-রমজানে খাওয়া-দাওয়া – ছবি : সংগ্রহ

(দিনাজপুর২৪.কম) নিয়মিত রোজা পালন করলে সাধারণ বাত রোগ, বহুমূত্র, অজীর্ণ, হৃদরোগ এবং উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা থেকে অনেকাংশে মুক্ত থাকা যায়। তবে রোজার সময় খাওয়া-দাওয়ার সাথে দেহের ভালো-মন্দ বেশ সম্পর্কযুক্ত। লিখেছেন ডা: মিজানুর রহমান কল্লোল

জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে, দেহ মনে নতুনত্বের ছন্দ ফিরিয়ে আনতে আমরা বৈচিত্র্যময় পরিবেশ পেতে চাই। বৈচিত্র্যহীন জীবন কখনোই সুখকর হতে পারে না। রোজা দেহযন্ত্রের কর্মকাণ্ডে বৈচিত্র্যের প্রভাব ফেলে গতিশীল, লাবণীয় ও নতুন ছন্দের হাওয়া লাগায়।
অনবরত একই সুরে বা ধারায় কাজ করতে করতে দেহতন্ত্রের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কর্মকাণ্ডে ভাটা পড়ে। এক মাস রোজাতে দেহের প্রতিটি গঠন একক বিশ্রামাগারে থেকে নতুন আঙ্গিকে কর্ম সম্পাদন করে। ইঞ্জিনচালিত গাড়ি যেমন মাঝে মধ্যে ওয়ার্কশপে রাখতে হয় তারপর নতুন গতিতে চলতে থাকে। ঠিক তেমনি দেহযন্ত্র এক মাস ওয়ার্কশপে থেকে নতুন শক্তি লাভ করে। বিশ্রাম লাভ করে পতিত জমির মতো উর্বরতা লাভ করে।

সারা বছর শরীরে যে জৈব বিষ (টক্সিন) জমা হয়, রোজায় তা জ্বলে-পুড়ে নিঃশেষ হয়ে রক্ত পরিশুদ্ধ হয়। উল্লেখ্য, জৈব বিষয়ের আধিক্য দেহের জন্য ক্ষতিকর। রোজা বা উপবাস থাকলে শরীরের ওজন সামান্য হ্রাস পায় বটে, তবে তা শরীরের ক্ষতি করে না; বরং শরীর থেকে অতিরিক্ত মেদ ঝেড়ে ফেলে। নিয়মিত রোজা পালন করলে সাধারণ বাত রোগ, বহুমূত্র, অজীর্ণ, হৃদরোগ এবং উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা থেকে অনেকাংশে মুক্ত থাকা যায়। তবে রোজার সময় খাওয়া-দাওয়ার সাথে দেহের ভালো-মন্দ বেশ সম্পর্কযুক্ত।
রোজার মূল আকর্ষণ ইফতার। আর ইফতার মানেই রকমারি খাবারের আয়োজন। সারা দিন রোজার রাখার ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হ্রাস পায়, আর এ কারণেই আসরের আগে-পরে মাথা থাকে গরম, মেজাজ থাকে চড়া। মস্তিষ্ক বা ব্রেনের খাবার গ্লুকোজ।

সুতরাং ইফতারের প্রথম ও প্রধান উপাদান হওয়া প্রয়োজন কাগজি লেবু, কমলা, তেঁতুল, বেল, তোকমা, গুড়, ইসুবগুলের ভুসি, চিঁড়া প্রভৃতির শরবত। সারা দিন রোজা থাকার পর পেট বা পরিপাকতন্ত্র এমনি থাকে ঝাঁঝালো, তারপর ভাজি বা ঝালযুক্ত খাদ্র্য পাকস্থলীতে অস্বস্তির উদ্রেক করতে পারে। তাই ছোলা ভাজা, পেঁয়াজু, বেগুনি, বিভিন্ন ধরনের বড়া কম পরিমাণে খাওয়া উচিত। সেমাই, দই, দুধ, চিঁড়া, পায়েস ইত্যাদি নমনীয় খাবার বাড়িয়ে ঝাল জাতীয় খাবার কম রাখা ভালো। কলা, পাকা পেঁপে, কমলা, আনারস ত্বক সুন্দর রাখবে এবং আয়রন ও ভিটামিনের অভাব পূরণ করবে। শুকনো খেজুরে রয়েছে প্রচুর আয়রন তাই ইফতারের মেনুতে থাকতে হবে দু-চারটি খেজুর।

ইফতারের পর গুরুপাক খবার খাওয়া ঠিক নয়। সাহরিতে ভারী খাবার বা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া যেমন- মাছ, গোশত, ডিম, দুধ খেলে ভালো। অনেকে রোজার সময় বেশি বেশি খাবার বিশেষত তৈলাক্ত খাবার খেয়ে নানারকম সমস্যায় পড়ে অথবা অতিরিক্ত মেদবহুল হয়ে পড়ে। আবার কেউ বা শরীরের ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে সাহরিতে না খেয়ে নানাবিধ সমস্যায় ভোগে।

অধিক ও অনিয়মিত খাওয়ার ফলে নানারকম রোগের সৃষ্টি হয়। কথায় বলে, ‘অতিভোজন রোগের কারণ’। রমজানে মুখের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে বলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে। এক মাস রোজা রাখার ফলে পরিপাকতন্ত্র বিশ্রাম পায়, লিভার, হৃদযন্ত্র শক্তিশালী হয়, পরবর্তী মাসগুলোতে নতুন উদ্যমে জীবন চলার শক্তি সঞ্চিত হয়। তাই রোজার মাসে ইফতার, ইফতার-উত্তর খাবার এবং সাহরির খাবারের ব্যাপারে সচেতন হয়ে আগামী দিনগুলোতে তেজোদীপ্ত থাকুন।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমা বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।
চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিঃ, ২, ইংলিশ রোড, ঢাকা। ফোন : ০১৭১৬২৮৮৮৫৫
ফোন: ০১৭২২৯১৬৪৭৯ (সঞ্জয়)

ইফতারিতে স্বাস্থ্যসম্মত শরবত
শরবত রোজাদারের ইফতারের অন্যতম পানীয়। রোজাদারের দেহের সারা দিনের ঘাটতি দ্রুত পূরণে শরবত বিশেষ ভূমিকা রাখে। সারা দিন অনাহারে থাকার ফলে শরীরে পানি ও গ্লুকোজের অভাব হয়। এ জন্য এ সময় চিনি বা গুড় বা ফলের শরবত পান করা প্রয়োজন। এতে দেহে দ্রুত পানির ঘাটতি পূরণ করে শক্তি দেবে। শরবতে রয়েছে খাদ্যশক্তি, গ্লুকোজ, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ। শরবত তৃষ্ণা মেটায়, পেট ঠাণ্ডা রাখে, খাদ্যদ্রব্য হজমে সহায়তা করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। স্যালাইনের মতো দ্রুত শক্তি দেয়। কোন শরবত স্বাস্থ্যসম্মত, সেটিই প্রশ্ন। বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের যে রঙিন শরবত পাওয়া যায় তা মোটেও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। রঙিন শরবতে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ থাকে।

ফলের জুসে নেই ফলের রস। চিনি, গুড়, লেবু ও পানি দিয়ে তৈরি শরবতই সবচেয়ে স্বাস্থ্যসম্মত। অনেকেরই প্রশ্ন, চিনি ও গুড়ের মধ্যে কোনটি ভালো। পুষ্টিবিদ ও ভেষজবিদদের মতে, চিনির চেয়ে গুড় বেশি পুষ্টি ও ভেষজসমৃদ্ধ। আখের গুড় চিনির চেয়ে বেশি হজম হয়। গুড়ে আখের রসের সব খনিজ ও ক্ষারক পদার্থ সুরক্ষিত থাকে। তবে গুড়ে প্রচুর ময়লা থাকে। এই ময়লা পরিশোধন করতে পারলে গুড়ই উত্তম হতো।

আয়ুর্বেদ মতে, গুড় রক্তস্বল্পতা, জন্ডিস, পিত্তনাশ ও কোনো স্থানে ফুলে ওঠা দূর করে।

গুড়ের শরবত কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। গুড়ে চিনির চেয়ে ক্যালসিয়াম, আয়রন ও ফসফরাস বেশি থাকে। অনেকেই আখের রস পুষ্টিসমৃদ্ধ মনে করে ইফতারে শরবত হিসেবে পান করেন। আখের রসের চেয়ে গুড় ও চিনিতে ১০ গুণ বেশি খাদ্যশক্তি, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস থাকে। প্রতি ১০০ গ্রাম আখের গুড়, চিনি ও আখের পুষ্টি আছে যথাক্রমে খাদ্যশক্তি ৩৮৩, ৩৯৪ ও ৩৯ ক্যালরি; শর্করা ৯.৫, ৯.৮ ও ৯.১ গ্রাম; ক্যালসিয়াম ৮০, ২৮ ও ১০ মিলিগ্রাম; ফসফরাস ৪০, ৪ ও ১০ মিলিগ্রাম এবং আয়রন ১১.৪, ০.১১, ১.১ মিলিগ্রাম। পরিষ্কার করে শরবত করতে পারলে আখের গুড়ের শরবতই স্বাস্থ্যসম্মত।