(দিনাজপুর২৪.কম) এক মহাশক্তির ইশারায় খুনি চালকরা আজো শক্তিমান। কি হচ্ছে? সব কি নিয়ন্ত্রণহীন! সড়কে মহামারি! সড়কে মৃত্যু কারো কাম্য নয়। আর কতদূর গেলে যন্ত্রদানব ঘাতকদের কঠিন শাস্তির সম্মুখীন করা সম্ভব হবে? ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে বেপরোয়া বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর হত্যার ঘটনায় ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা এভাবেই নিজেদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) ও বাংলাদেশ হেলথ ইনজুরি সার্ভে (বিএইচআইএস) অনুযায়ী দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩ হাজার ১৬৬ জন নিহত হয়। গড়ে প্রতিদিন নিহত হয় ৬৪ জন। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পরিবহণ একটি সেবা খাত হলেও তাদের কর্মকাণ্ড ও অর্থলিপ্সা জুলুমের সীমাই শুধু অতিক্রম করেনি বরং আইনশৃঙ্খলাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। সড়কের নিরাপত্তার দাবিতে সামাজিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া সংগঠন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’র (নিসচা) তথ্যানুসারে, ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা ২০১৬ সালের তুলনায় বেড়েছে। গত বছর সারাদেশে ৩ হাজার ৪২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ২৮৪ জন নিহত ও ৯ হাজার ১১২ জন আহত হয়েছে। নিহতের তালিকায় ছিল ৫১৬ জন নারী ও ৫৩৯ জন শিশু। সংগঠনটির দাবি পৃথিবীর কোনো দেশে এত ব্যাপক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে না এবং যানবাহনসংক্রান্ত হতাহতের রেজিস্টারও এত বড় হয় না। ঘর থেকে বের হয়ে কেউ যে নিরাপদে বাসায় ফিরে আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। জীবন হাতে নিয়ে ঘর থেকে বের হতে হয়, ভয় লাগে বাহনরূপী দানবগুলো হয়তো এখনই পিষে মেরে ফেলবে। অভিযোগ রয়েছে, সড়কে নৈরাজ্যের কারণেই বাড়ছে দুর্ঘটনা। নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। দীর্ঘ হচ্ছে পঙ্গুত্বের হার। তবে সেতুমন্ত্রীর দাবি বর্তমানে সড়কে নৈরাজ্য নেই, আছে কিছু বিশৃঙ্খলা । আইন পাস হলে এগুলো দূর করা হবে। আইন হলে যানজট ও সড়কের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আসবে। ছোট ছোট পরিবহণ মালিক ও শ্রমিকদের অভিযোগ, গাড়ি প্রতি মোটা অঙ্কের চাঁদা পরিশোধ করেই টার্মিনাল থেকে তাদের গাড়ি বের করতে হয়। এসব টাকা চলে যায় পরিবহণ নেতাদের পকেটে। অপরদিকে পরিবহণ মালিকদের অভিযোগ, পুলিশের চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলেন, পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্র নেই, যেখানে এত কোম্পানি ভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। গণপরিবহণে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে মোবাইল কোম্পানির মতো দেশে গুটি কয়েক কোম্পানিকে গণপরিবহণের লাইসেন্স থাকা উচিত। রাজধানীতে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ পরিবহণ সেক্টরে নৈরাজ্য। ট্রিপের সংখ্যা বাড়াতে এবং বেশি যাত্রীর আশায় চালকরা বেপরোয়া গাড়িচালায়। আর এতেই ঘটে বিপত্তি। ট্রিপভিত্তিক না হয়ে বেতন নির্ধারণ করে দেয়া হলে চালকদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ হতো। এ ধরনের একটি উদ্যোগ নেয়া হলেও অদৃশ্য ইশারায় সে প্রক্রিয়া থেমে আছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা এটা হচ্ছে গণপরিবহণের কোম্পানিগুলো। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্র নেই, যেখানে এত কোম্পানিভিত্তিক গণপরিবহণ ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। গণপরিবহণে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে মোবাইল কোম্পানির মতো দেশে গুটিকয়েক কোম্পানিকে গণপরিবহণের লাইসেন্স দিতে হবে। অসুস্থ প্রতিযোগিতা করে গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করছে বাস মালিকরা। তাই ঢাকা শহরকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আধুনিক ও সংগঠিত গণপরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দুর্ঘটনা, যানজট এবং নৈরাজ্য ঠেকাতে গণপরিবহণ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে। সমন্বিত গণপরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনবসতিপূর্ণ মহানগরীর মধ্যে একটি হচ্ছে আমাদের ঢাকা। যানজটে অচল, স্থবির এই মহানগরী। দেড়-দুই কোটি লোকের বসবাস এখানে। আগামী দেড় দশকে ঢাকার জনসংখ্যা ৫৫ শতাংশ বেড়ে যাবে। তখন যানজট বেড়ে হবে দ্বিগুণ। গণপরিবহণ এমন একটা পরিবহণ যেটা স্বল্প ব্যয়ে, স্বল্প সময়ে ৪৭-৫২ শতাংশ যাত্রীকে বহন করে। অথচ বাস সার্ভিসে অরাজকতা চলছে। ঢাকা শহরে ২৬৫টি রুটে সাত হাজারের মতো বাস চলে। এগুলোর জন্য রয়েছে প্রায় ৩শ কোম্পানি। এরা নিজেদের মধ্যে নিজেরাই প্রতিযোগিতায় মেতেছে। মানুষকে চাপা দিয়ে মারছে। এমনকি একই যাত্রীর জন্য একটি কোম্পানির গাড়িও নিজেদের মধ্যে কম্পিটিশন করছে। গত রোববার বিমান বন্দর সড়কের ঘটনা এর বাস্তব উদাহরণ। গাজীপুর থেকে ঢাকা আসতে ৩৫টি কোম্পানির গাড়ি চলে। অথচ যাত্রী কিন্তু গাজীপুর টু ঢাকার একই। এই ৩৫টি কোম্পানি এক হাজার ৯৮০টির মতো বাস চালায়। মোজাম্মেল হক বলেন, ঢাকা উত্তরের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক এ ধরনের বিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সুশৃঙ্খল গণপরিবহণ ব্যবস্থা নামে একটি প্রকল্প চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার উদ্যোগ ছিলো কোম্পানিগুলোকে কিভাবে একটি কোম্পানির অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তিনি ওই প্রকল্পের আহ্বায়ক ও উদ্যোক্তা হয়ে কাজ করছিলেন। তার পরিকল্পনা ছিলো বাস সিস্টেমকে কিভাবে নিয়মের মধ্যে আনা যায়। পুরো ঢাকায় ৬টি কোম্পানির মাধ্যমে গণপরিবহণ চলবে। এজন্য তিনি বাস মালিক-শ্রমিক, ব্যাংক এবং সরকারের সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করেছিলেন। বাস রুট স্পেশালাইজেশন ও কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনার একটি উদ্যোগ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীও দিয়েছিলেন। যেখানে বিদ্যমান বাস মালিকরাই কোম্পানির আইনের অধীনে হবেন নতুন কোম্পানির মালিক। বর্তমান বাসের অনুপাতে শেয়ার নির্ধারণ করার কথা। তাতে একই রুটের বিভিন্ন বাসের মধ্যে প্রতিযোগিতা কমবে। কিন্তু আনিসুল হকের আকস্মিক মৃত্যুর পর এ প্রকল্প ও উদ্যোগ এখন ডিপ ফ্রিজে। তার এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় আজকের যে গণবিস্ফোরণ হয়তো সেটো হতো না। কারণ চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতার প্রশ্নই আসতো না। সবকিছুই থাকতো একটা সিস্টেমে। কিন্তু এ পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় অনেক স্বার্থপর নেতা। কারণ এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে অনেক পরিবহণ নেতার নেতৃত্ব থাকবে না। তাদের চাঁদাবাজি বন্ধ হয়ে যাবে। এমপি-মন্ত্রী হতে পারবেন না। ওইসব নেতারাই সকল ভালো উদ্যোগের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে। মোজাম্মেল হক চৌধুরী আরও বলেন, গণপরিবহণকে যদি মানুষের চলাচলের জন্য সহজ করা না যায়, তাহলে আগামী দিনে আরও জনদুর্ভোগ পোহাতে হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাস মালিকের অভিযোগ, গুলিস্তান কিংবা সায়েদাবাদ থেকে দূরপাল্লার কোনো গাড়ি গন্তব্যে যেতে হলে অন্তত ৮ ভাগে চাঁদা দিতে হয় টার্মিনালে বসেই। রাস্তার খরচ তো বাদই। এখানে ঢাকা সড়ক পরিবহণ সমিতির নামে ১২০টাকা, সিটি কর্পোরেশনের নামে ৬০ টাকা, টার্মিনাল কমিটির নামে ২০ টাকা, যানজট নিরসনের নামে ১০ টাকা, শ্রমিক ইউনিয়নের নামে আরও ৬০ টাকা, সংশ্লিষ্ট কোম্পানি মালিকদের দিতে হয় ১০০ টাকা। শুধু টাকা আর টাকা। এছাড়া রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন প্রগামের নামে নেতারা টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। সকল টার্মিনালেই একই চিত্র। চালকরা অসহায়। তবে মালিক পরিবহণ নেতাদের দাবি পুলিশের চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি। সায়েদাবাদ থেকে একটি গাড়ি গাজীপুর যাওয়া পর্যন্ত যতগুলো পুলিশ বক্স আছে সবগুলোতেই সাপ্তাহিক হারে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়। মালিক সমিতিই এই টাকা পৌঁছে দেয়। অন্যথায় বিভিন্ন ত্রুটির নামে গাড়ি আটকে রাখে পুলিশ। সড়ক পরিবহণ সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, মালিক সমিতি, সরকার ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শসহ সমন্বিত উদ্যোগ নিলে পরিবহণ চলাচলে নাগরিক সুবিধা আরও বাড়ানো সম্ভব। গতকাল তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সড়ক সংক্রান্ত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে বিস্তারিত আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। তিনি বলেন, লাইসেন্সবিহীন কিংবা বিনা পারমিটে যারা গাড়ি চালায় তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে, শাস্তি দেয়া হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের যে আইন তা তারা পালন করবে, আমরা তাদের সহযোগিতা করবো। বিশেষজ্ঞরা বলেন, গণপরিবহণ একটি সেবা খাত হলেও তাদের কর্মকাণ্ড ও অর্থলিপ্সা জুলুমের সীমাই শুধু অতিক্রম করেনি। বরং আইনশৃঙ্খলাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণেই দুর্ঘটনার নামে একের পর এক নির্মম হত্যাকা- ঘটানো হচ্ছে। এসব ঘটনাকে কেউ কেউ সরাসরি হত্যাকাণ্ড বলে উল্লেখ করেছেন। গত রোববার বিমানবন্দর সড়কে দুই কলেজ শিক্ষার্থী মীম ও রাজিবের নির্মম মৃত্যুর ঘটনায় শোকের পাশাপাশি বিক্ষোভও ছড়িয়ে পড়েছে। এর আগে গত ৩ এপ্রিল দুই বাসের প্রতিযোগিতায় ডান হাত হারানোর পর না ফেরার দেশে চলে যায় পিতা-মাতাহীন তিতুমীর কলেজের মেধাবী ছাত্র রাজীব হোসেন। ৬ মে দুই বাসের চাপায় পড়ে ভেঙে গেছে রিক্শা আরোহী আয়েশা খাতুনের মেরুদণ্ড। গৃহপরিচারিকার কাজ করতে ঢাকায় আসা রোজিনা গত ২০ এপ্রিল রাতে বনানীর চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকায় বিআরটিসি দোতলা বাসের চাপায় মারা যান। এমন ঘটনা অহরহ ঘটেই চলেছে। এর শেষ নেই। উচ্চ আদালতেরও নজরে এসেছে এসব। কিন্তু চালকদের বেপরোয়া ও খামখেয়ালি মনোভাবের পরিবর্তন ঘটেনি। গাড়ির ভেতরে ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটিয়েও এরা পার পাচ্ছে। গণপরিবহণ যখন এতই বেপরোয়া, তখনো পুলিশের কাছে এ ধরনের শ্রমিকদের কোনো তথ্য নেই। অনেকের মতে, সড়কে যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে শক্তিশালী পরিবহণ সিন্ডিকেট সংশ্লিষ্ট মহলকে ম্যানেজ করে ফেলে। এদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি প্রক্রিয়াই গ্রহণ করা যায় না। এদিকে মীম ও রাজিবের ঘটনায় সারাদেশ যখন উত্তাল, ঠিক সে মুহূর্তে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে গতকাল বুধবার জরুরি বৈঠকে বসেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বৈঠক শেষে তিনি জানান, আগামী সপ্তাহে প্রস্তাবিত সড়ক নিরাপত্তা আইন অনুমোদনে মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে। আগামী দুই মাসের মধ্যে আইনটি সংসদে পাস হবে। -ডেস্ক