(দিনাজপুর ২৪.কম) বিজ্ঞানমনস্ক লেখক-ব্লগার অভিজিৎ রায় ও অনন্ত বিজয় দাশ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীসহ তিন জঙ্গিকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। সোমবার রাতে রাজধানীর দুটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন- বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক তৌহিদুর রহমান (৫৮), সাদেক আলী মিঠু (২৮) ও আমিনুল মল্লিক (৩৫)।

র‌্যাব বলছে, তারা তিনজন উগ্রপন্থি জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সক্রিয় সদস্য। র‌্যাব দাবি করেছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছেন কারাবন্দি এবিটির শীর্ষ নেতা জসীমুদ্দীন রাহমানির নির্দেশে সাদেকসহ পাঁচজনের একটি দল অভিজিৎ ও অনন্ত বিজয় হত্যার সঙ্গে জড়িত। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া অন্য চার উগ্রপন্থি রমজান, নাঈম, জুলহাস ও জাফরান বর্তমানে পলাতক। তবে দুই ব্লগারকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে রমজান ও নাঈম। তারা এবিটির কিলিং স্কোয়াডের সদস্য। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। গ্রেফতার তিনজনকে গতকাল রাতে অভিজিৎ হত্যা মামলার তদন্ত সংস্থা ডিবির কাছে হস্তান্তর করেছে র‌্যাব।
র‌্যাব জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তৌহিদ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও সাদেক সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এবিটির প্রধান জসীমুদ্দীন রাহমানির কাছ থেকে হত্যার নির্দেশনা পেতেন তার ছোট ভাই আবুল বাশার ও সাদেক। সে অনুযায়ী তৌহিদুর হত্যার পরিকল্পনা সাজাতেন। স্বজন হিসেবে কারাগারে দেখা করা ও আদালতে হাজিরা দেওয়ার সময় জসীমুদ্দীন রাহমানির কাছ থেকে তারা সাংগঠনিক দিকনির্দেশনা পেতেন।

২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে সঙ্গে নিয়ে একুশে বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় অভিজিতের ওপর হামলা করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়। গুরুতর আহত হন তার স্ত্রী বন্যা। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। চাঞ্চল্যকর এই হত্যার পর মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআইর সদস্যরা বাংলাদেশে আসেন। কিছু আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষার পর যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়। ১২ মে সিলেটে খুন করা হয় ব্লগার অনন্ত বিজয়কে। সর্বশেষ গত ৭ আগস্ট রাজধানীর পূর্ব গোড়ানে হত্যা করা হয় ব্লগার নীলাদ্রি চ্যাটার্জি ওরফে নিলয় নীলকে। একের পর এক ব্লগার হত্যার পর খুনিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় দেশে-বিদেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। গ্রেফতার হওয়া তিন জঙ্গি নীলাদ্রিসহ অন্যান্য ব্লগার হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা এখনও স্বীকার করেননি। র‌্যাব বলছে, এ ব্যাপারে পরবর্তী সময়ে তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

গতকাল দুপুরে উত্তরায় র‌্যাব সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীর আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ জানান, সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর নীলক্ষেত থেকে প্রথমে সাদেককে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাত সাড়ে ১২টার দিকে ধানমণ্ডির স্টার কাবাবের পাশের গলি থেকে তৌহিদুর ও আমিনুলকে গ্রেফতার করা হয়। কারাবন্দি এবিটি নেতা জসীমুদ্দীনের অনুপস্থিতিতে সংগঠনের আর্থিক বিষয় দেখাশোনা করতেন তৌহিদুর। তিনি যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আইটি বিশেষজ্ঞ। তৌহিদুর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক। তার পাসপোর্ট পরীক্ষা করা হবে।

কমান্ডার মুফতি মাহমুদ জানান, ‘৯০-এর দশকে তৌহিদুর যুক্তরাজ্যে যান এবং আইটি বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। ২০১১ সালে দেশে ফেরেন। তবে ২০০৭ সাল থেকে জসীমুদ্দীন রাহমানির সঙ্গে তার যোগাযোগ। জসীমুদ্দীনের মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ওই টিমের একজন সক্রিয় সদস্য হন তিনি। তিনি অভিজিৎ ও অনন্ত বিজয়ের সব কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতেন। সাদেক আলী প্রেসে কাজ করতেন। জসীমুদ্দীনের বই ছাপানোর কাজ করতে গিয়ে তার সঙ্গে সাদেকের পরিচয়। ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষার প্রিলিমিনারিতে তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন। জসীমুদ্দীনের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ছিলেন সাদেক। বিভিন্ন সময় সাদেক কাশিমপুর কারাগারে গিয়ে জসীমুদ্দীনের সঙ্গে দেখা করে সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রমের দিকনির্দেশনা নিয়ে আসতেন। আমিনুল পাসপোর্ট অফিসের দালাল। ভুয়া নাম-ঠিনানা ব্যবহার করে উগ্রপন্থিদের পাসপোর্ট তৈরিতে সহায়তা করে বিদেশে পালানোর সুযোগ করে দিতেন তিনি।

গ্রেফতারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, ২০১৩ সালে জসীমুদ্দীন গ্রেফতারের পর সাদেক আলী ও আবুল বাশার সংগঠন পরিচালনার দায়িত্ব পান। তবে জসীমুদ্দীনের দিকনির্দেশনা অনুসারে তৌহিদুর রহমান সব হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করতেন। ব্লগার অভিজিৎ রায় ও অনন্ত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এবিটির পাঁচ সক্রিয় সদস্য সরাসরি কিলিং মিশনে অংশ নেন। তারা হলেন- সাদেক, রমজান ওরফে সিয়াম, নাঈম, জুলহাস বিশ্বাস ও জাফরান আল হাসান। পলাতক রমজান ও নাঈম ব্লগার অভিজিৎ ও অনন্তকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। অন্য তিন জঙ্গি ঘটনাস্থলের আশপাশে ছিলেন। পলাতক রমজান ছদ্মবেশে কালোজিরা এবং মধু বিক্রি করেন। এর পাশাপাশি রমজান বাংলাদেশের আল কায়দার সদস্য রিত্রুক্রটের দাওয়াতি কাজও করতেন। রমজানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ নাঈম। নাঈম ছাড়াও রমজানকে বছিলা ফাতিমা-তুজ-জোহরা মাদরাসার পরিচালক শামীম ও রায়েরবাজার মাদরাসার পরিচালক মাজহার আলী চেনেন। রমজান, নাঈমসহ অন্যরা ব্লগার অভিজিৎ রায়কে হত্যার ব্যাপারে আগে থেকে কৌশলে খুঁজছিলেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সর্বশেষ পরিকল্পনাকারীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের মাঠে মিলিত হন। অভিজিৎকে হত্যার এক-দুই ঘণ্টা আগে রমজান, নাঈমসহ অন্যরা বইমেলা প্রাঙ্গণে যান। তারা অভিজিৎ রায়কে অনুসরণ করতে থাকেন। এরপর অভিজিৎ টিএসসি এলাকায় পৌঁছলে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

র‌্যাব জানায়, সাদেক আলী ও তৌহিদুর রহমান জানিয়েছেন একই গ্রুপ পরে সিলেটে অনন্ত বিজয় দাশ হত্যায় অংশ নেয়। হত্যা-মিশন সফল হওয়ার পরপরই তৌহিদুর রহমানের নির্দেশে জুলহাস ও জাফরানের দায়িত্ব ছিল আনসারুল্লার নামে দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেওয়া।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যার পর প্রথমে সন্দেহভাজন হিসেবে সাফিউর রহমান ফারাবীকে আটক করে র‌্যাব। এরপর তাকে কয়েক দফায় ডিবি পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তবে অভিজিৎ হত্যার দায় তিনি স্বীকার করেননি। প্রথম থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাবি করে আসছে, অভিজিৎ হত্যার সঙ্গে এবিটির সদস্যরা জড়িত। ডিবির কর্মকর্তারা দাবি করছিলেন, এরই মধ্যে সাতজনকে তারা শনাক্ত করেছেন।

২০১৩ সালে মিরপুরে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে হত্যার পর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়। ওই মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট ডিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গতকাল রাতে দিনাজপুর ২৪.কমকে জানান, ওই মামলাটি তদন্তের সময় সাদেক নামে এক এবিটি জঙ্গির নাম উঠে আসে। এরপর বিভিন্ন সময় তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করা হয়। সাদেকের কাছ থেকে উগ্রপন্থিদের ব্যাপারে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাবে বলে ধারণা করছেন গোয়েন্দারা।

অভিজিতের বাবা অধ্যাপক অজয় রায় গতকাল দিনাজপুর ২৪.কমকে বলেন, যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তারা হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকলে দ্রুত সাজা নিশ্চিত করা হোক। প্রকৃত আসামি গ্রেফতার করলে অবশ্যই তারা সাধুবাদ পাবেন।

এবিটির উপদেষ্টা তৌহিদুর রহমান: দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, যশোর সদরের খড়কী এলাকায় তার বাড়ি। তিনি অবিবাহিত। এক সময় বাংলাদেশ বিমানের ফিল্ড সার্ভিস অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে চাকরি করতেন। এর আগে চাকরি করতেন আজিমপুরের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পপুলেশন রিচার্স অ্যান্ড ট্রেনিংয়ে। ১৯৯১ সালে ইংল্যান্ডে চলে যান। সেখানে তৌহিদুর আইটি বিষয়ে কোর্স করেন। ২০০৭ সালের দিকে জসীমুদ্দীন রাহমানির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। জসীমুদ্দীনের মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে এরপর প্রায়ই তাকে আর্থিক সহযোগিতা করতেন তৌহিদুর। ২২ বছর ইংল্যান্ডে থাকাকালে তিনি ৩-৪ বার বাংলাদেশে আসেন। ২০০১ সালে ইংল্যান্ডের একটি স্কুলে চাকরি করতেন তৌহিদুর। এরপর দুই বছর বেকার ছিলেন। পরে ‘আইজেডএ’ নামে বাচ্চাদের একটি স্কুলে নেটওয়ার্ক সাপোর্টার হিসেবে চাকরি নেন। পরে তিনি ইংল্যান্ডের নাগরিকত্ব লাভ করে ১৫ বছর ধরে সেখানকার বেকার ভাতাসহ সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। পূর্ব লন্ডনের প্যালিস্ট শহরে তিনি বসবাস করতেন। জসীমুদ্দীনের সঙ্গে পরিচয়ের পর তাকে এবিটির উপদেষ্টা করা হয়েছিল। সংগঠনকে শক্তিশালী করতে জসীমুদ্দীনের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সাদেক ও রমজানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন তিনি। অভিজিৎ রায় বাংলাদেশে আসার বিষয়টি রমজান ও নাঈমকে জানান তৌহিদুর। মূলত তারা দু’জন এবিটির কিলিং স্কোয়াডের সদস্য।

কে এই সাদেক আলী: ২০০৭ সালে জসীমুদ্দীন রাহমানির সঙ্গে সাদেক আলীর পরিচয়। তার গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের মাছুমপুরে। নীলক্ষেতে সাদেকের বাবার একটি খাবার হোটেল রয়েছে। সাদেক নীলক্ষেতে জাইয়ান প্রেসে কাজ করতেন। প্রেসে কাজ করার মাধ্যমে জসীমুদ্দীনের সঙ্গে তার পরিচয়। সাদেকের পরিবার ছিল পীরভক্ত। পরিচয়ের সূত্র ধরে জসীমুদ্দীনের বয়ান ও খুতবা শুনে তার মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হন সাদেক। কাশিমপুর কারাগারে গিয়ে এবিটি প্রধানের সঙ্গে দুইবার দেখা করেছেন সাদেক। এ ছাড়া আদালতে হাজির করা হলে জসীমুদ্দীনের সঙ্গে তার ছোট ভাই বাশার কয়েক দফায় দেখা ও পরামর্শ নিয়েছেন। সর্বশেষ ২১ মে এবিটি প্রধানের সঙ্গে দেখা করে তাকে নতুন চশমা, ইসবগুলের ভুসি ও কিছু ওষুধ দিয়েছেন সাদেক আলী। সাদেক ভবিষ্যতে আইএসে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন।

নির্বিকার সাদেক যা বললেন: গতকাল র‌্যাব সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের সামনে এবিটির সদস্য সাদেক বলেন, ‘আমি অভিজিৎ ও অনন্ত দাশ হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলাম না। তবে হত্যা পরিকল্পনার কথা জানতাম। আমার সামনেই জুলহাস ও জাফরান চূড়ান্ত হত্যা পরিকল্পনার ব্যাপারে কথা বলছিল। অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের সময় আমি বোনের বাসায় ছিলাম।’ তবে জসীমুদ্দীনের সঙ্গে তার যোগাযোগ থাকার কথা স্বীকার করেন সাদেক। বিভিন্ন সময় এবিটি প্রধানের সঙ্গে দেখা করে খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে আসতেন সাদেক। তবে র‌্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, কিলিং স্পটে উপস্থিত থাকার কথা অস্বীকার করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন তিনি। কিন্তু প্রযুক্তিগত তদন্ত ও অন্যান্য সূত্রে তারা নিশ্চিত হয়েছেন, সাদেক সশরীরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। গ্রেফতার অন্য দু’জনের সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি।(ডেস্ক)