(দিনাজপুর২৪.কম) সরকারি চাকরিতে নিয়োগে এখন থেকে আর কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে না। মেধার যোগ্যতায় মিলবে চাকরি। এতদিন সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ পদ বিভিন্ন কোটার জন্য সংরক্ষিত ছিল। সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) জানিয়েছে, প্রথম শ্রেণির গেজেটেড সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগে আর কোনো বিসিএসের ফল প্রকাশে কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে না। সবশেষ ৩৮তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। কোটা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবিতে ২০১৮ সালের শুরুর দিকে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলে ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’। এর পর প্রধানমন্ত্রী কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন।

এতদিন ৫৬ শতাংশ কোটার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, জেলা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পাঁচ শতাংশ, প্রতিবন্ধী এক শতাংশ। তবে বিভিন্ন সময়ে কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় ২৮তম থেকে ৩৮তম পর্যন্ত বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডারে ছয় হাজারের মতো পদ খালি ছিল। শুধু কোটার প্রার্থীদের নিয়োগের জন্য ৩২তম বিশেষ বিসিএস নেওয়া হলেও মুক্তিযোদ্ধা কোটার ৮১৭টি, নারী ১০টি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ২৯৮টিসহ এক হাজার ১২৫টি পদ শূন্য রাখতে হয়। কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করে গত মঙ্গলবার ৩৮তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে পিএসসি। ২০১৭ সালের ২০ জুন এই বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল।

পিএসসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদিক আমাদের সময়কে বলেন, ৩৮তম বিসিএসই কোটা পদ্ধতিতে শেষ বিসিএস। তিনি বলেন, ৪০তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার সময় বলা হয়েছিল, ফল দেওয়ার সময় সরকারের সর্বশেষ কোটা নীতি ব্যবহার করা হবে। তার মানে সর্বশেষ কোটা নীতিতে যা আছে আমরা তা অনুসরণ করব।

সব ধরনের কোটা বাতিল করা হলেও প্রতিবন্ধী কোটা বহাল থাকবে বলে কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানোর সময় ওই

সময়কার মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম জানিয়েছিলেন। এ বিষয়ে পিএসসির চেয়ারম্যান বলেন, এর উত্তর আমি দিতে পারব না। সরকার যে কোটা নীতি করেছে সেটা অনুসরণ করব। তিনি জানান, ৪০তম বিসিএসে সরকারের সর্বশেষ কোটা নীতি অনুসরণ করা হবে। কোটা নিয়ে সরকার যেভাবে সিদ্ধান্ত দেবে পিএসসি সেটা অনুসরণ করবে।

জানা গেছে, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এর পরদিন নবম গ্রেড (আগের প্রথম শ্রেণি) এবং দশম থেকে ১৩তম গ্রেডের (আগের দ্বিতীয় শ্রেণি) পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি বাতিল করে পরিপত্র জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

পরবর্তী বিসিএস থেকে কোটা পদ্ধতি না থাকার সিদ্ধান্তের বিষয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, এটি ছাত্রসমাজের প্রত্যাশার বড় একটা প্রাপ্তি। কারণ তারা দীর্ঘসময় এই কোটা পদ্ধতি সংস্কারের জন্য আন্দোলন করছে। আন্দোলন করতে গিয়ে নানা রকম হামলা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ছাত্ররা এখন তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির সুযোগ পাবে।

তিনি বলেন, চাকরি না পাওয়ার ফলে দেশে শিক্ষিত তরুণ সমাজের মধ্যে যে ক্ষোভ রয়েছে সেটির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে কোটা সংস্কার আন্দোলনে। ফলে সারা দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে নেমেছিল। সরকার তাদের বিষয়টি উপলব্ধি করে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটিকে আমরা সাধুবাদ জানাই। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দেশে যে শিক্ষিত বেকার রয়েছে তাদের দ্রুত চাকরির সুযোগ করে দিতে। দেশের সব শিক্ষিত তরুণের যখন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে তখনই তারা কোটা না থাকার সুফল ভোগ করতে পারবে।

বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হাসান বলেন, ৪০তম বিসিএস থেকে আর কোটা থাকছে নাÑ এটা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে পিএসসি। এটি দেশের ছাত্রসমাজের জন্য একটি আনন্দের খবর। এটি বড় একটি অর্জন, বিশাল প্রাপ্তি আমাদের জন্য। কারণ দীর্ঘদিন আমরা আন্দোলন করেছি এই কোটা সংস্কারের জন্য। আন্দোলন করতে গিয়ে ছাত্রসমাজ নানা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আমরা যারা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছি তারা অনেকদিন জেল খেটেছি।

তিনি বলেন, আমরা চেয়েছিলাম কোটা পদ্ধতি একেবারে বাতিল না করে এটার সংস্কার হোক। ৫৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে কোটা একটা মডারেট পর্যায়ে রাখা হোক। এর পর রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কোটা পদ্ধতিই থাকবে না। আমরা এটা সাধুবাদ জানিয়েছি এবং দ্রুত প্রজ্ঞাপন দাবি করেছি। কিন্তু পরে প্রজ্ঞাপন নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল। নানা আন্দোলনের পর অবশেষে ছাত্রসমাজ তাদের দাবি আদায় করেছে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল সংসদে বলেন, সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতিই আর রাখা হবে না। তবে পরে সংসদে তিনি বলেন, কোটা পদ্ধতি থাকবে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ রাখতে হাইকোর্টের রায় আছে।

নতুন করে আন্দোলন দানা বাঁধার প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি পর্যালোচনা করতে ওই সময়কার মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমের নেতৃত্বে ২০১৮ সালের ২ জুন একটি কমিটি করে সরকার। একই বছর ১৩ আগস্ট শফিউল সাংবাদিকদের বলেন, তারা সরকারি চাকরির কোটা যতটা সম্ভব তুলে দিয়ে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের সুপারিশ করবেন।

এর পর সরকারি চাকরির নবম থেকে ত্রয়োদশ গ্রেড পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে কোনো কোটা না রেখে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের নিয়ম চালু করতে ২০১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুপারিশ জমা দেয় সচিব কমিটি। এর মন্ত্রিসভা বৈঠকে তা অনুমোদন পায়। সরকারি চাকরিতে অষ্টম থেকে তার ওপরে অর্থাৎ প্রথম গ্রেড পর্যন্ত সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো কোটা থাকবে না বলে গত ২০ জানুয়ারি সিদ্ধান্ত দিয়েছে মন্ত্রিসভা। -ডেস্ক