(দিনাজপুর ২৪.কম)বিজ্ঞানমনস্ক লেখক-ব্লগার অভিজিৎ রায় ও অনন্ত বিজয় দাশ হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গ্রেফতার আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) তিন জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। ঢাকার মহানগর হাকিম শাহরিয়ার মাহমুদ আদনান বুধবার তিনজনের জামিন আবেদন নাকচ করে এই আদেশ দেন। অভিজিৎ হত্যা মামলায় শ্যোন এরেস্ট দেখিয়ে তাদের রিমান্ডে নিয়েছে মামলার তদন্ত সংস্থা ডিবি। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রেফতার তিন এবিটি জঙ্গির মধ্যে সাদেক আলী মিঠুকে দীর্ঘদিন ধরে আটকের চেষ্টা চলছিল। এর আগে ব্লগার অভিজিৎ, ওয়াশিকুরসহ অন্তত তিনজন ব্লগারকে হত্যার পর সাদেকের নাম উঠে আসে। এমনকি এবিটির শীর্ষ নেতা জসীমুদ্দীন রাহমানি ও জেএমবি নেতা তাসনিম ও নাহিদকে আটকের পর ঘুরেফিরে সাদেকের নাম আসে। সাদেকের মাধ্যমে ব্লগার হত্যাসহ উগ্রপন্থিদের ব্যাপারে অনেক রহস্যের জট খুলতে পারে। মূলত তাকে ঘিরে উগ্রপন্থিদের নিয়ে তদন্ত নতুন মোড় নিচ্ছে। জেএমবির ‘মৃত্যু পরোয়ানা’ মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে থেকে এবিটির হয়ে কাজ করছিলেন সাদেক।

সোমবার রাতে রাজধানীর দুটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক তৌহিদুর রহমান (৫৮), সাদেক আলী মিঠু (২৮) ও আমিনুল মলি্লককে (৩৫) গ্রেফতার করা হয়। র‌্যাব বলছে, কারাবন্দি এবিটির শীর্ষ নেতা জসীমুদ্দীন রাহমানির নির্দেশনায় সাদেকসহ পাঁচজনের একটি দল অভিজিৎ ও অনন্ত বিজয় হত্যার সঙ্গে জড়িত। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া অন্য চার উগ্রপন্থি রমজান, নাঈম, জুলহাস, জাফরান বর্তমানে পলাতক। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এদিকে তৌহিদুর রহমান নামে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিকের খোঁজ না পাওয়ায় তার পরিবার গত জুনে ধানমণ্ডি থানায় মামলা করেছিলেন।

জঙ্গিদের কার্যক্রমের ওপর ১০ বছর ধরে নজরদারি রাখছেন ডিবির এমন একজন কর্মকর্তা গতকাল দিনাজপুর ২৪.কমকে জানান, এবিটির শীর্ষ নেতা জসীমুদ্দীন রাহমানির ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতেন সাদেক। এর আগে সাদেক জামায়াতুল মুসলেমিনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তিনি জসীমুদ্দীনের ই-মেইল অ্যাকাউন্ট ও স্কাইপি দেখভাল করতেন। এছাড়া এবিটির শীর্ষ নেতার প্রকাশনা নিয়ে কাজ করতেন।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় ব্লগার হত্যার পরপরই দুই হিজড়া দুই খুনি জিকরুল্লাহ ও আরিফুলকে জাপটে ধরেন। পরে তাদের ডিবি জিজ্ঞাসাবাদ করে। সেখানে উঠে আসে সাদেক নামে এক যুবকের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল। তারা বিভিন্ন সময় নানা পরামর্শ দিয়েছেন। এছাড়া এবিটির অন্যতম নেতা মোরশেদকে গ্রেফতারের পরও সাদেকের নাম জানা যায়। এমনকি ব্লগার অভিজিৎ ও আহমেদ রাজীব হায়দার খুনের পর ঘুরেফিরে সাদেকের নাম আসে।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে এবিটির শীর্ষ নেতা জসীমুদ্দীন গ্রেফতারের পর জেএমবির সদস্যরা সাদেককে তাদের দলে টানার চেষ্টা করে। ওই সময় জেএমবির কয়েকজন নেতার সঙ্গে তার সখ্য তৈরি হয়। তবে মনেপ্রাণে সাদেক জেএমবির আদর্শে কখনও পুরোপুরি বিশ্বাস স্থাপন করেননি। তাই জেএমবির সদস্যরা তাকে ‘সন্দেহের’ চোখে দেখত। জেএমবিতে পুরোপুরি দলভুক্ত না হওয়ায় সাদেকের ওপর ‘মৃত্যু’ পরোয়ানা জারি করে জেএমবি। ২০১২ সালের দিকে দেশে গোপনে সক্রিয় একাধিক উগ্রপন্থি দল একজোট হয়ে নতুন নামে একক সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা চালায়। সারাদেশ থেকে ৮২ জন উগ্র মতাদর্শী মোহাম্মদপুরের একটি বাসায় জড়ো হয়ে কয়েক দিন অবস্থান করে সংগঠনের নীতিমালা তৈরি করে। তবে সংগঠনের নামের ব্যাপারে তারা তখনও ঐকমত্য হতে পারেনি। ওই সময় তাদের কর্মকাণ্ড আনসার বাংলা নামে পোস্ট করা হয়। বিষয়টি গোয়েন্দাদের নজরে আসার পরই আনসারুল্লাহর তৎপরতার ব্যাপারে অনেক তথ্য পাওয়া যায়।
দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, অভিজিৎ হত্যার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ও একুশে বইমেলার আশপাশ এলাকা থেকে এক হাজার ৮৪ জিবি সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা করে। সাদেকসহ তিন জঙ্গিকে ওই ফুটেজ দেখিয়ে জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে।

এবিটির তিন জঙ্গি সাত দিনের রিমান্ডে :তিন এবিটি সদস্য তৌহিদুর, সাদেক ও আমিনুলকে বুধবার আদালতে হাজির করে অভিজিৎ হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মো. ফজলুর রহমান রিমান্ডের আবেদনে বলেন, হত্যাকাঅের্থায়নে এ অপরাধ ঘটেছে তা জানতে এবং হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারের জন্য তিন আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। এ সময় তৌহিদুর রহমানের আইনজীবী কামাল উদ্দিন রিমান্ড আবেদনের বিরোধিতা করে জামিন চান। তিনি বলেন, ”তার মক্কেলকে গত ২৮ মে আটক করা হলেও এতদিন আদালতে তোলা হয়নি। তৌহিদ একজন ব্রিটিশ নাগরিক এবং মানসিক ‘ভারসাম্যহীন’। তিনি রাস্তার লোকজনকে নামাজ পড়ার জন্য বা ধর্মীয় কাজে অংশগ্রহণের জন্য দাওয়াত দেন। তিনি কোনো হত্যাকান্ডে জড়িত নন। তার দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার বিষয়ে ধানমণ্ডি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছিল।’ এ সময় বিচারক বলেন, ‘যদি দীর্ঘদিন আটক থাকার এ ঘটনার সত্যতা থাকে, তবে আমি ব্যবস্থা গ্রহণ করব। আপনি সাক্ষী থাকবেন।’ পরে তৌহিদুরের আইনজীবী এ বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করেন এবং তার বক্তব্য থেকে সরে আসেন। বাকি দুই আসামি আদালতকে বলেন, তাদের চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। গণমাধ্যমের সামনে বলার জন্য তাদের কথা ‘শিখিয়ে দেওয়া’ হয়েছিল। রিমান্ডের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি আবদুল্লাহ আবু।

ধানমণ্ডি থানার ওসি নূরে আজম মিয়া দিনাজপুর ২৪.কমকে বলেন, তৌহিদুর রহমানের বোন ৩ জুন ধানমণ্ডি থানায় একটি মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, ধানমণ্ডির বাসা থেকে কে বা কারা তৌহিদুর রহমানকে ধরে নিয়ে যায়। তবে পুলিশও পরে তার কোনো সন্ধান পায়নি।(ডেস্ক)