(দিনাজপুর২৪.কম) ভুয়া অভিযোগে সারাদেশের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ধর্মঘট করছেন। এর ফলে ভেঙে পড়েছে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা। রোগীরা পড়েছে চরম দূর্ভোগে। জানা যায়, বহুল আলোচিত বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর স্বজনকে মারধরের ঘটনায় ৪ শিক্ষানবিশ চিকিৎসককে সাজার প্রতিবাদে ধর্মঘট চলছে ৩ দিন ধরে। এই কর্মসূচি এখন ছড়িয়েছে অন্য হাসপাতালেও। তাদের দাবি, রোগীর স্বজন এক নারী চিকিৎসককে উত্ত্যক্ত করেছিলেন। তবে এই ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি বলছে, সেদিন এমন কোনো ঘটনা ঘটার প্রমাণ তারা পায়নি। কমিটির একজন সদস্য বলেছেন, তারা এখন যে অভিযোগ তুলছে, সেটা ভুয়া।
এই ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি বগুড়ার হাসপাতালটিতে গিয়ে শিক্ষানবিশ চিকিৎসক, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, গণমাধ্যমকর্মী এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত রোগীদের সঙ্গে কথা বলেছে। এর আগে তারা কথা বলেছে নির্যাতনের শিকার আবদুর রউফ এবং তাদের স্বজনদেরকে। কিন্তু কেউই নারী চিকিৎসকে উত্ত্যক্ত করার তথ্য দেয়নি তদন্ত কমিটিকে।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার এই সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থ রোগী আলাউদ্দিনের ছেলে আবদুর রউফকে বেদম মারধর ছাড়াও অবমাননাকর সাজা দেন কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনার ভিডিও চিত্র প্রকাশের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৫ সদস্যের তদন্ত কমটি গঠন করে। পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি গঠন করে।
গত বুধবার এই কমিটি প্রতিবেদন দেয়ার পরদিন ৪ শিক্ষানবীশ চিকিৎসকের ইন্টার্নশিপ ৬ মাসের জন্য স্থগিত করা হয়। সেই সঙ্গে বগুড়ার এই হাসপাতালের বদলে তাদেরকে অন্যত্র ইন্টার্নশিপ শেষ করতে হবে। ভবিষ্যতে এই ধরনের কাজ করলে তাদের পেশাগত সনদ বাতিল করা হবে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
শাস্তি পাওয়া ৪ শিক্ষানবিশ চিকিৎসকের মধ্যে নূরজাহান বিনতে ইসলাম নাজকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, আশিকুজ্জামান আসিফকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, কুতুবউদ্দিনকে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং এম এ আল মামুনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ শেষ করতে হবে।
দেশজুড়ে সমালোচিত এই ঘটনার সাজা দেয়ায় নাখোশ হয়েছেন শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা। এর বিরুদ্ধে ধর্মঘট ডেকে চিকিৎসকদের বিভিন্ন ফেসবুক পেজে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে তারা দেশের অন্যান্য হাসপাতালের চিকিৎসকদেরকেও কর্মসূচিতে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করে। আর গত কয়েক দিনে ধর্মঘট ছড়িয়েছে সিলেট, রাজশাহী, খুলনা দিনাজপুর, সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
ধর্মঘটী শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের দাবি, সেদিন ঘটনার শুরু এক নারী চিকিৎসককে উত্ত্যক্ত করা নিয়ে। পরে অন্য চিকিৎসকরা একজোট হয়ে ব্যবস্থা নেয় মাত্র। কিন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা জানান, চিকিৎসকদের এই অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাননি তারা। কমিটির একজন সদস্য বলেন, আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলেছি। কথা বলে প্রমাণ পেয়েছি ওই শিক্ষানবিশ চিকিৎসকের কাছে ফ্যানের সুইচ কোথায় আছে সেটি জিজ্ঞেস করায় ক্ষেপে গিয়ে ওই রোগীর স্বজনকে পিটানো হয়েছে।
তদন্ত কমিটির ওই সদস্য বলেন, নেকড়ের মতো ছুটে এসে অনেকজন মিলে ওই রোগীর স্বজনকে পিটানো হয়েছে। শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের আচরণে ক্ষুব্ধ এই কর্মকর্তা বলেন, একজন চিকিৎসক যদি ব্যক্তিগত অপরাধ করেন তাহলে সে কি শাস্তি পাবে না? আর শাস্তি দিলে সবাই মিলে প্রতিবাদ করবো? এটা হয়। তাহলে পেশাগত দায়িত্ব পালনে অসদাচারণের বিচার হবে না? এটা আমরা কোন জগতে আছি। এখন তারা আবার ধর্মঘট ডাকছে। এটা মানা যায় না। আমরা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বসছি দেখা যাক মন্ত্রী মহাদয় কী সিদ্ধান্ত দেন।
শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা যে উত্ত্যক্তের দাবি করেছেন, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ওই কর্মকর্তা বলেন, তারা অন্যান্য হাসপাতালগুলোতে বার্তা ছড়াচ্ছে ওই রোগীর স্বজন নাকি ইভটিজিং করেছে। আসল তথ্য হল, রাত তিনটায় রোগীকে ভর্তি করিয়েছেন তিনি। একজন রোগী যখন গুরুতর অসুস্থ থাকে তখন তার স্বজনের মনে কি তখন ইভটিজিং করার মানসিকতা থাকে? এটা স্বাভাবিকভাবে অনুমেয়। আর যেভাবে সকল শিক্ষানবিশ চিকিৎসক মিলে ওই রোগীর স্বজনকে মারা হল সেটা তো ভয়াবহ ঘটনা।
তদন্ত কমিটির এক সদস্যের এসব বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান বলেন, আমরা স্থানীয় সাংবাদিক, রোগী, স্বজন ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছি। এমনকি যাকে কেন্দ্র করে ওই ঘটনার সূত্রপাত সেই শিক্ষানবিশ চিকিৎসকের সঙ্গেও কথা বলেছি। সবকিছুর বিচার করেই তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। -ডেস্ক