(দিনাজপুর ২৪.কম)বরগুনার বঙ্গপসাগর উপকূলীয় সাগর ও নদ-নদীতে  এবছর ইলিশ শুন্য হয়ে পরেছে যার কারনে জেলে পরিবারে চরম হতাসা বিরাজ করছে। এতে জেলার প্রায় অর্ধলক্ষাধিক জেলে পরিবারে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। বরগুনা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় ২৯হাজার ৬শত ২০জন ইলিশ জেলে রয়েছে সরকারি হিসাবে ।তবে বে-সরকারি হিসাবে অর্ধলক্ষাধিকের বেশী হতে পারে বলে জেলেদের আড়ৎ ও মালিক সমিতি সূত্রে জানা যায়। এ বছর সাগরে মাছ ধরা না পরার কারনে ধার দেনায় নিস্ব হয়ে এ ব্যাবসা থেকে অনেক জেলে সরে আসছেন বলে জানা গেছে। জেলে , পাইকার আর ফড়িয়ারা বেকার বসে দিন কাটাচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) দ্বিতীয় বৃহত্তম ইলিশের মোকাম বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের পাশে পন্টুনে বাঁধা সারি সারি ট্রলার। এই সময়ে এসব ট্রলারের পেটের খোল ভর্তি থাকার কথা ইলিশ মাছে। কারণ, এই শ্রাবণ ও ভাদ্র মাস ইলিশের ভরা মৌসুম। কিন্তু এ মৌসুমেও দক্ষিণের জেলেদের জালে ধরা পরছেনা ইলিশ। সারি বাঁধা কয়েক’শ ট্রলারের মধ্যে ১০ থেকে ১২টি  গভীর সাগর থেকে এসে নোঙর করেছে। জেলেদের চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। সাত-আট দিন সাগরে ভাসা, জাল ফেলা, জাল টানার মতো কঠোর পরিশ্রমে তাঁদের ক্লান্ত হওয়ারই কথা। সাগরের নোনাজলের ঝাপটায় গায়ের রংও কালচে হয়ে গেছে তাঁদের।
এ সময় দেখা যায়, নোঙর করা ট্রলারগুলো থেকে বড় বড় ঝাঁপিতে করে সামান্য কিছু মাছ তুলে আনছেন শ্রমিকেরা। স্তূপ করে রাখছেন অবতরণকেন্দ্রের মেঝেতে। সেখানে পাইকার, আড়তদার, ফড়িয়াদের হাঁকডাক, শোরগোল। মাছের পরিমাণ কম হলেও মানুষের ভিড় কম নয়। অবতরণকেন্দ্রের বিক্রয় শেডের পূর্ব পাশে গোল করে মাছের দাম হাঁকছিলেন পাইকারেরা। ভিড়ের মধ্যেই ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ মাথা ঝুঁকিয়ে চোখ বড় করে তাকিয়ে তা দেখছিলেন। এ যে রুপালি ইলিশ! কী দেখছেন—প্রশ্ন করতেই হামেজ উদ্দীন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘ইলিশ দেহি বাজান। মোগো দেহনেই শান্তি।’ একে একে বললেন রুপালি ইলিশ নিয়ে অতীতের সুখস্মৃতি আর বর্তমানের হতাশার কথা, ‘বাবা, আগে আষাঢ় মাস অইতে ভাদ্র মাস পর্যন্ত মোগো গা (শরীর) দিয়া ইলশা মাছের গন্ধ অইত। ইলশা মাছ খাইতে খাইতে অভক্তি ধইর‌্যা যাইত। আর এহন মোগো দ্যাশের মানুষ চাইলেও একটা ইলিশ খাইতে পারে না। খালি ইলিশের সুরতটা দেহি।
ঘাটে মাছ খালাসের সময় এফবি মায়ের দোয়া নামের ট্রলারের জেলে নূর জামাল  বললেন, এইবারের ক্ষ্যাপে এক মণের মতো ইলিশ পাইছি। ওই মাছ বিক্রি করে ট্রলারমালিক ২৬ থেকে ২৮ হাজার টাকা হাতে পাবে। কিন্তু জ্বালানি, বাজার-সওদা বাবদ আষ্ট দিনে খরচ অইছে প্রায় সোয়া লাখ টাকা।একই রকম কথা জানালেন  তালতলীর ফকিরহাটের এফবি সাকিল নামের ট্রলারের মাঝি মিলন মিয়া তিনি বলেন, এই ক্ষ্যাপে ১ লাখ ৩৯ হাজার টাকার বাজার করে সাগরে যাই ফিরে এসে ১লাখ ২৭ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করেছি এতে এই ক্ষ্যাপে ১২হাজার টাকা লচ হইচে।এরকম একই কথা বলেন  আরও কয়েকজন জেলে। পটুয়াখালীর আলিপুর এলাকার এফবি সারমিন  ট্রলারের  আলঙ্গির মাঝি জানান, এই ক্ষ্যাপে সাগরে যেতে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অথচ মাত্র পাঁচ মণ ইলিশ পেয়েছেন, যার বাজারদর ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। প্রায় ৪০ হাজার টাকাই লোকসান তাঁর। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে বড় ট্রলারের মাঝির দায়িত্বে আছেন। কিন্তু ভরা মৌসুমে ইলিশের এমন আকাল আর দেখেননি তিনি। ইলিশের এমন ভরা মৌসুমে প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজার মণ ইলিশ আসত এখানে। অথচ এখন ৪০-৫০ মণও আসে না বলে জানান পাথরঘাটা বিএফডিসি মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের পাইকার সমিতির সভাপতি শাফায়েত হোসেন মুন্সি।
তিনি বলেন, এ জন্য পাইকারি বাজারে ইলিশের মূল্যও খুব চড়া। ৯০০ গ্রাম থেকে এক কেজির প্রতি মণ ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৭০-৭৫ হাজার টাকায়, এক কেজির ওপরে ৮৫-৯০ হাজার টাকায়, ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রামের ৪০-৪৫ হাজার টাকায় এবং এর চেয়ে ছোট ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রামের ৩২-৩৫ হাজার টাকায়। পাথরঘাটার জেলে, আড়তদারসহ অন্তত ২৫ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইলিশের এই ভরা মৌসুমেও বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন সাগর মোহনা, বলেশ্বর, বিষখালী, পায়রা নদী, সাগর মোহনা ও তৎসংলগ্ন সাগরে ইলিশের দেখা মিলছে না। তবে গভীর সাগরে কিছু মিলছে। ভরা মৌসুমে সাগরে ইলিশ না পাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের ডিন সুলতান মাহমুদ বলেন, নদীর নাব্যতা হ্রাস, পোনা ধরার কাজে নেট ও কারেন্ট জালের ব্যবহার এবং অনাবৃষ্টি, পানিদূষণসহ নানা কারণে এটা হতে পারে। তবে ভাদ্র মাসে বৃষ্টিপাত বেশি হলে ইলিশের আমদানি বাড়তে পারে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন, পাথরঘাটা অবতরণকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক লেফটেন্যান্ট এম সেলায়মান শেখ বলেন, দিনে দিনে ইলিশ নদী থেকে সাগরে আর সাগর থেকে গভীর সাগরে চলে যাচ্ছে। এতে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র জেলেদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। তবে গভীর সাগরে বড় ট্রলারে লম্বা জালে কিছু ইলিশ ধরা পড়ছে।(ডেস্ক)