(দিনাজপুর২৪.কম) বিমান থেকে বাংলাদেশে নেমেই ব্যাংকের বুথ থেকে টাকা লুট করে ধরা খেয়েছে ৬ বিদেশি। তারা অল্প সময়ের মধ্যেই কোটি কোটি টাকা লুট করার পরিকল্পনা নিয়েই ঢাকায় এসেছিল বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে অটোমেটেড টেলার মেশিন বা এটিএম বুথ থেকে এমন জালিয়াতির ঘটনা কখনো ঘটেনি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তার কারণ হচ্ছে, বাড্ডা এলাকায় ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলা হলেও তার কোনো রেকর্ড ব্যাংকের সার্ভারে নেই। শুধু তাই নয়, কোনো গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব থেকে টাকাও কমেনি।

যা এদেশের ব্যাংক খাতে কখনো হয়নি বলে জানা গেছে। অপরদিকে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বুথ থেকে টাকা লুটের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত ৬ বিদেশির বিরুদ্ধে রাজধানীর খিলগাঁও থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। ওই মামলায় দেনিস ভিতোমস্কি (২০), নাজারি ভজনোক (১৯), ভালেনতিন সোকোলোভস্কি (৩৭), সের্গেই উইক্রাইনেৎস (৩৩), শেভচুক আলেগ (৪৬) ও ভালোদিমির ত্রিশেনস্কি (৩৭) ও ভিতালি ক্লিমচুককে (৩১) পলাতক দেখিয়ে আসামি করা হয়।

গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, জিজ্ঞাসাবাদেও তারা কেউই তথ্য দিচ্ছেন না। আর দায়েরকৃত এ মামলায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে ৮ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে প্রত্যেককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

অভিনব এ নতুন কৌশলে টাকা চুরির ঘটনা নতুন করে চিন্তার ছাপ ফেলেছে দেশের ব্যাংকারদের মধ্যে। কারণ, এর আগে যতবারই এটিএম থেকে টাকা চুরি হয়েছে, প্রতিবারই গ্রাহকের কার্ডের তথ্য চুরি করে ক্লোন কার্ড তৈরি করেছিলেন জড়িত ব্যক্তিরা। প্রতিবারই গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।

এবারের ঘটনায় পুরো এটিএম বুথের নিয়ন্ত্রণ নেন জড়িত বিদেশিরা। কীভাবে তারা বুথ থেকে টাকা চুরি করলেন, তার কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও পুলিশ কর্মকর্তারা। এতে দেশের এটিএম সেবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গত শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিদেশি দু্ই নাগরিক ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বাড্ডায় দুটি এটিএম বুথ থেকে বিভিন্ন কার্ড ব্যবহার করে একাধিকবার টাকা উত্তোলন করেছেন। বুথ থেকে একজন বের হয়ে আবারো টাকা তোলেন। এ সময় বুথে নিরাপত্তাকর্মীরাও উপস্থিত ছিল।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, টাকা উত্তোলনের সময় মাস্ক দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করেছেন তারা, চোখে ছিল সানগ্লাস, মাথায় ছিল টুপি।

জানা গেছে, গত শনিবার সকালে বাড্ডার এটিএম বুথের টাকার হিসাব মেলানোর সময় তিন লাখ টাকা কম হয়। ওই এটিএমের দায়িত্বে ছিলেন ওরনেট গ্রুপের নিরাপত্তাকর্মী। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দুই বিদেশি কর্তৃক টাকা উত্তোলনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়।

এরপর সব এটিএম বুথে নিরাপত্তা বাড়ায় ডাচ-বাংলা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। আর শনিবার রাতেই খিলগাঁওয়ের তালতলা এলাকায় ডাচ্-বাংলার এটিএমে টাকা চুরি করতে গেলে দুই বিদেশির একজন ধরা পড়েন। পরে আরও পাঁচ বিদেশিকে আটক করে পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এটিএম বুথ থেকে প্রতিবার টাকা উত্তোলনের সময় কয়েক ধরনের তথ্য ব্যাংকের সার্ভারে জমা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকের হিসাব নম্বর, টাকা উত্তোলনের সময়, উত্তোলনের পৃথক নম্বর, টাকার পরিমাণ ও অবশিষ্ট টাকার তথ্য। টাকা উত্তোলনের সময় গ্রাহক নিজেও এসব তথ্যসংবলিত রসিদ পেয়ে থাকেন।

ব্যাংকগুলো এসব তথ্য এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করে। কারণ, এটিএমে টাকা উত্তোলনসংক্রান্ত অনেক অভিযোগ আসে, যাতে অভিযোগগুলো যাচাই করা যায়। কিন্তু ডাচ্?-বাংলা ব্যাংকের এ ঘটনায় এটিএম বুথ থেকে ব্যাংকটির সার্ভারে বিদেশিদের টাকা উত্তোলনের কোনো তথ্য যায়নি। এতেই চিন্তায় পড়েছে ব্যাংকের সংশ্লিষ্টরা।

ডাচ্?-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম মো. শিরিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এখনো জানতে পারিনি কীভাবে তারা টাকা উত্তোলন করলো। কারণ, কোনো গ্রাহকের হিসাব থেকে টাকা কমে যায়নি। তবে বুথের টাকা কমে গেছে। তারা কোনো গ্রাহকের হিসাবও হ্যাক করেনি। আমরা নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেব।’ বিদেশিরা কেবল ডাচ্?-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথেই হানা দিয়েছেন কি না তা জানা যায়নি। তবে এখন অন্য ব্যাংকও তাদের বুথের নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়িয়েছে।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের এটিএম যন্ত্রের ৯০ শতাংশ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এনসিআর কর্পোরেশনের। ডাচ্?-বাংলা ব্যাংকের ওই এটিএম বুথও ছিল এনসিআর কর্পোরেশনের। বাংলাদেশে বর্তমানে ১ কোটি ৬০ লাখ ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। এটিএম বুথ রয়েছে ১০ হাজার ৫৩৬টি। পয়েন্ট অব সেলস রয়েছে ৪৯ হাজার ৬২টি। দেশের ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে ৫১টি ব্যাংক কার্ড সেবার সঙ্গে যুক্ত।

এটিএম বুথে জালিয়াতি
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সম্পূর্ণ নতুন ও অভিনব পদ্ধতিতে জালিয়াতি করা হয়েছে। এর আগে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি ইস্টার্ন, সিটি ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চার এটিএম বুথ থেকে তথ্য চুরি করে ক্লোন কার্ড তৈরি করেন বিদেশিরা। তখন ৪০টি কার্ড ক্লোন করে গ্রাহকের ২০ লাখ টাকা তুলে নেয়া হয়। ২০১৮ সালে বনানী এলাকার একটি সুপারশপ থেকে গ্রাহকদের তথ্য চুরি হয়।

আর ক্লোন কার্ড তৈরি করে ৪৯ গ্রাহকের হিসাব থেকে টাকা তুলে নেয়া হয়। ভুক্তভোগীরা ছিলেন ব্র্যাক, দ্য সিটি, ইস্টার্ন, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) ও ব্যাংক এশিয়ার গ্রাহক। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ডাচ্-বাংলা বুথের টাকা লুটের ঘটনায় গ্রেপ্তার ছয়জনই ইউক্রেনের নাগরিক। তারা গত বৃহস্পতিবার বিকালে তুর্কি এয়ারওয়েজের একটি বিমানে করে ইউক্রেন থেকে ইস্তাম্বুল হয়ে বাংলাদেশে আসেন।

আগামী ৬ জুন তাদের ভারতে যাওয়ার কথা ছিল। গ্রেপ্তার ছয়জনসহ আরও একজনের বিরুদ্ধে খিলগাঁও মডেল থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ৫০টির মতো কার্ড পাওয়া গেছে, যার অধিকাংশতেই ‘ডিসকাউন্ট’ লেখা। তাদের কাছ থেকে মুখোশ, টুপি, সানগ্লাস, ছয়টি মুঠোফোন এবং একটি আইপ্যাড জব্দ করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (পূর্ব) খিলগাঁও অঞ্চলের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহিদুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, গ্রেপ্তারকৃত বিদেশিদের কাছ থেকে যে কার্ডগুলো পাওয়া গেছে, সেগুলো এটিএম বুথে ঢোকানোর সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাংকের কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে ওই বুথের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর তারা নিজেদের মতো করে টাকা তুলে নিয়ে যান। এটি সম্পূর্ণ নতুন ও অভিনব পদ্ধতি। আগে কখনো এই পদ্ধতির ব্যবহার তাদের নজরে আসেনি।

আদালতকে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) গতকাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সংঘবদ্ধ ডিজিটাল জালিয়াত চক্রের সদস্যরা খিলগাঁওয়ের তালতলা মার্কেটের সামনের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের সিস্টেম হ্যাক করে। জালিয়াতির মাধ্যমে ওই বুথ থেকে টাকা তোলার সময় জনসাধারণের সহযোগিতায় আসামি দেনিস ভিতোমস্কিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আসামি দেনিস ভিতোমস্কিকে সঙ্গে নিয়ে হোটেল ওলিও ড্রিম হ্যাভেন থেকে বাকি পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, এই ছয় আসামি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক জালিয়াতি চক্রের সদস্য। তারা অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের সিস্টেম হ্যাক করেন। ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা তোলার জন্য এই আসামিরা বাংলাদেশে এসেছেন। -ডেস্ক