(দিনাজপুর ২৪.কম) ১২ আগস্ট, সকাল পৌনে ১০টা। মগবাজার লেভেলক্রসিং। যানজটে যানবাহন স্থবির তেজগাঁও-মগবাজার সড়ক। রেললাইনের ঠিক ওপরে দাঁড়িয়ে একটি স্কুলভ্যান। আর দশটা দিনের মতো স্বাভাবিক সব কিছু। হঠাৎ ট্রেনের হুইসেল শুনতে পাওয়া যায়। কারওয়ানবাজারের দিক থেকে দানবীয় গতিতে আসছে ট্রেন। যানজটের কারণে রেললাইনের ওপর থাকা যানবাহনগুলো না পারছে সামনে যেতে, না পারছে পেছনে সরতে। রাস্তা বন্ধ করতে রেল গেটও ফেলতে পারছেন না গেটম্যানরা। যাত্রীরা যে যার মতো লাফিয়ে নেমে পড়েন। কিন্তু ভ্যানে আটকা পড়ে চার শিশু। বাঁচাও! বাঁচাও! চিৎকার করছে তারা।

ঘটনার আকস্মিকতায় পথচারীরাও এগিয়ে যেতে পারছেন না। গেটম্যান শাহাদাত হোসেন লাল নিশান উড়িয়ে ট্রেনটিকে থামার সংকেত দেন। ট্রেনটি বিকট শব্দে ব্রেক কষে। গতির কারণে টেনেহিঁচড়ে কমপক্ষে ৩০ ফুট সামনে চলে আসে। লাইনের ওপর থাকা স্কুলভ্যানটিকে ধাক্কা দিয়ে থেমে যায়। ওই মৃদু ধাক্কাতেই লাইন থেকে ছিটকে পড়ে ভ্যানটি। শিশুরা প্রাণে রক্ষা পেলেও কম-বেশি আহত হয়।

এভাবেই সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দেন প্রত্যক্ষদর্শী মার্কেন্টাইল ব্যাংকের কর্মকর্তা নুসরাত হাসান। মগবাজার ক্রসিংয়ে এমন বিপদের মুখোমুখি হতে হয় প্রতিদিন। রাজধানীর ক্রসিংগুলোতে ২০১৪ সালে নিহত হয়েছেন ২৩৮ জন। কমলাপুর জিআরপি থানার ওসি মোহাম্মদ আবদুল মজিদ দিনাজপুর ২৪.কমকে জানান, চলতি বছরে ট্রেনে কাটা ও ধাক্কায় অন্তত ৪০০ জনের মৃত্যু হয়েছে কমলাপুর থানায়। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ জেলা কমলাপুর থানার অধীন।
জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের হিসাবে সারাদেশে তিন হাজার ক্রসিংয়ের মধ্যে ১ হাজার ২০০ অবৈধ। এগুলোতে গেটম্যান নেই।
রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক দিনাজপুর ২৪.কমকে বলেন, যানজটের কারণে ট্রেন পারাপারের সময় ক্রসিং খালি করা যায় না। যাত্রী ও চালকরাও সচেতন নন। রেলগেট বন্ধ করার পরও যত্রতত্র পারাপারের চেষ্টা করেন পথচারীরা। সংকেত মানেন না। গত মঙ্গল ও সোমবার সরেজমিনে রাজধানীর মগবাজার ক্রসিংয়েও একই চিত্র দেখা যায়।সোম ও মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সরেজমিন দেখা যায়, ঘণ্টায় গড়ে চারটি ট্রেন আপ ও ডাউন পথে চলাচল করে। ট্রাফিক পুলিশের তেজগাঁও জোনের সহকারী কমিশনার আবু ইউসুফ জানান, প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ১৮ থেকে ২২ মিনিট রাস্তা বন্ধ থাকে ট্রেন চলাচলের জন্য। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি জানান, ঢাকায় দৈনিক আট ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে ট্রেনের কারণে।
কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী জানান, ঢাকা থেকে ৪৮টি ট্রেন ছেড়ে যায়। আবার একই সংখ্যক ট্রেন দৈনিক আসে। শুক্রবার চলাচল করে ৩৬টি ট্রেন। সপ্তাহের অন্যদিনে ৩৮ থেকে ৪৪টি ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে তিনটি ট্রেন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পথে চলাচল করে। বাকি ট্রেনগুলো ঢাকা-টঙ্গী পথে নির্দিষ্ট গন্তব্যে যায়। অর্থাৎ মগবাজারে দৈনিক সর্বোচ্চ ৮২ বার ট্রেন চলাচল করে। প্রতিবার গড়ে আট থেকে ছয় মিনিট রেলক্রসিংয়ে যান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়।

ঢাকা-টঙ্গী পথে রাজধানীতে লেভেল ক্রসিং রয়েছে ১৫টি। রেলওয়ের হিসাবে এর মধ্যে খিলগাঁও, মগবাজার, মালিবাগ, তেজগাঁও, এফডিসি, বনানী ও কারওয়ান বাজার ক্রসিং ঝুঁকিপূর্ণ। ফ্লাইওভারের কাজ চলায় সবচেয়ে দুর্ভোগ মগবাজারে। ২০০৯ সালের ১৭ জুন যানজটের কারণে মগবাজার ক্রসিংয়ে আটকেপড়া যাত্রীবাহী বাস দুমড়ে-মুচড়ে যায় ট্রেনের চাপায়। চলতি মাসেও মৃত্যু হয়েছে এক শিশুসহ দুইজনের।
স্থানীয় দোকানিরা জানালেন, নির্মাণকাজ শুরুর কারণে ফ্লাইওভারের পিলারে চলে গেছে রাস্তার অর্ধেক। যানজটও বেড়েছে। হাতিরঝিল-মগবাজার মোড় পথে দিনভর যানবাহনের ভয়াবহ চাপ থাকে। ইঞ্চি মেপে সামনে এগোতে হয়। রেললাইনের ওপরও একই অবস্থা। ফলে ট্রেন এলেই ঘটে বিপত্তি।

গেটম্যান শাহাদাত হোসেন দিনাজপুর ২৪.কমকে বলেন, প্রতিবেলায় চারজন গেটের দায়িত্বে থাকেন। যানজটের কারণে সামনে পেছনে এক ইঞ্চিও জায়গা থাকে না। তাই লাইনের ওপরও গাড়ি আটকা পড়ে। তখন গেটও বন্ধ করা যায় না। পতাকা দেখিয়ে ট্রেন থামিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
সোমবার দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে পাকশী এক্সপ্রেস কারওয়ান বাজার দিক থেকে আসতে থাকে। তার আগেই বলাকা পরিবহনের একটি বাস (ঢাকা-মেট্রো-জ-১১-২৯৫৭) রেলগেট অতিক্রম করে লাইনের কাছাকাছি চলে আসে। গেট বন্ধ করার উপায় ছিল না। বাসের গা ঘেঁষে ট্রেন ক্রসিং পার হয়। গেটম্যানরা এর জন্য চালকদের দায়ী করে বলেন, ‘ড্রাইভাররা সিগনাল মানেন না।’ মঙ্গলবার বিকেল পৌনে ৪টায় জামালপুর কমিউটার যাওয়ার সময়ও ছিল একই চিত্র। মগবাজার মোড়ের দিকে গাড়ির চাপ থাকায় লাইনের ওপর আটকে যায় একটি প্রাইভেট কার (ঢাকা মেট্রো-গ-১৫-২৩৫৭)। ততক্ষণে মালিবাগের দিক থেকে ট্রেন আসছে। ট্রেন ৩০ ফুট দূরে থাকতে কোনোক্রমে ৪/৫ ফুট সামনে এগিয়ে যায় গাড়িটি। অল্পের জন্য রক্ষা পায় দুর্ঘটনা থেকে।

মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় মগবাজার ক্রসিংয়ে আসে আখাউড়া মেইল। একই সময়ে বিপরীত দিক থেকে আসে ঈশ্বরদী থেকে ঢাকামুখী ট্রেন। দুটি ট্রেন ক্রসিং দিয়ে একই সময়ে পাশাপাশি পার হবে। তাই আগেই গেট বন্ধ করা হয়। গেটের ভেতর দাঁড়ানোরও জায়গা নেই। এর মধ্যেই একটি ওয়ালটন ফিউশন মডেলের মোটরসাইকেল (ঢাকা মেট্রো-হ-৩১-৯৪৬২) গেটের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে। দুই দিক থেকে ট্রেন আসছে দেখে গেটের নিচ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন চালক। হাতে এতটা সময় নেই। গেট ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। রাস্তার বিপরীত দিক দেখা যাচ্ছিল না মোটরসাইকেল অক্ষত আছে কি-না। দুটি ট্রেন ধুলো উড়িয়ে রাস্তা কাঁপিয়ে পার হওয়ার পর দেখা যায়, না রক্ষা পেয়ে গেছেন। এক পুলিশ সদস্য মৃদু ধমক দিয়ে ছেড়ে দিলেন চালককে।(ডেস্ক)