(দিনাজপুর২৪.কম) মিয়ানমার সরকারের উদ্দেশে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেজ বলেছেন, রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর অভিযান বন্ধ করতে হবে। আর সেখান থেকে সহিংসতা থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ ভূমিতে ফিরিয়ে নিতে হবে।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের উন্মুক্ত বৈঠকে জাতিসংঘের মহাসচিব এ আহ্বান জানান। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আট বছর পর উন্মুক্ত বৈঠক হয় জাতিসংঘে। সেখানে জাতিসংঘের মহাসচিব বলেন, মিয়ানমার সরকারকে তিনটি বিষয় মেনে নিতে হবে।

প্রথমত, রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে সেনাবাহিনীর অভিযান বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মানবিক সহায়তার জন্য আক্রান্ত এলাকাগুলোতে অবাধে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

গুতেরেজ আরো বলেন, রাখাইনে সহিংসতায় দ্রুততম সময়ে শরণার্থী সংকটের সৃষ্টি করেছে। এর ফলে মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের কাছ থেকে নির্যাতনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা জানা গেছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো আলোচনা করছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর একটি বৈঠক হয়েছিল।

নিরাপত্তা পরিষদের সাত সদস্যের অনুরোধে আয়োজিত এই বৈঠকে চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ স্থায়ী ও অস্থায়ী সদস্যরা বক্তব্য রাখে। সংশ্লিষ্ট দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রতিনিধিরাও এই বৈঠকে অংশ নেন। বেশির ভাগ দেশের প্রতিনিধি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা বন্ধ ও সেখানে মানবিক সহায়তা দেয়ার দাবি জানান।

প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে উদারতার পরিচয় দেয়ার জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেজ বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানান।

উল্লেখ্য, ২৫ আগস্ট নিরাপত্তা বাহিনীর চেকপোস্টে বিদ্রোহীদের হামলার পর ক্লিয়ারেন্স অপারেশন জোরদার করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তখন থেকেই মিলতে থাকে বেসামরিক নিধনযজ্ঞের আলামত। পাহাড় বেয়ে ভেসে আসতে শুরু করে বিস্ফোরণ আর গুলির শব্দ। পুড়িয়ে দেয়া গ্রামগুলো থেকে আগুনের ধোঁয়া এসে মিশতে শুরু করে মৌসুমী বাতাসে। মায়ের কোল থেকে শিশুকে কেড়ে নিয়ে শূন্যে ছুড়ে দেয় সেনারা। কখনও কখনও কেটে ফেলা হয় তাদের গলা। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় মানুষকে। ওই সহিংসতা থেকে বাঁচতে এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

সহিংসতার পর সেনাবাহিনী অভিযান জোরালো করার পাশাপাশি জাতিসংঘের ত্রাণ কর্মীদের জোরপূর্বক রাখাইন থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। এরপর গতকাল জাতিসংঘের এক অনুসন্ধানী দলকে রাখাইনে প্রবেশ করতে দেয়নি মিয়ানমার। ডি ফ্যাক্টো সরকারের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের পরিকল্পিত এই সফর বাতিল করে দেয়া হয়েছে। জাতিসংঘের একজন মুখপাত্রকে উদ্ধৃত করে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এই খবর নিশ্চিত করেছে। ওই মুখপাত্র জানিয়েছেন, সফর বাতিলের কোনও কারণ জানায়নি মিয়ানমার। ইয়াঙ্গুনে জাতিসংঘের একজন মুখপাত্র ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেছেন, কোনও কারণ ছাড়াই নির্ধারিত ওই সফর বাতিল ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।

মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাকে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন ইতোমধ্যে ‘জাতিগত নির্মূলের পাঠ্যপুস্তকীয় দৃষ্টান্ত আখ্যা দিয়েছে। মহাসচিব প্রশ্ন তুলেছেন দুই তৃতীয়াংশ মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হলে তাকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ ছাড়া আর কী নামে ডাকা হবে।

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণকে রোহিঙ্গা তাড়ানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও এনেছে জাতিসংঘ। তবে কোনভাবেই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সেখানে প্রবেশাধিকার দিচ্ছে না তারা।

এদিকে, গত মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে রাখাইনে ১৫ সেপ্টেম্বরের পর সেনা অভিযান বন্ধ হয়েছে বলে দাবি করেন মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় পরামর্শক অং সান সু চি। তবে বিবিসিসহ বেশ কিছু গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থা সেই দিন থেকেই সু চির দাবি নাকচ করে আসছে।-ডেস্ক