( দিনাজপুর ২৪.কম) প্যারাসিটামল সিরাপে প্রাণঘাতী বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান থাকার অভিযোগে ২৩ বছর আগে ১৯৯২ সালে দায়ের করা দুটি চাঞ্চল্যকর মামলার রায় প্রদান করা হয়েছে। ভেজাল প্যারাসিটামল খেয়ে ৭৬ শিশুর মৃত্যুর ওই মামলায় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিসিআই (বাংলাদেশ) পরিচালক, ব্যবস্থাপকসহ ছয়জনকে দশ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তবে ওই সময় মাত্র ৭৬ শিশু নয়, কয়েকশ’ শিশু প্রাণ হারিয়েছিল। ঢাকা বিভাগীয় বিশেষ জজ ড্রাগ আদালতের বিচারক এম আতোয়ার রহমান গতকাল সোমবার এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। উভয় মামলার রায়ে প্রত্যেককে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা করে আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। অন্যথায় আরও ছয় মাসের অতিরিক্ত কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

দুই মামলায় দণ্ডিতরা হলেন- বিসিআইর তৎকালীন পরিচালক মো. শাহজাহান সরকার, উৎপাদন ব্যবস্থাপক এনতাজুল হক, মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপক আয়েশা খাতুন, নির্বাহী পরিচালক এএসএম বদরুজ্জোদা চৌধুরী, পরিচালক সামসুল হক ও নূরুন্নাহার বেগম। রায় ঘোষণার সময় শাহজাহান সরকার আদালতে উপস্থিত ছিলেন। অন্য পাঁচ আসামি পলাতক। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। রায় ঘোষণার পর শাহজাহান সরকারকে কারাগারে পাঠানো হয়। নূরুন্নাহার বেগম মো. শাহাজাহানের স্ত্রী। আসামিদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান, বশির আহমেদ ও আমিনুর রহমান চৌধুরী।বিসিআই (বাংলাদেশ) পরিচালক শাহজাহান চিরকুমার। রাজধানীর জিগাতলায় তার বাড়ি রয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি মতলবের সাদুল্যাপুরে। গতকাল আদালতে সাদা পাঞ্জাবি ও ধুতি পরে তিনি হাজির হন।

১৯৯২ সালের ১৮ নভেম্বর ওষুধ প্রশাসনের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক আবুল খায়ের চৌধুরী বাদী হয়ে ওষুধ নিয়ন্ত্রণ আইনে বিসিআইয়ের ওই ছয় কর্মকর্তাকে আসামি করে দুটি মামলা করেন। মামলায় ওই কোম্পানির বাজারজাত করা প্যারাসিটামল সিরাপে প্রাণঘাতী বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি রয়েছে মর্মে অভিযোগ করা হয়। বিসিআইর প্যারাসিটামল সিরাপ দুটি ব্যাচ নম্বরে থাকায় একই আইনে একই আসামিদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেন তত্ত্বাবধায়ক।

রায়ের আদেশে বলা হয়, এ মামলা দুটির অভিযোগ এবং আসামিরা এক। দুই মামলায় সাজার মেয়াদ একই। বিচার একসঙ্গে হলেও ঘটনাস্থল ভিন্ন। জেল কোডের বিধান অনুসারে পর্যায়ক্রমে মামলার সাজা কার্যকর হবে। পলাতক আসামিরা গ্রেফতার অথবা আদালতে আত্মসমর্পণের পর থেকে তাদের সাজা কার্যকর হবে। তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। রায়ের পর্যালোচনায় আদালত বলেন, ভেজাল প্যারাসিটামল ওষুধ তৈরি করা সমাজ ও মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ। তাই আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া বাঞ্ছনীয়। এ আইনে সর্বোচ্চ দশ বছর কারাদ ও ২ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

মামলায় সরকার পক্ষের আইনজীবী ও বিশেষ রাষ্ট্রপক্ষের কেঁৌসুলি মো. নাদিম মিয়া বলেন, ১৯৯২ সালে মামলাটি করা হলেও আসামিদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশে মামলার কার্যক্রম প্রায় দুই দশক ধরে স্থগিত ছিল। ২০১১ সালে উচ্চ আদালতের স্থগিত আদেশ প্রত্যাহারের পর মামলার বিচারিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়।

নাদিম মিয়া আরও বলেন, আদালতে ড্রাগ পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ওষুধে বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে, যা খেলে শিশুদের মুত্যু হতে পারে।’ তিনজন সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষে গতকাল বিচারক রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে নাদিম মিয়া আরও বলেন, ‘১৯৮২ সালের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ আইনে করা ওই দুটি মামলায় আদালত সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছেন। দুই দশকের বেশি সময় পর হলেও আমরা এ রায়ে খুশি। ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারীরা দেশ ও জনগণের শত্রু।’ তাদের রুখতে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

এ মামলায় অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় আসামিদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করা উচিত ছিল বলে মত দিয়েছেন ঢাকা বারের ফৌজদারি মামলার সিনিয়র আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো। তিনি বলেন, ‘তাদের তৈরি ওষুধ খেয়ে অনেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হলে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড হতো। আদালতে আসামির পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান, বশির আহমেদ ও আমিনুর রহমান চৌধুরী মিন্টু।

মামলা সূত্রে জানা যায়, প্যারাসিটামল সিরাপে (ব্যাচ নম্বর ৯২১০০২) বিষাক্ত উপাদান থাকায় ১৯৮৯ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে অনেক শিশু কিডনি সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে কমপক্ষে ৭৬ জনের মৃত্যু হয়। বিষয়টি অনুসন্ধানের পর রাজধানীর জিগাতলার কারখানায় বিসিআইয়ের উৎপাদিত প্যারাসিমসহ পাঁচ কোম্পানির তৈরি প্যারাসিটামল সিরাপে বিষাক্ত পদার্থ ধরা পড়ে। এর পর ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক আবুল খায়ের চৌধুরী ১৯৯২ সালের ১৮ নভেম্বর ড্রাগ আইনের দুটি ধারায় বিসিআই বাংলাদেশের ছয়জনকে আসামি করে মামলা করেন। ১৯৯৩ সালের ২ জানুয়ারি এ ছয় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। ১৯৯৪ সালের ২ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। অভিযুক্ত চার কোম্পানির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট মামলার কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। ২০১১ সালে সেই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হয়। এর পর গত বছর ৭ আগস্ট মূল মামলা শুনানি ফের শুরু হয়। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ২০ জন সাক্ষ্য দেন।

মামলায় ৭৬ শিশুর মৃত্যুর কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে ১৯৮০ সালের পরবর্তী সময়ে বিষাক্ত প্যারাসিটামল সিরাপ সেবনে কয়েকশ’ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। টেক্সটাইল পণ্য, রঙ ও সুপার গ্গ্নু জাতীয় পণ্যে ব্যবহৃত বিষাক্ত কেমিক্যাল ডাই ইথালিন গ্গ্নাইকোল প্যারাসিটামল সিরাপে মিশিয়ে দেওয়া হয়। ২০০৯ সালে রিড ফার্মার প্যারাসিটামল সেবনে মৃত্যু হয়েছে কমপক্ষে ২৯ শিশুর। গতকাল সোমবার আরেকটি মামলার রায় হলো। আরও একটি মামলা বিচারাধীন।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ও মামলার বাদী আবুল খায়ের চৌধুরী দিনাজপুর ২৪.কমকে বলেন, ১৯৯২ সালে মামলা করার পর থেকে অনেকে নানারকম ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছে। আসামি পক্ষের আইনজীবীকে জেলখাটার ভয়ও দেখিয়েছিল। এ পর্যন্ত ১২৩টি মামলা করেছেন তিনি।

ওষুধ প্রশাসনের পরিচালক আবুল খায়ের চৌধুরী বলেন, মামলা দায়েরের পর সংসদীয় কমিটিতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর পর তাকে খাদ্য ও জননিরাপত্তা আইনে মামলা করার পরামর্শ দেয় সংসদীয় কমিটি। সে অনুযায়ী তিনি মামলা করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘থানায় মামলা দায়েরের পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উল্টো আমাকেই মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়েছিলেন।’

অভিযোগে প্রকাশ, এর পর বছরের পর বছর বিভিন্ন অজুহাতে মামলাটি ঝুলিয়ে রাখে স্বার্থান্বেষীরা। এ কাজে জড়িত ছিল ওষুধ প্রশাসনের কিছু অর্থলোভী কর্মকর্তাও। এক পর্যায়ে মামলাটির কর্তৃত্ব নিয়ে তারা হাইকোর্টে যান। এ অবস্থা বহাল ছিল ২০১১ সাল পর্যন্ত। এর পর ওষুধ প্রশাসনের পুনঃআবেদনে মামলাটি ড্রাগ আদালতে ফেরত আসে। সকল প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লেগেছে ২৩ বছর।

গুরুপাপে লঘুদ :এদিকে ওষুধ প্রশাসন সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্র বলেছে, বিষাক্ত ওষুধ খাইয়ে শিশু মরার ঘটনায় হত্যা মামলা হতে পারত। উচ্চ আদালতে এ মামলায় আসামিদের ফাঁসি হতে পারে। এ জন্য পদস্থ কর্মকর্তাদের কয়েকজন দোষী কোম্পানির মালিকদের বাঁচাতে নেপথ্য ভূমিকা নেন।(ডেস্ক)