(দিনাজপুর২৪.কম) ড্রাইভারের ইচ্ছাকৃত দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হলে মৃত্যুদণ্ড, বেপরোয়া গাড়ি চালানোর ফলে নিহত হলে তার শাস্তি যাবজ্জীবন এবং পাল্লাপাল্লি দিয়ে গাড়ি চালানোর শাস্তি তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান রেখে ‘সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮’-এর প্রস্তাবিত খসড়া চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে সরকার। আজ সচিবালয়ে সরকারি ছুটির দিনেও আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সংশ্লিষ্ট দফতরে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এই বৈঠকে খসড়ার প্রয়োজনীয় সংশোধন ও ভেটিং শেষে আগামী সোমবার মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তোলা হতে পারে বলে জানা গেছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর তা পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে পাস করা হবে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের মুখে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ টি চূড়ান্তে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৫ সালের সড়ক পরিবহন ও চলাচল আইন তৈরি করা খসড়ায় মোটরযান চালিয়ে অপর ব্যক্তির মৃত্যু ঘটালে তিন থেকে সাত বছর শাস্তির বিধান ছিল। এ ছাড়া নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীকে পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং চালকের দোষসূচক পয়েন্ট কাটার প্রস্তাব করা হয়েছিল। আর কেউ আহত করলে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল এবং আহত ব্যক্তিকে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের বিধান ছিল। নতুন আইনের খসড়ায় দুর্ঘটনার জন্য দ-বিধি অনুযায়ী শাস্তি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। দণ্ডবিধিতে তিন রকমের বিধানের মধ্যে মানুষ হত্যা হলে ৩০২ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের সাজা, খুন না হলে ৩০৪ ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে মৃত্যু ঘটালে ৩০৪ (বি) ধারা অনুযায়ী তিন বছরের কারাদণ্ডের উল্লেখ রয়েছে। এই বিধানের বিষয়ে বাংলাদেশ বাস মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, বিধান তৈরির সময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ছাড়াও সবপক্ষের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই বিধানের সঙ্গে বাস মালিক সমিতি একমত পোষণ করছে। তিনি বলেন, আমরা আইন মেনে চলার জন্য নির্দেশ দিয়েছি। আইন অনুযায়ী দোষীদের যেই শাস্তি হোক আমরা মেনে নেব। নতুন আইনকে আমরা স্বাগত জানাই। এ ব্যাপারে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর সাংগঠনিক সমআদক আজাদ আহমেদ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার সঙ্গে চালক ও তার সহযোগীর ১০ বছরের কারাদণ্ডসহ এরসঙ্গে যারা যারা জড়িত তাদের প্রত্যেকে সাজা দিতে হবে। ইচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা বা হত্যার কোনো ঘটনা ঘটলে ৩০২ ধারা অনুযায়ী সাজা কার্যকর করতে হবে।

খসড়ায় যা আছে-
শিক্ষাগত যোগ্যতা : আগের আইনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। নতুন আইনের খসড়ায় ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্য চালকের কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি পাসের শর্ত রাখা হয়েছে।
সহকারী হতেও শিক্ষাগত যোগ্যতা : আগের অধ্যাদেশে সহকারীদের লাইসেন্সের কথা থাকলেও তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত ছিল না। নতুন আইনে চালকের সহকারীরও থাকতে হবে পঞ্চম শ্রেণি পাসের সার্টিফকেট। সহকারী হতে বাধ্যতামূলকভাবে লাইসেন্সের বিধান তো থাকছেই। সহকারী : চালকের সহকারীর লাইসেন্স না থাকলে এক মাসের জেল বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান আছে নতুন আইনের খসড়ায়।
নূন্যতম বয়স : ব্যক্তিগত গাড়ি চালনার জন্য চালকের বয়স আগের মতই অন্তত ১৮ বছর রাখা হয়েছে। তবে পেশাদার চালকদের বয়স হতে হবে কমপক্ষে ২১ বছর। বাড়ছে সাজা : নতুন আইনের খসড়ায় চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে অনধিক ছয় মাসের জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দ- দেওয়া হবে। আগের আইনে এই অপরাধের জন্য তিন মাসের জেল বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান ছিল।
নিষিদ্ধ মোবাইল ফোন : নতুন আইন পাস হলে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না চালক। এ আইন ভাঙলে এক মাসের কারাদ- বা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার : ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে- এমন অপরাধের ক্ষেত্রে চালককে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে পুলিশকে।
বিধি অমান্যে পয়েন্ট কাটা : প্রস্তাবিত আইনে লাইসেন্সে থাকবে মোট ১২ পয়েন্ট। বিভিন্ন বিধি অমান্যে কাটা যাবে এই পয়েন্ট। পয়েন্ট শূন্য হলে বাতিল হবে চালকের লাইসেন্স।
গত ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলায় উড়াল সেতুর ঢালে রাস্তার পাশে অপেক্ষমাণ শিক্ষার্থীদের ওপর বাস তুলে দেয় জাবালে নূর পরিবহনের চালক। এতে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত এবং আরও নয়জন আহত হয়। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়। এই ঘটনার পর থেকেই প্রথমে রাজধানীতে পরবর্তীতে সারাদেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামে স্কুল-কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থরা। বেপরোয়া বাস চালক ও অকার্যকর ট্রাফিক-ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের সমর্থন দিয়েছে অভিভাবকরাও। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা নিজেরাই যানবাহনের নিবন্ধনপত্র ও চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স যেমন পরীক্ষা করছে তেমনি যান চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করছে অত্যন্ত সুচারুভাবে। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ শ্লোগানে রাস্তায় রয়েছে তারা। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তাদের দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। এজন্য শিক্ষার্থীদের রাস্তা ছেড়ে বাসা বা প্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এই অবস্থায় গতকালও রাজধানীর মগবাজারে সাতক্ষীরা-ঢাকাগামী গোল্ডেন লাইন পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ জনতা বাসের চালককে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে এবং বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সড়কে নৈরাজ্য ঠেকাতে এমন আইনের প্রস্তাবিত খসড়া যখন তৈরি ঠিক সেই মুহূর্তেও এই ঘটনা ঘটল। সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান করা হলেও তারা বলছে দাবী না মেনে নেওয়া পর্যন্ত রাস্তায় থাকবে তারা।
বহু বছরের পরিকল্পনাহীনতা ও অব্যবস্থাপনার পুঞ্জীভূত কুফল আজকের ঢাকার সড়কগুলোর প্রাণঘাতী নৈরাজ্য। যানবাহন চলাচলব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও অঙ্গহানি দৈনন্দিন বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এসবের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বেপরোয়া যান চালনাকে উৎসাহিত করে। বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে আসলেও দোষী চালকদের সাজার বিষয়ে কোনো বক্তব্য আসেনি তাদের তরফ থেকে। তবে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ বাসচাপায় নিহত দিয়া খানম মিমের পরিবারকে সান্ত¡না জানাতে গিয়ে গতকাল সড়ক পরিবহন আইন আরও কঠোর করে দোষী চালকদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পক্ষে নিজের মতামত জানান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি থাকতে আমি মৃত্যুদণ্ডের আইন করেছিলাম। কিন্তু আন্দোলনের কারণে আইনটি পরে বাতিল করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করা হয়েছে। কিন্তু যারা সড়কে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে মানুষ মারবে, তাদের মৃত্যুদণ্ডই হওয়া উচিৎ। -ডেস্ক