(দিনাজপুর২৪.কম) নির্বাচনি সমাবেশে দেওয়া মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা বেগমের বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম-ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে।

ওই ভিডিওতে মাহমুদা বেগমকে নির্বাচনি সভায় বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘যাদের মনে ধানের শীষের জন্য ভালোবাসা আছে, তারা ১৩ তারিখে ঠাকুরগাঁও ছেড়ে চলে যাবেন। ১৩ তারিখ সন্ধ্যার পর তাদের দেখতে চাই না। তাদের ভোট কেন্দ্রে আসার কোনও প্রায়োজন নেই। ভোটকেন্দ্রে যাবে শুধু নৌকার ভোটাররা।’

তার এই বক্তব্যের পর কেবল বিরোধী দলেরই নয়, আওয়ামী লীগের একাংশের মধ্যেও অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের একাধিক নেতা বলেছেন, আমরা মনে করি, গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনার ছবি ব্যবহার করে অগণতান্ত্রিক ভাষায় নির্বাচনি প্রচারণা, তাঁর ভাবমূর্তিরই অপূরণীয় ক্ষতি।

ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনি প্রচারণায় প্রকাশ্যে বিরোধী দলকে হুমকি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত হওয়ার আগে মাহমুদা বেগম গত বৃহস্পতিবার শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডে এক নির্বাচনি সভায় বলেন, ‘১৪ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁও পৌরসভায় ভোট। ঠাকুরগাঁওয়ে নৌকার প্রার্থী আঞ্জুমান আরা বেগম মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য। এ কারণে তার পক্ষে প্রচারণা চালাতে মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাফিয়া খাতুন ও সম্পাদক মাহমুদা কয়েক দিন ধরে ঠাকুরগাঁওয়ে রয়েছেন।’

এর আগে বুধবার আরেক পথসভায় তিনি বলেন, ‘সুস্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, যারা নৌকায় ভোট দিতে না চান, ১৩ তারিখ সন্ধ্যার পর তাদের চেহারা দেখতে চাই না। কোথায় যাবেন আমি জানি না। তবে ঠাকুরগাঁওয়ে থাকতে পারবেন না। যারা নৌকায় ভোট না দেবেন, তারা ঠাকুরগাঁও থেকে বিদায় নেবেন।’

নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মহিলা আওয়ামী লীগের এই নেত্রী বলেন, ‘একদম পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই, খাইদাই আমি জব্বারের, গান সালামেরটা গাইবো না। কালকে থেকে রাস্তায় কোনও ধানের শীষের পোস্টার দেখতে চাই না। ধান বলে কোনও কথা নেই। ধানের শীষ বলে কোনও কথা নেই। আমরা শুধু দেখতে চাই নৌকা আর নৌকা। যদি ধান থাকে, তবে ধরে নেবো এখানে আওয়ামী লীগ নেই।’

বক্তব্যের বিষয়ে মাহমুদা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে তার হুমকিসম্বলিত এসব সভায় যেসব নেতাদের দেখা গেছে তাদের অন্যতম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দ্বীপক কুমার রায়। তিনি এ প্রসঙ্গে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘ঠাকুরগাঁওয়ে কোনও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এলে বা সভা করলে দলীয় প্রটোকল অনুযায়ী জেলা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমাকে থাকতে হয়েছে। কিন্তু আমি তো এ ধরনের বক্তব্য দেইনি, কেউ বলতে পারবে না।’

তার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে নির্বাচনি পরিবেশ ঠিক আছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘এখানে তো স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আমাদের কোনও সংঘাত ঘটেনি। সবার পোস্টার আছে, অফিস চলছে, গণতান্ত্রিক পরিবেশে ভোট হচ্ছে।’

তবে এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আঞ্জুমান আরা বেগম বলেন, ‘পৌরসভায় ধানের শীষের ভোট তলানিতে ঠেকেছে। নিশ্চিত পরাজয় জেনে মাহমুদা আপার বক্তব্য এডিট করে বিএনপির লোকজন ছড়িয়ে দিতে পারে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কোথাও এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন না।’

আর ধানের শীষের প্রার্থী শরিফুল ইসলামের অভিযোগ, ‘মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা বেগমসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের এমন প্রকাশ্য বক্তব্যের পর ধানের শীষের কর্মীদের ভয় দেখানো হচ্ছে। সাধারণ ভোটাররাও এতে শঙ্কিত। ভোটারদের হুমকি দেওয়ার ভিডিওর সিডিসহ রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ জানানো হচ্ছে।’

বিএনপির জেলা সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান পৌর মেয়র মির্জা ফয়সাল আমীনের অভিযোগ, ‘অন্যায় করছে শাসক দল, আর যুবদল সভাপতি মহিবুল্ল্যা আবু নূরসহ বিএনপির নির্বাচনি নেতাকর্মী-সমর্থক-পোলিং এজেন্টদের মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হচ্ছে। ঠাকুরগাঁও জেলার ঐতিহ্যবাহী গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ আজ হুমকির মুখে।’

এ ব্যাপারে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা জিলহাজ উদ্দিন বলেন, ‘এ ধরনের কোনও সিডি আমরা পাইনি। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব বক্তব্য আমি শুনেছি, যা ঠিক হলে এটা গর্হিত কাজ। তদন্ত করে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ অভিযোগ যার বিরুদ্ধে সেই মাহমুদা বেগম কোথায় অবস্থান করছেন জানাতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সে ব্যাপারে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের আমি খোঁজ নিতে বলেছি, তিনি নাকি “সোনার বাংলা” রিসোর্টে অবস্থান করছেন, যা পৌরসভার বাইরে, তাই তার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।’

জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, ‘বিএনপি প্রার্থীর পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়ায়, তাকে মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা, পীরগঞ্জ পৌরসভার মতোই ভোটারদের ব্যাপক উৎসাহব্যঞ্জক উপস্থিতিসহ উৎসবমুখর পরিবেশে একটি সফল নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সাংবাদিকদের সহযোগিতা কামনা করছি।’ -ডেস্ক