(দিনাজপুর২৪.কম) মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকদের নিজদেশে ফেরত পাঠাতে তুরস্ক সাধ্যমত চেষ্টা করবে বলে জানিয়েছেন দেশটির সানলিউরফা প্রদেশের গভর্নর আব্দুল্লাহ এরিন। রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক জনমত ও তহবিল গঠনে তুরস্ক আন্তরিকভাবে কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ও সরকার মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বিষয়ে খুবই আন্তরিক বিধায় পরিস্থিতি দেখতে প্রেসিডেন্ট তার স্ত্রী এবং দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন।’

তুরস্ক সফররত বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী আজ দেশটির সানলিউরফা প্রদেশের গভর্নর আব্দুল্লাহ এরিন-এর সাথে তার কার্যালয়ে মতবিনিময়কালে গভর্নর এসব কথা বলেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব মোঃ শাহ কামাল এসময় মন্ত্রীর সাথে উপস্থিত ছিলেন।

শুক্রবার ঢাকায় প্রাপ্ত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে একথা জানানো হয়।

বৈঠকে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত মিয়ানমারকেও আন্তর্জাতিক নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে রোহিঙ্গা নাগরিকদের উপর নিপিড়ন বন্ধ করতে হবে এবং বাংলাদেশে আশ্রিত সব রোহিঙ্গা নাগরিককে ফেরত নিতে হবে।

এসময় গভর্নর আব্দুল্লাহ এরিন বলেন, তুরস্কে আশ্রয় নেয়া সিরিয়ান শরণার্থী ক্যাম্পের অভিজ্ঞতার আলোকে তুরস্ক বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করবে।

ত্রাণমন্ত্রী পরে সানলিউরফা প্রদেশে অবস্থিত সিরিয়ান শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এখানে চারটি ক্যাম্পে সিরিয়া থেকে আগত প্রায় ৮০ হাজার শরণার্থী রয়েছে। – বাসস

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সমঝোতা স্মারক সই

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ ছাড়াই মিয়ানমারের সাথে প্রত্যাবাসন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এমওইউর আওতায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি নির্ধারণের জন্য আগামী তিন সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউসি) গঠিত হবে। এর পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সুনির্দিষ্ট শর্তসংবলিত চুক্তি সই হবে।

জেডব্লিউসি রোহিঙ্গা যাচাই-বাছাই পদ্ধতি, প্রতিদিন কতজন রোহিঙ্গা সীমান্তের কোন পথে যাবে, এসব নিয়ে একটি এমওইউ সই করবে। দুই মাসের মধ্যে শুরু হবে প্রত্যাবাসন। তবে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের কত দিনের মধ্যে ফিরিয়ে নেয়া সম্পন্ন হবে, এ ব্যাপারে মিয়ানমার কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করে দিতে সম্মত হয়নি।

গতকাল মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও রাষ্ট্রীয় পরামর্শক অং সান সু চির দফতরে প্রত্যাবাসন চুক্তি সই হয়। চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে সই করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। আর মিয়ানমারের পক্ষে সই করেন সু চির দফতরের ইউনিয়ন মন্ত্রী টিন্ট সোয়ে।

গত বুধবার সচিব ও মন্ত্রী পর্যায়ে দিনব্যাপী আলোচনার পর প্রত্যাবাসন চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়। তবে চুক্তির খসড়া নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দুই মাস ধরে আলোচনা চলছিল। এর মধ্যে অন্তত ছয়বার চুক্তির খসড়া বিনিময় করা হয়েছে।

গতকাল সকাল ১০টায় মাহমুদ আলী মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় পরামর্শক সু চির সাথে সাক্ষাৎ করেন। আর চুক্তি সই হয় বেলা ২টায়। চুক্তি সইয়ের পর দুই দেশের যৌথ সংবাদ সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। আগামী শনিবার ঢাকায় ফিরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে চুক্তির বিস্তারিত তুলে ধরবেন বলে মাহমুদ আলী জানান।

সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকদের মতে, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করার জন্য এক বছরের সময়সীমা বেঁধে দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমার প্রত্যাবাসন শুরুর সময় নির্ধারণে সম্মত হলেও সম্পন্ন করার সময়সীমার ব্যাপারে রাজি হয়নি। রোহিঙ্গা যাচাই-বাছাই এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ জাতিসঙ্ঘের উদ্বাস্তু সংস্থা ইউএনএইচসিআরের অন্তর্ভুক্তির ওপর জোর দিয়েছে। এটি নিয়ে মিয়ানমার কিছুটা নমনীয় হলেও আইনগত বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে সম্মত হয়নি। দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের জেডব্লিউসি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সার্বিক দিকটি দেখভাল করবে। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়ায় তাদের আবারো ফিরিয়ে নেয়ার পরিবেশ সৃষ্টিতে কিছু সময় লাগতে পারে জানিয়েছে মিয়ানমার। তিনি বলেন, আমরা অনেক বিষয়েই সমঝোতায় পৌঁছেছি। তবে আমাদের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। এ ধরনের সমঝোতার ক্ষেত্রে প্রত্যাশার সম্পূর্ণ পূরণ সম্ভবও হয় না।

চুক্তির ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নেইপিডোতে অবস্থানরত সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আমরা প্রথম পদক্ষেপ সম্পন্ন করেছি। এখন দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হবে।

সু চির দফতরে প্রত্যাবাসন চুক্তি ছাড়াও নাফ নদী সংলগ্ন স্থলসীমানা নির্ধারণে ১৯৯৮ সালে সই হওয়া চুক্তির অনুস্বাক্ষর বিনিময় এবং নাফ নদীর সীমানা সংক্রান্ত সম্পূরক প্রটোকল সই হয়। এই প্রটোকলের ব্যাপারে দুই দেশ ২০০৭ সালে সমঝোতায় পৌঁছেছিল। এ ছাড়া রাখাইন রাজ্যের জন্য বাংলাদেশ সরকারের উপহার হিসেবে তিনটি অ্যাম্বুলেন্স হস্তান্তর করা হয়।

সু চির সাথে সাক্ষাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমারের (বিসিআইএম) আওতায় বাণিজ্য, জ্বালানি ও কানেক্টিভিটি সংক্রান্ত সহযোগিতার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।

মিয়ানমার সরকার কর্তৃক ইস্যুকৃত পরিচয়পত্র দেখাতে হবে : এমওইউর ব্যাপারে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাথে আলাপকালে মিয়ানমারের শ্রম, অভিবাসন ও জনসংখ্যাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পার্মানেন্ট সেক্রেটারি মিন্ট কাইং বলেন, ১৯৯২-৯৩ সালের প্রত্যাবাসন চুক্তির ভিত্তিতে এমওইউটি সই হয়েছে। ১৯৯২-৯৩ সালের প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী মিয়ানমার সেই সব উদ্বাস্তুকে গ্রহণ করবে, যারা মিয়ানমার সরকার কর্তৃক ইস্যুকৃত পরিচয়পত্র দেখাতে পারবে। গ্রহণযোগ্য পরিচয়পত্রের মধ্যে রয়েছে বর্তমানে বিতরণ করা ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড, আগে প্রত্যাহার করা হোয়াইট কার্ড এবং হোয়াইট কার্ড জমা দেয়ার রসিদ।

তিনি বলেন, রাখাইন রাজ্যে ফিরতে চাওয়া বাস্তুচ্যুতদের ব্যক্তিগত বিবরণ সংবলিত একটি ফরম পূরণ করতে হবে। বাংলাদেশ এই ফরমগুলো পাঠালে যত দ্রুত সম্ভব আমরা উদ্বাস্তুদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত রয়েছি। পার্মানেন্ট সেক্রেটারি বলেন, উদ্বাস্তুদের পরিবারের সদস্যদের নাম, মিয়ানমারে আগের ঠিকানা, জন্মতারিখ এবং স্বেচ্ছায় ফিরতে চাওয়া ফরম দাখিল করতে হবে।
কূটনীতিকদের মতে, চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে উদ্বাস্তুদের ফেরার শর্ত এবং ইউএনএইচসিআরের ভূমিকা। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর মধ্যে রয়েছে ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য সহিংসতা থেকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেয়া, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের আইনগত অধিকারের সুরাহা এবং তাদের আদি নিবাসে ফেরার সুযোগ।

সু চির দফতর থেকে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বন্ধুত্বপূর্ণ ও সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে এমওইউ সই হয়েছে। দুই প্রতিবেশী দেশের যেকোনো ইস্যুই দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমে সুরাহা করতে হবে।

এর আগে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে ১৯৭৮ সালে দুই দেশ চুক্তি করেছিল। সেই চুক্তির অধীনে দুই লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা ছয় মাসের মধ্যে ফেরত গিয়েছিল। পরে ১৯৯২ সালে দুই দেশের মধ্যে আরেকটি সমঝোতা হয়, যার অধীনে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দুই লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত যায়। তবে এতে সময়সীমা নির্ধারিত না থাকায় ২০০৫ সালের পর আর কোনো রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ফেরত নেয়নি।

গত ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগসহ নজিরবিহীন দমন-পীড়ন শুরু হলে ছয় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আরো প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।

প্রত্যাবাসন চুক্তির অগ্রগতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। নেইপিডোতে সদ্যসমাপ্ত আসেম বৈঠকে ইউরোপ ও এশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় এই চুক্তি সইয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। আন্তর্জাতিক ফোরামে মিয়ানমারের জোরালো সমর্থক চীন উদ্বাস্তু সঙ্কট নিরসনে যে তিন দফা প্রস্তাব দিয়েছে- প্রত্যাবাসন চুক্তি তার অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রও এই চুক্তি সইয়ের জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল।

মিয়ানমারের সাথে দ্বিপক্ষীয়ভাবে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে ব্যর্থ হয়ে বাংলাদেশ ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এ ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে বেশ কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু চীন ও রাশিয়ার বিরোধিতার কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়। পরে ইসলামি সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) ইস্যুটি জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটিতে উত্থাপন করলে চীন, রাশিয়াসহ মিয়ানমারের সমর্থক ১০টি দেশ এর বিপক্ষে ভোট দেয়। তবে কমিটির ভোটাভুটিতে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রস্তাবটি পাস হয়। আগামী ডিসেম্বরে প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য সাধারণ পরিষদে উত্থাপন করা হবে। কিন্তু সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকায় এর প্রভাব সীমিত। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নিতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ভেটো ক্ষমতার অধিকারী চীন ও রাশিয়া।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে পরিষ্কার করে বলে গেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুটি আন্তর্জাতিক ফোরাম নয়, মিয়ানমারের সাথে দ্বিপক্ষীয়ভাবেই নিরসন করতে হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা বিশ্ব রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে ব্যাপকভাবে সমর্থন দিচ্ছে। -ডেস্ক