়েছেন বরিশালের ৬ নারীও। তারা হলেন, বরিশাল নগরীর ঊষা রানী চক্রবর্তী (সিরিয়াল-৪৫), নগরীর ঝাউতলা এলাকার কনক প্রভা মজুমদার, উজিরপুরের বিজয়া বালা দাস, আভা রানী দাস, পারুল বালা কর্মকার ও বাবুগঞ্জের দেহেরগতি এলাকার রাবিয়া বেগম। এদের মধ্যে ঊষা রানী চক্রবর্তী গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা তপন কুমার চক্রবর্তীর মা।

এ তালিকায় নিজের নাম দেখে বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বরিশালের মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট তপন চক্রবর্তী। তার মাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এ তালিকায়। তার মা একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী। মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে তালিকাভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে তাদের নাম নিয়ে এই বিভ্রান্তি তা তদন্তের দাবি জানান তিনি। এডভোকেট তপন চক্রবর্তীর মেয়ে বরিশাল বাসদের জেলা  সেক্রেটারি ডা. মনীষা চক্রবর্তীর অভিযোগ, স্থানীয় রাজনীতির রোষানলের শিকার তারা।

তালিকায় বগুড়ার আদমদীঘি থানা এলাকার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, মুক্তিযোদ্ধা এবং আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্যসহ এক ডজনেরও বেশি আওয়ামী লীগ নেতাদের নাম রয়েছে। তালিকায় এসেছে বৃহত্তর আদমদীঘি থানা এলাকার মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ভাষা সৈনিক, যিনি ভারতের কামাড়পাড়াতে একটি মুক্তিযোদ্ধাদের টেনিং ক্যাম্প পরিচালনা করেছেন। ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নৌকা মনোনীত এমপি ও ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর সভাস্থলে অবস্থানকারী, ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদের নৌকা মার্কার মনোনীত এমপি। বঙ্গবন্ধুর গভর্নর প্রথা চালুকালে, বগুড়া ও জয়পুরহাট   জেলার গর্ভনর। ৭৫ পরবর্তী দুর্যোগকালীন সময়ে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। প্রায় ৩০ বছর আদমদীঘি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কছিম উদ্দীন আহম্মেদ, সাবেক এমএনএ মজিবর রহমান আক্কেলপুরি, এলাকার শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতা মৃত ফরেজ উদ্দীন মাস্টার, মৃত মজিবর রহমান মাস্টার, মৃত তাহের উদ্দীন মাস্টার, মৃত ডা. মহসিন আলী মল্লিক, মৃত হবিবর রহমান, মৃত নজিবর রহমান সরদার, মুক্তিযোদ্ধা আমিরুল ইসলামসহ আরও অনেকের নাম রয়েছে তালিকায়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি মজিবুল হক (নয়া ভাই) এর নাম রয়েছে রাজাকারের তালিকার ১৩৫ নম্বরে। পটুয়াখালী মহাকুমা সংগ্রাম পরিষদেরও সদস্য ছিলেন তিনি। পাথরঘাটা থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছাড়াও দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে (পাথরঘাটা-বামনা) সংসদীয় আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ২০০৭ সালে তিনি মারা যান।

তালিকায় রয়েছেন তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক রাজশাহীর এডভোকেট মহসিন আলী। নাম এসেছে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে পরিচিত এডভোকেট আবদুস সালামেরও। তাদের পরিবারের পাঁচজন মুক্তিযুদ্ধকালে শহীদ হন। ওই সময় আবদুস সালাম পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসরদের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন।

প্রকাশিত তালিকায় রাজশাহী বিভাগের কয়েকশ ব্যক্তির মধ্যে কয়েকজনের নাম এসেছে একাধিকবার। ৮৯ নম্বর তালিকায় (ক্রমিক নম্বর ৬০৬) নাম এসেছে পাঁচজনের- গোলাম আরিফ টিপু (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌশলী), মহসিন আলী, আবদুস সালাম, আবদুর রউফ ও এস এস আবু তালেবের।

এদিকে এ তালিকা নিয়ে বিতর্ক ওঠলেও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানান, আমরা নিজেরা কোনো তালিকা প্রস্তুত করিনি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা যে তালিকা করেছে, আমরা শুধু তা প্রকাশ করেছি। সেখানে কার নাম আছে, আর কার নাম নেই সেটা আমরা বলতে পারবো না। তবে আজ এক অনুষ্ঠান শেষে তিনি এ তালিকা প্রকাশের দায় নিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেন। এছাড়া ব্যাপকহারে অভিযোগ পেলে তালিকা প্রত্যাহারের চিন্তা করবেন বলেও জানান।

উল্লেখ্য, গত রোববার প্রথম ধাপে ১০ হাজার ৭৮৯ জন রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের তালিকা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্র ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অতীতের সংগ্রহ করা নথি পর্যালোচনা করে এ তালিকা প্রকাশ করা হয় বলে জানান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী। -সূত্র : মানব জমিন