মো. নুরুন্নবী বাবু (দিনাজপুর২৪.কম) দুই দেশের আইনী জটিলতার কারণে পাচার হয়ে যাওয়া বাংলাদেশি ৪৭ শিশু-কিশোর ভারত থেকে দেশে ফিরতে পারছে না। ফলে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুঘাট শুভায়ণ অবজারভেশন হোমে দেড় থেকে দুই বছর ধরে আটক থাকায় তারা চার দেওয়ালের মধ্যে মানবেতর জীবন যাপন করছে। একারণে মানুষিক ও শারীরিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েছে শিশু-কিশোররা। দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত সহ আশে-পাশের সীমান্ত দিয়ে বিভিন্ন সময়ে দালালেরা প্রলোভন দিয়ে তাদের ভারতে পাচার করে।
এদিকে তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না এমন অভিযোগে হোমে গত ২৯ ও ৩০ জুলাই ওই শিশু-কিশোররা খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে অনশন পালন করে। দেশে দ্রুত ফেরত পাঠানো হবে শুভায়ণ অবজারভেশন হোমের কর্মকর্তা ও এনজিও প্রতিনিধিদের কাছে আশ্বাস পেয়ে তারা অনশনভঙ্গ করে এবং ১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ৩৮ শিশু-কিশোর একটি আবেদন করে।
দক্ষিণ দিনাজপুরের স্পার এর জেলা সঞ্চালক সুরজ দাস জানান, শুভায়ন হোমে এই মুহূর্তে ৪৭ জন বাংলাদেশী শিশু আটক আছে। যাদের বেশির ভাগের দু বছর ধরে এই হোমে আছে। এদের কেউই কোনও সাজা ভোগ করছে না। কিন্তু কেবল মাত্র দুদেশের আইনি জটিলতায় এরা বন্দী জীবন যাপন করছে। এরা বেশির ভাগ কাজের সন্ধানে এদেশে অনুপ্রবেশ করে। কেউ বা বেড়ানোর উদ্দেশে কেউ আবার আত্মীয়ের বাড়িতে এসে ধরা পরে।
দক্ষিণ দিনাজপুরের শুভায়ণ অবজারভেশন হোমের সুপারিনটেনডেন্ট দাওয়াদর্জি শেরপা জানান, এরা সকলেই আঠার বছরের কম বয়সী। এদের বিরুদ্ধে কোনও মামলা করা হয় না। শুধুমাত্র কেবল দুদেশের আইনী জটিলতার কারণেই এদের দেশে ফেরত পাঠাতে বিলম্ব হয়। শিশুরা মনে করে আমরা তাদের ফেরত পাঠাতে দেরি করছি, আসলে এমনটা নয়। বাংলাদেশ থেকে তাদের নাম-ঠিকানা আসতে অনেক সময় লেগে যায়। তাই ফেরত পাঠাতে বিলম্ব হয়। তবে অচিরেই তাদের ফেরত পাঠাতে সকল ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
এদিকে আটক থাকা শিশুরা হলো, দিনাজপুরের কাহারোলের সোহেল রানা, মিজানুর রহমান, অমৃত রায়, গৌতম রায়, সুজন আলী, আজিজুল ইসলাম, সদরের মোস্তফা, বীরগঞ্জের আরিফুল ইসলাম, হাকিমপুরের সুজন, রহান কবির, খুলনার দৌলতপুরের রাফি শেখ, যশোহরের ইলিয়াস আলী, পাবনার ফরিদপুরের এনামুল হক, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের অসীম, মুকিদুল, বালিয়াডাঙ্গির বাদশা হক, চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেনারুল ইসলাম, সোহেল রানা, কক্সবাজারের উখিয়ার ইলিয়াস, চকরিয়ার রবি আলম, বান্দরবান আলীকদমের নুরল ইসলাম, কুমিল্লার বুড়িচংয়ের আলামিন, ঢাকার কেরানীগঞ্জের জুবায়ের আহমেদ, সোহান শেখ, রাজশাহীর গোদাগাড়ীর মমিন, কৃষ্নো নাথ, কৃষ্নো টপ্প, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর দুলাল আলী, জাহিদ হাসান, রাজু ইসলাম, নাজমুল হক, স্বাধিন আসলাম, নাগেশ্বরীর মুসে আলী, তসলিম আলী, পঞ্চগড়ের দেবিগঞ্জের স্বপন রায়, সুজন, পটুয়াখালির কলাপাড়ার রয়েল হোসেন, জয়পুরহাটের কালাইয়ের জুনেত সহ ৪৭ শিশু-কিশোর।
বিভিন্ন সুত্রে জানাগেছে, বাংলাদেশ অংশের দিনাজপুর এবং জয়পুরহাট-এর সাথে ভারতের প্রায় ২৬২ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। আর এই সুযোগে দালালেরা হিলি, পাঁচবিবি, জয়পুরহাট, বিরামপুর ও দিনাজপুর সীমান্তের অবৈধ পথে পুরুষ-মহিলাদের পাশাপাশি এসব শিশু-কিশোরদের চাকরির প্রলোভনে অনায়াসেই পাচার করছে ভারতে। কোনো কোনো শিশু ভারতীয় বিএসএফ এবং পুলিশের কাছে ধরা পড়লেও এর বেশিভাগ শিশু পাচার হয়ে যাচ্ছে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। কিন্তু পাচারকারীরা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আটক হওয়া শিশুদের পাসপোর্ট না থাকার অপরাধে (১৮ বছরের নীচে) জেল-হাজতের পরিবর্তে দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুঘাট শুভায়ন অবজারভেশন হোমে (শিশু কল্যাণ আবাস) আটক রাখা হয়। এদের কেউ-কেউ ভাগ্যের জোরে দেশে ফিরতে পারলেও অনেকেই দুই দেশের আইনী জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে থেকে যায় সেখানে। ফলে পরিবার-পরিজন ছাড়া মানবেতর জীবন-যাপন করতে হচ্ছে তাদের।