(দিনাজপুর২৪.কম) মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নৃশংস নির্যাতন চলছে। শিশুদের শিরশ্ছেদ করা হচ্ছে। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। অন্যদের গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বাড়ির পর বাড়ি, গ্রামের পর গ্রাম। এমনই একটি ভিডিও প্রচার করেছে লন্ডনের অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট। এক মিনিট ৬ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে একটি বসতি। পরিষ্কার বোঝা যায় সেখানে বেশ কিছু পরিবারের বসতি ছিল। ভিডিও ধারনের সময়ও সেখানে আগুন জ্বলছিল। দূরে দেখা যায় অগ্নিকান্ডের ফলে সৃষ্ট কালো ধোয়া আকাশকে ঢেকে ফেলেছে। কালো আস্তরণ সৃষ্টি হয়েছে আকাশে। আর তা থেকে বাঁচতে লাইন দিয়ে মানুষ আশ্রয় খুঁজছে বাংলাদেশে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, সেখানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও আধা সামরিক বাহিনী গণহত্যা চালাচ্ছে। এরই মধ্যে রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন ৭০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা। এ অবস্থায় সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে তাতে মিয়ানমারের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে। তাই তিনি এই সহিংসতা বন্ধে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছেন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচির প্রতি। তার চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে গেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগান। তিনি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনেছেন। যারা এ অবস্থায় চোখ বন্ধ করে আছেন তাদেরকে তিনি দুষ্কর্মে সহায়তাকারী হিসেবে অভিহিত করেন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক মিয়ানমারের প্রতি সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই সহিংসতা বন্ধ না হলে মিয়ানমার ও পুরো অঞ্চলে এর প্রভাব পড়বে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলিমের দেশ ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোববার মিয়ানমার এসে পৌঁছেছেন। অং সান সুচি ও অন্যদের সঙ্গে তার বৈঠক করার কথা। ওদিকে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, রাখাইনে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছেই। সেনাবাহিনীর হিসাবেই কমপক্ষে ৪০০ উগ্রপন্থি রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। তবে তারা সবাই যে উগ্রপন্থি এমন প্রমাণ কোনো নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক দিতে পারেন নি। কারণ, তাদের কাউকেই ওই এলাকায় প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। ফলে সরকারি হিসাবে ৪০০ নিহতের কথা বলা হলেও ধারণা করা হয় নিহতের সংখ্যা অনেক বেশি। যেসব সাধারণ মানুষ ভয়াবহ সহিংসতা থেকে জীবন নিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছেন তারা ভয়াবহতার বর্ণনা দিচ্ছেন। তা শুনে গা শিউরে উঠবে যেকোনো মানুষের। তারা বলছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও অন্যান্য সশস্ত্র গ্রুপ রোহিঙ্গাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাচ্ছে। চুট পাইন গ্রামে ৫ ঘন্টা ধরে হামলা চালানো হয়েছে। সেখান থেকে বেঁচে পালিয়েছেন আবদুর রহমান (৪১) নামে একজন। তিনি দাতব্য সংস্থা ফোরটিফাই রাইটসকে বলেছেন, রোহিঙ্গা পুরুষদের বার বার অভিযান চালিয়ে আটক করা হয়েছিল। তাদেরকে বাঁশে তৈরি একটি ঘরের ভিতর আটকে রাখা হয়। এরপর তাতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে তারা উল্লাস করে। আবদুর রহমান বলেন, এভাবেই আমার এক ভাইকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। আগুন দেয়ার পর ওই ঘরের ভিতর থেকে শুধু বেরিয়ে এসেছে আর্তনাদ। আগুনের লেলিহান শিখা আর কান্না মিলেমিশে এক ভয়ঙ্কর অবস্থার সৃষ্টি হয়। এমন দৃশ্য কে সহ্য করতে পারে বলুন! একটি মাঠের ভিতর পরিবারের বাকিদের খুঁজে পাই। তাদের শরীরে বুলেটবিদ্ধ। কারো দেহ কেটে গেছে। আমার দুই ভাতিজার মাথা কেটে নেয়া হয়েছে। তাদের একজনের বয়স ৬ বছর। অন্যজন ৯ বছরের। আমার শ্যালিকাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। একই গ্রামের আরেকজন সুলতান আহমেদ (২৭)। তিনি বলেছেন, অনেক মানুষের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে। অনেকের দেহ কেটে টুকরো টুকরো করা হয়েছে। যখন এভাবে মানুষের মাথা দেহ থেকে কেটে নেয়া হচ্ছিল তখন আমরা পালিয়ে ছিলাম একটি ঘরে। এ দৃশ্য দেখেই আমরা ঘরের পিছন দিয়ে দৌড়াতে শুরু করি। অন্য গ্রামের জীবিতরাও বর্ণনা করেছেন একই রকমের সহিংসতার। তারাও বলেছেন, আমরা দেখেছি মানুষের মাথা কেটে নেয়া হচ্ছে। গলা কেটে দেয়া হচ্ছে। ফোরটিফাই রাইটসের প্রধান ম্যাথিউ স্মিথ বলেছেন, বেসামরিক মানুষদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে মিয়ানমার সরকার। এ অবস্থায় মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ওদিকে মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের স্যাটেলাইটে দেখতে পেয়েছে শুধু চেইন খার লি গ্রামেই পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে ৭০০ বাড়ি। আক্রান্ত এলাকাগুলোতে সাংবাদিক বা পর্যবেক্ষকদের প্রবেশে অনুমতি দিচ্ছে না মিয়ানমার সরকার। এ অবস্থায় পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করতে স্টেট কাউন্সেলর অং সান সুচির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। -ডেস্ক