(দিনাজপুর২৪.কম) বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন (জিসিসি) নির্বাচনে ভোটগ্রহণ। এখন চলছে ভোট গণনা। পূর্ণাঙ্গ ফলাফল পাওয়ার পর বলা যাবে কত শতাংশ ভোট পড়েছে। মঙ্গলবার(২৬জুন) সকাল আটটায় শুরু হয়ে বিকেল চারটা পর্যন্ত একটানা এ ভোটগ্রহণ চলে। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের সমন্বয়ক তারেক আহম্মদ বলেন, চারটা থেকে গণনা শুরু হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রেই ফলাফল ঘোষণা হবে। আর কেন্দ্রীয়ভাবে ঘোষণা করা হবে রিটার্নিং কর্মকর্তার অস্থায়ী কার্যালয় থেকে। গাজীপুর সিটির দ্বিতীয় নগরপিতা হতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থী হলেন- আওয়ামী লীগ সমর্থিত মো. জাহাঙ্গীর আলম (নৌকা মার্কা) আর বিএনপি সমর্থিত মো. হাসান উদ্দিন সরকার (ধানের শীষ)।

প্রতিষ্ঠাকালের দিক থেকে কনিষ্ঠতম এবং আয়তনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় এই সিটিতে এবারই প্রথম দলীয় প্রতীকে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন গাজীপুর নগরবাসী। মঙ্গলবার (২৬জুন) বৃষ্টিভেজা সকালে ভোটগ্রহণ শুরুর পর বছিরউদ্দিন উদয়ন একাডেমি কেন্দ্রে ভোট দেন বিএনপির মেয়রপ্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার।

কোনাবাড়ির আ ক ম মোজাম্মেল হক উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে অন্যান্য দলের পোলিং এজেন্ট থাকলেও সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত বিএনপি প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট পাওয়া পায়নি। ভোট দিয়ে হাসান উদ্দিন অভিযোগ করেন, অনেকগুলো কেন্দ্র থেকে তার দলের নেতাকর্মী ও এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। এরপর আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম কানাইয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নিজের ভোটটি দিয়ে জানান, ভোট সুষ্ঠু হচ্ছে। বিএনপি প্রার্থীর অভিযোগ মিথ্যা বলেও দাবি করেন তিনি।

৫৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ৩২৯ দশমিক ৫৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশের সবচেয়ে বড় এই সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ মেয়র পদে ৭ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম ও সংসদের বাইরে থাকা বিরোধী দল বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের মধ্যে।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) হারুন অর রশীদকে প্রত্যাহারের জন্য নির্বাচন কমিশনে দাবি জানিয়ে আসছে বিএনপি। গতকালও ধানের শীষ প্রতীকের প্রধান এজেন্ট ও গাজীপুর জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক মো. সোহরাব উদ্দিন রিটার্নিং অফিসারের কাছে বিএনপি ও জোটের নেতাকর্মীদের গণগ্রেপ্তারের লিখিত অভিযোগ করেন।

তিনি নির্বাচনের আগ মুহূর্তে নেতাকর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড়ের অভিযোগ এনে বলেন, পুলিশের অভিযানের মুখে ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীসহ সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। রোববার রাতেও বিএনপির নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ও র‌্যাব। তাদের কারোর বিরুদ্ধেই কোনো মামলা নেই।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রায় শতাধিক কেন্দ্র থেকে বিএনপির এজেন্টদের বের করে দিয়ে নৌকা মার্কায় সিল মারার অভিযোগ করেছে বিএনপি। ভোটে গোলযোগ ঠেকানোর দায়িত্বে থাকা পুলিশই ভোট দিচ্ছে বলে অভিযোগ দলটির।

মঙ্গলবার (২৬জুন) সকাল আটটায় গাজীপুরে ভোট শুরুর তিন ঘণ্টারও বেশি সময় পর নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে দলের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানান বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এসময় তিনি এসব অভিযোগ করেন।

নির্বাচন কমিশন ছাড়াও আওয়ামী লীগের ‘সন্ত্রাসীরাও’ ব্যালট পেপার ছাপিয়েছে বলেও অভিযোগ রিজভীর। তিনি বলেন, ‘মুন্সিপাড়া ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেসে সারারাত ব্যালট পেপার ছাপিয়ে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা সেগুলো নিয়ে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে গেছে।’ ‘পুলিশ আওয়ামী ক্যাডারের ভূমিকা অবতীর্ণ হয়েছে। তাদের উপস্থিতিতে বিএনপির এজেন্ট বের করে দিয়ে সরকারি দলের প্রার্থীর পক্ষে নৌকা প্রতীকে সিল মারছে। ভোটার উপস্থিতি থাকলেও বলা হচ্ছে ভোট হয়ে গেছে।’

বিএনপি কোনো আলোচিত ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে সচরাচর সকাল আটটা থেকেই বিএনপি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন রিজভী। তবে রিজভী আজ ঘুমিয়েছেন বেলা করে। সকাল নয়টায় প্রথম ব্রিফিং করার কথা থাকলেও তিনি সাংবাদিকদের সামনে আসেননি। সকালে টঙ্গীর নিজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার ১০ কেন্দ্র থেকে তার এজেন্ট বের করে দেয়ার অভিযোগ করেছিলেন। এরপর তিনি আর কোনো অভিযোগ করেননি।

তবে রিজভী বলেন, ‘গাজীপুর সিটি নির্বাচন নিয়ে এ পর্যন্ত যে খবর পাচ্ছি তা উদ্বেগজনক। আমরা আগে যে সন্দেহ করেছিলাম গাজীপুরে তারই প্রতিফলন পাচ্ছি। নির্বাচন কমিশন এবার তাদের কথা রাখলেন না। তারা আরব্য উপন্যাসের একচোখা দৈত্যের মতো করছে।’ ‘বিএনপির এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। ঢুকলেও তাদের বের করে দেয়া হচ্ছে। এছাড়া গতকাল থেকে শুরু করে আজ সকাল পর্যন্ত অনেক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

রিজভী বলেন, ‘স্থানীয় এমপি জাহিদ রাসেলের এলাকায় এজেন্ট ও ভোটারদের ঢুকতে দেয়নি। কালিয়াকৈরৈর কয়েকটি কেন্দ্র থেকে বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দিয়েছে পুলিশ। পরে নিজেরাই সিল মারে। মুন্নু টেক্সটাইল কেন্দ্রে বাইরে ভোটার থাকলেও ভেতরে ফাঁকা।’‘৮ নং ধানের শীষের এজেন্ট বের করে দেয়া হয়েছে। ওই কেন্দ্রে কাউন্সিলরদের ব্যালট দেয়া হয়, মেয়রের ব্যালটে তারা নিজেরাই সিল মারে।’ ’৪১, ৫৫ নং ওয়ার্ড পুবাইলে সব এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। কাশিমপুরে পুলিশ নির্দেশ দিচ্ছে নৌকায় সিল মারতে।’ নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যের সঙ্গে কাজের মিল নেই দাবি করে রিজভী বলেন, ‘মানুষ কার উপর আস্থা রাখবে? এ নির্বাচন কমিশন ভাঙা হাড়ি। ভাঙা হাড়ি কখনও জোড়া লাগে না।’

এদিকে, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরুতেই বিএনপির পোলিং এজেন্টদের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দলের মেয়রপ্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার। মঙ্গলবার (২৬জুন) সকালে বশির উদ্দিন উদয়ন অ্যাকাডেমি ভোটকেন্দ্রে ভোটদান শেষে সাংবাদিকদের কাছে এমন অভিযোগ করেন তিনি। এসব অভিযোগ জানানোর জন্য রিটার্নিং অফিসারের খোঁজ করেও পাননি বলেও দাবি করে হাসান সরকার।

তিনি বলেন, মঙ্গলবার সকাল ৮টায় ভোট শুরু হওয়ার পর থেকে আধঘণ্টার মধ্যেই অন্তত ১০টি কেন্দ্র থেকে বিএনপির পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। বেশকিছু জায়গায় তাদের মারধর করার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি অনেক এজেন্টকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন বিএনপির এ প্রার্থী। এ ব্যাপারে হাইকোর্ট ও নির্বাচন কমিশনের কোনো নির্দেশনা সরকার মানছে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

হাসান সরকার বলেন, ‘আমি রাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে মুখে বলেছি যে, আপনাদের নির্দেশ থাকার পরও কেন আমাদেরকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে? উনি বলেছেন ‘আমি দেখছি’।’
তবে জনগণ ভোট মেনে নিলে তিনিও মেনে নেবেন জানিয়ে বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হলে আমি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত।

নির্বাচনী এলাকায় বহিরাগত থাকার বিষয়টি নিয়েও কিছু বলতে চান না বিএনপি প্রার্থী। তিনি বলেন, ‘এখানে ভোটার ১১ লাখ। কিন্তু অধিবাসী হবে ২০-২৫ লাখ। এখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ চাকরি করে। আমি কাকে বহিরাগত বলব?’

৪ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ: গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জোর করে ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ভরার চেষ্টার পর দুইটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে মিডিয়া সেলে দায়িত্বরত নির্বাচন কমিশনের সহকারী পরিচালক আশাদুল হক জানান, মঙ্গলবার(২৬জুন) বেলা ২টা পর্যন্ত ‘নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের জন্য’ ৯৮ নম্বর, ৩৮৩ নম্বর, ৩৭২ নম্বর ও ৩৭৩ নম্বর কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখার খবর তারা পেয়েছেন। মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে এ সিটির ৪২৫টি কেন্দ্রে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। ঘণ্টা তিনেক পর ৫১ নম্বর ওয়ার্ডের খরতৈল মনসুর আলী আদর্শ বিদ্যালয়ের দুটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

খরতৈল মনসুর আলী আদর্শ বিদ্যালয়-১ কেন্দ্রের (৩৭২ নম্বর কেন্দ্র) প্রিজাইডিং অফিসার মো. আমজাদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, “কেন্দ্রে কিছু লোক জোর করে প্রবেশ করায় বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখা হয়েছে।” পাশের কেন্দ্র খরতৈল মনসুর আলী আদর্শ বিদ্যালয়-২ (৩৭৩ নম্বর কেন্দ্র) এ অনিয়মের কারণে ভোট গ্রহণ বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানান সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মাসুদুল হক। তিনি বলেন, “দুটি কেন্দ্রে সাময়িকভাবে ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি ভালো হলে আবার শুরু হবে।”

৯৮ নম্বর কেন্দ্র গাজীপুরের ভোগড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়-১ (মূল ভবন) এর প্রিজাইডিং অফিসার ইবনে সালেহ মো.ফরহাদ বলেন, “কিছু লোকজন অতর্কিতে এসে ব্যালটে সিল মারা শুরু করে। তাই আমরা ভোটগ্রহণ স্থগিত রেখেছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি।” পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায়’ টঙ্গীর বড় দেওড়ার ডেফোডিলকিন্ডারগার্টেন-২ কেন্দ্রেও (৩৮৩ নম্বর কেন্দ্র) ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। -ডেস্ক