-সংগ্রহীত

(দিনাজপুর২৪.কম) বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে ঢাকা, বসে আছে ওয়াসা। রাজধানীর পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা সংস্থাটি ঝিমিয়ে দিন পার করছে। খাল পুনর্খননের জন্য গত বছর ৪০ কোটি টাকা ও চলতি বছর পাঁচ কোটি টাকা মন্ত্রণালয় দিলেও নগরীর জলাবদ্ধতা দূর করতে পারেনি। ফলে ৪৫ কোটি টাকার খরচের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে জনমনে।

সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের মতে, খালগুলোতে বিপুল পরিমাণ ময়লা জমেছে। তা পরিষ্কার করতে সময় লাগবে। তবে কাজ শেষ করতে পারলে আগামী বর্ষায় ভোগান্তি অনেকটাই কমে যেত। সংস্থাটি মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করায় খাল আর পুনর্খনন হয়নি।

সূত্রে জানা গেছে, দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রায় ৩৬০ কিলোমিটার পানি নিষ্কাশনের বড় নালা তৈরি করেছে সংস্থাটি। এছাড়া সংস্থাটির আওতায় আছে ১০ কিলোমিটার বক্স কালভার্ট ও মোট ৭৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ২৬টি খাল। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজন মতো উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য এই সংস্থার আছে দুটি সার্কেল ও একটি বিভাগ। এগুলো হচ্ছে ড্রেনেজ (পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ) সার্কেল, ড্রেনেজ গবেষণা ও উন্নয়ন সার্কেল এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন (ড্রেনেজ) বিভাগ।

ওয়াসা সংশ্লিষ্টরা বলেন, পুনর্খননের তালিকায় থাকা খালগুলোর মধ্যে সেগুনবাগিচার ৫শ মিটারে ব্যয় ধরা হয় ৫০ লাখ, দেব-ধোলাইখাল ১৩শ মিটারে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা, কসাইবাড়ি খাল ১৫শ মিটারে ১ কোটি ৫০ লাখ, সুতিভোলা খাল ৪ হাজার মিটারে ৫ কোটি, ক্যাচপিট নির্মাণ ও পুননির্মাণ ৩৫০ মিটার ১ কোটি, ম্যানহোল পুনরুদ্ধার ও পুননির্মাণে ৩শ মিটার ৪৫ লাখ, কল্যাণপুর প্রধান খাল ২ হাজার মিটার ৩ কোটি, ধোলাইখাল ৫শ মিটার ৮০ লাখ, রূপনগর খাল ১ হাজার মিটার ২ কোটি, রামচন্দ্রপুর খাল ১ হাজার মিটার ১ কোটি ৫০ লাখ, কালুনগর ইউ-চ্যানেল ৩৬০ মিটার ৩০ লাখ টাকা, বাউনিয়া খাল ১২শ মিটার ২ কোটি, মুসলিম বাজার খাল ১৫শ মিটার ৮০ লাখ, কল্যাণপুর ‘চ’ খাল ৫শ মিটার পুনর্খননে ৫০ লাখ, কাঁটাসুর খালে বিদ্যমান ৬টি কালভার্ট আনুমানিক ১৩শ মিটার পুনর্খননে ১০ কোটি এবং ম্যানহোল পুনরুদ্ধার ও পুননির্মাণে ৩শ মিটারে ৪৫ লাখ টাকা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার একজন কর্মকর্তা বলেন, ওয়াসার সবচেয়ে অবহেলিত একটি অঙ্গ হচ্ছে ড্রেনেজ (পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ) সার্কেল। এই সার্কেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ছাড়া অন্য কোনো বরাদ্দ নেই। তাই মন্ত্রণালয় থেকে টাকা পেলে কাজ থাকে, আর টাকা না দিলে কিছু করারও থাকে না।

ওয়াসার পরিচালক (কারিগরি) এ কে এম সহিদ উদ্দিন এ নিয়ে বলেন, ঢাকা ওয়াসার মোট ২৬টি খাল। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ১৬টি খাল পুনর্খনন করতে একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। বাকি খালগুলোও ধাপে ধাপে পুনর্খনন করা হবে। তবে আগের চেয়ে খাল পুনর্খননে এবার খরচ বেড়েছে। খাল খনন একটি ধারাবাহিক কাজ। নিয়মিত না করলে ময়লা-আবর্জনা ভরাট হয়ে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে যায়। এবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে খাল পুনর্খননের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটি দেয়া হয়নি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. মুজিবুর রহমান বলেন, টাকা খরচ হচ্ছে, কিন্তু সুষ্ঠু পরিকল্পনা অনুযায়ী তা হচ্ছে না। বাসাবাড়ি থেকে খাল ও নদী পর্যন্ত পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি পরিপূর্ণভাবে না বুঝে শুধু রাস্তা কেটে পাইপ বসালে কিংবা কালভার্ট নির্মাণ করলে টাকাটা পানিতেই যাবে। তিনি বলেন, সব সময় নালা পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি খালগুলো দখলমুক্ত এবং খনন করে প্রবাহমান রাখতে হবে। যাতে বৃষ্টির পানি খাল হয়ে নদী পর্যন্ত যেতে পারে। এজন্য ঢাকা ও চারপাশের নদীরও খনন দরকার।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পানি নিষ্কাশনে ঢাকা ওয়াসা পুরো সিস্টেমের সমস্যা বিবেচনা না করে বিচ্ছিন্নভাবে খাল পুনর্খনন করে থাকে। এতে ওয়াসা কোটি কোটি টাকা খরচ করলেও রাজধানীর জলবদ্ধতা দূর হয় না। এক জায়গায় পুনর্খনন করলে অন্য জায়গা ভরাট হয়ে যায়। এজন্য যতক্ষণ পর্যন্ত পুরো সমস্যা চিহ্নিত না করা যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সমাধান হবে না। সব সমস্যা চিহ্নিত না করে বিচ্ছিন্নভাবে খাল পুনর্খনন করার পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

উল্লেখ্য, জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট ও দখল। সেই সাথে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ত্রুটি, অপরিকল্পিত বক্সকালভার্ট নির্মাণ, যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা আর সমন্বয়হীন সংস্কার কাজের কারণে প্রতি বছরই বাড়ছে জলাবদ্ধতা। জলাবদ্ধতা দূর করতে গতবছর রাজধানীর ১৭টি খালের ৩০ কিলোমিটার পুনর্খননে ৪০ কোটি টাকা ব্যয় করে ঢাকা ওয়াসা। পরিষ্কার করা হয়েছে আড়াইশ কিলোমিটার ড্রেন। এতেও জলাবদ্ধতা কমেনি। -ডেস্ক