মেরাজ কি দৈহিক ভ্রমণ ছিল? - ছবি সংগৃহীত

(দিনাজপুর২৪.কম) মক্কা থেকে জেরুসালেম এবং সেখান থেকে বেহেশতে মুহাম্মদ সা:-এর নৈশভ্রমণ এবং একই রাতে তাঁর নিজের শহরে প্রত্যাবর্তন সমসাময়িক স্মৃতিতে একটি বিস্ময়কর বিষয় ছিল। ওই দুই শহরের (অর্থাৎ মক্কা ও জেরুসালেম) দূরত্ব অতিক্রম করতে মরুযাত্রী দলের এক মাস সময় লাগত। তাহলে মুহাম্মদ সা: এক রাতের মধ্যেই কিভাবে ওই ফিরতি ভ্রমণ সম্পন্ন করেন- ওই সময় তিনি আবার বেহেশতেও ভ্রমণ করেন? মানে যারা জেট-চালিত বিমান এবং সুপারসনিক (শব্দের চেয়ে দ্রুতগামী) গতির সাথে পরিচিত তাদের কাছেও ওই ঘটনা অলৌকিক হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে এই ভ্রমণের সত্যিকার উদ্দেশ্য ও এর প্রকৃতি সম্পর্কে সব সময়ই প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। আরো সংক্ষেপে বলা যায়, এটা ‘আত্মিক’ নাকি ‘দৈহিক ভ্রমণ’ -তা নিয়ে লোকদের মধ্যে বিস্ময় রয়েছে।

প্রথম প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দেয়া হয়েছে পবিত্র কুরআনে। সূরা আল ইসরায় (নৈশভ্রমণ) বলা হয়েছে, ‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন পবিত্র ইবাদতগৃহ (মক্কা) থেকে দূরবর্তী ইবাদতগৃহে (জেরুসালেম), যার পরিবেশ আমরা বরকতময় করেছিলাম, তাঁকে আমাদের কিছু নিদর্শন দেখানোর জন্য; একমাত্র তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা’ (আল-কুরআন-১৭ : ১)।

তাহলে এই ভ্রমণের পুরো উদ্দেশ্য ছিল এই যে, রাসূল সা: যেন আল্লাহর কিছু নিদর্শন দেখার সুযোগ পান। ওইসব নিদর্শন কী তা আমাদের বলা হয়নি। যাই হোক, ওইসব নিদর্শন দেখে মুহাম্মদ সা: পুনরায় গভীরভাবে আশ্বস্ত হন। কারণ, এর ফলে তিনি সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর অসীম ক্ষমতা সম্পর্কে প্রাথমিক অভিজ্ঞতা লাভ করেন। মক্কার লোকদের সাথে তিনি বিরোধপূর্ণ অবস্থায় ছিলেন। ওইসব নিদর্শন তাঁকে নিশ্চিতভাবে প্রেক্ষাপট থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। উভয় পক্ষের যথার্থ সামর্থ্য ও প্রকৃতি তাঁর সামনে দৃশ্যমান হয়- আল্লাহর সক্রিয় দূত হিসেবে তাঁর নিজের ক্ষমতা এবং অন্যদিকে অবিশ্বাসীদের ক্ষমতা। ফলে এতে বিস্ময়ের কিছু ছিল না যে, পরবর্তী বছরগুলোতে তার জীবন ছিল দুর্বলতা বা বিষন্নতার অনুভূতি থেকে মুক্ত। প্রতিকূল অবস্থার প্রভাব থেকে তিনি শেষ দিন পর্যন্ত অবিচল ছিলেন। কারণ তিনি নিশ্চিত ছিলেন, তিনি ও তাঁর অনুসারীরা যথার্থরূপে বিশ্বাসী থাকলে এবং তাদের উদ্দেশ্য ও কাজে আন্তরিক হলে তিনি জয়ী হবেন।

এখানে আরো জোরালোভাবে বলা উচিত যে, ইসলাম গ্রহণের জন্য অবিশ্বাসীদের প্ররোচিত করার লক্ষ্যে এই ভ্রমণ একটি অলৌকিক ঘটনা নয়। অন্য নবীদের সত্যবাদিতার প্রমাণ হিসেবে যেসব অলৌকিক ঘটনা দেয়া হয়েছিল এটি সেই ধরনের কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। অবিশ্বাসী আসলে রাসূল সা:কে বেহেশত পর্যন্ত যাওয়ার বিষয়কে চ্যালেঞ্জ করেছিল। কিন্তু তিনি তাদের অন্যান্য চ্যালেঞ্জ করা সব অনুরোধসহ এই চ্যালেঞ্জও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এ ধরনের সব অনুরোধের ক্ষেত্রে তাঁর জবাব ছিলÑ ‘সমস্ত প্রশংসা আমার প্রভুর। আমি শুধু একজন মানুষ। একজন বাণীবাহক’ (আল-কুরআন-১৭: ৯৩)।
তিনি যখন আসলেই বেহেশতে আরোহণ করেন তখন তিনি এই ঘটনাকে তাদের চ্যালেঞ্জের জবাব হিসেবে বর্ণনা করেননি। সুতরাং এই নৈশভ্রমণকে এর যথার্থ আলোকেই উপলব্ধি করতে হবে। এটি ছিল তাঁর বাণীবাহককে পুনরায় আশ্বস্ত করার জন্য আল্লাহর একটি কাজ এবং এটি এমন সময় করা হয়েছিল যখন তার বাণী যথার্থভাবে প্রচারের জন্য তার প্রয়োজন ছিল।

ইসলামী পণ্ডিতদের বেশির ভাগই মনে করেন, এই নৈশভ্রমণ ‘আত্মিক’ ছিল না। তারা বিশ্বাস করেন, রাসূল সা:-এর এই ভ্রমণ সংঘটিত হয়েছিল দৈহিকভাবে দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে। এই লেখকও এটি বিশ্বাস করেন। অনেকের জন্য এটি বিশ্বাস করা কষ্টকর, কারণ এ জন্য প্রয়োজন অস্বাভাবিক শক্তির। এর জবাবে বলা যায়, এ ধরনের ভ্রমণের জন্য যে ধরনের শক্তির প্রয়োজন তা দেয়া আল্লাহর জন্য সহজ। মাত্র ১০০ বছর পেছনের দিকে ফিরে দেখা যাক। কল্পনা করা যায়। বিলাসপূর্ণ আরামে কেউ বাহরাইন থেকে লন্ডনে ৪ ঘণ্টার সামান্য বেশি সময়ে পৌঁছতে পারে, এ কথা বললে লোকের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে। বর্তমান সময়ে অর্জিত ভ্রমণের গতির ধারাও কল্পনা করুন। এখন সুপারসনিক ভ্রমণ কি অস্বাভাবিক মনে হয়?

বস্তুত, ‘অস্বাভাবিক’ কথাটি নিশ্চিতভাবে আপেক্ষিক। বর্তমানে যা স্বাভাবিক তা আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে অস্বাভাবিক ছিল এবং আমাদের নাতি-নাতনীদের কাছে তা সেকেলে বলে মনে হতে পারে। ‘স্বাভাবিক’ এর অর্থ মূলত ‘সুবিদিত’-এর চেয়ে সামান্য একটু বেশি হতে পারে। খোলা চোখ ও উন্মুক্ত মন নিয়ে বিশ্বের দিকে তাকালে এমন অনেক অলৌকিক ঘটনা দেখা যায় যা সহজেই ‘স্বাভাবিক’ বলে গ্রহণ করা হয় শুধু তা সুবিদিত হওয়ার কারণে। প্রত্যেকটি শিশুর জন্মই একেকটা অলৌকিক ঘটনা। কিন্তু তা উপেক্ষা করা হয় এ জন্য যে, তা প্রায়ই ঘটে থাকে। এর অলৌকিক বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করার জন্য এ বিষয়ে সামান্য হলেও চিন্তা করতে হয়।

নৈশভ্রমণের মতো ঘটনাবলি উপলব্ধির জন্য শুধু স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, তা ঘটেছে কারণ আল্লাহ তা ঘটানোর ইচ্ছা করেছেন। তাঁর কাছে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘অস্বাভাবিক’ বলে কিছু নেই। সুবিদিত হোক অথবা না হোক, প্রকৃতির সব বিধান তিনি সৃষ্টি করেছেন। সব বিধানের সম্পাদনের কাজ তাঁর জন্য সমানভাবে সহজ। তাঁর কাজ বোধগম্য না হলেও সহজে তা গ্রহণ করা হয়, কারণ তাঁর অসীম ক্ষমতার সত্যতা আগেই গ্রহণ করা হয়েছে। -ডেস্ক রিপোর্ট

অনুবাদ : আবু জাফর

মূল লেখক : সিরীয় বংশোদ্ভূত আরব সাংবাদিক। সাবেক সম্পাদক, আরবি দৈনিক আল-শরক আলাওয়াত, সাবেক ধর্মবিষয়ক সম্পাদক, ইংরেজি দৈনিক আরব নিউজ