(দিনাজপুর২৪.কম) ব্যাংকে হুহু করে বাড়ছে অলস টাকা। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অতিরিক্ত তারল্য বা অলস টাকা দেড় লাখ কোটি ছাড়িয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, নভেম্বর পর্যন্ত তা ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

ডিসেম্বর শেষে তা আরও বেড়ে ২ লাখ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। ব্যাংকাররা জানান, এমন পরিস্থিতিতে পোর্টফোলিও বড় হলেও দুর্বল হচ্ছে ব্যাংকের ভিত। কারণ, টাকার সংকট যেমন এক ধরনের বিপদ, তেমনি বিনিয়োগ করতে না পারা অতিরিক্ত তারল্যও সমান বিপদ বয়ে আনে। তবে কেউ কেউ বলছেন, এ দৃশ্য সাময়িক। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিনিয়োগ বাড়বে। তখন আর টাকা অলস পড়ে থাকবে না।

জানতে চাইলে বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বলেন, ব্যাংকে অলস টাকার পাহাড় সৃষ্টি হবে- এটাই স্বাভাবিক। কারণ, যে ঋণ দিয়েছি তা ফেরত আসছে না। তাই ব্যাংকাররা ভীষণ চিন্তিত এবং সতর্ক। দেশে বিনিয়োগ নেই। আমদানিও অপর্যাপ্ত। নতুন কোনো শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে না।

তাই ভালো গ্রাহক ঋণ নিতে চাইছেন না। উল্টো দাগী ঋণখেলাপিরা নতুন করে ঋণ চাইছেন। না দিলে ‘দেখে নেয়ার’ হুমকিও দিচ্ছেন কেউ কেউ। সে কারণে আমরা বড় বেকায়দায় আছি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট তারল্যের পরিমাণ ৩ লাখ ৭১ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা।

এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের হাতে ১ লাখ ১৫ হাজার ৮৮৩ কোটি, বিশেষায়িত ৩ ব্যাংকের হাতে ১ হাজার ৩১২ কোটি, বেসরকারি (কনভেনশনাল) ৩৪ ব্যাংকের হাতে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৮৩৮ কোটি, ইসলামিক ৮ ব্যাংকের (বেসরকারি) হাতে ৪২ হাজার ৪৬২ কোটি এবং বিদেশি ৯ ব্যাংকের (বেসরকারি) হাতে রয়েছে ৩৩ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা।

ব্যাংকিং নীতি অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সব ব্যাংকের ২ লাখ ২ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকার ন্যূনতম তরল অর্থ সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মোট তারল্য থেকে উল্লিখিত অঙ্ক বাদ দিলে যা থাকে তাই হল অতিরিক্ত তারল্য বা অলস টাকা। সে হিসাবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য বা অলস অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল হালিম চৌধুরী বলেন, করোনার কারণে সাময়িক অতিরিক্ত তারল্য বেড়েছে। এ তারল্য থাকবে না। ডিসেম্বর থেকে মার্চ ও জুনের মধ্যে তারল্য ফুরিয়ে যাবে। কারণ, অনেক ডেফার্ড এলসির মেয়াদ শেষ হবে মার্চে। তখন এলসির দায় পরিশোধ করতে প্রচুর মুদ্রা লাগবে। এছাড়া এখন কলকারখানার চাকা ঘুরতে শুরু করেছে, ধীরে ধীরে আরও সচল হবে। তখন এমন পরিস্থিতি আর বিরাজ করবে না।

জানা যায়, ১ বছর আগেও তীব্র তারল্য সংকটে ভুগছিল বেশিরভাগ ব্যাংক। নগদ জমা সংরক্ষণের হার (সিআরআর) ও সহজে বিনিময়যোগ্য সম্পদ (এসএলআর) সংরক্ষণেই হিমশিম খাচ্ছিল বেসরকারি ব্যাংকগুলো। তারল্যের সংস্থান করতে বেশি সুদে অন্য ব্যাংকের আমানত বাগিয়ে নেয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তারা।

তবে মহামারীর প্রাদুর্ভাবে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন ব্যাংকগুলোতে রীতিমতো অলস তারল্যের জোয়ার বইছে। এক বছর আগে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে খরা ছিল তারল্য সংকটের কারণে। এখন ব্যাংকগুলোতে তারল্যের জোয়ার বইলেও ঋণের চাহিদা নেই। আবার নতুন বিনিয়োগের জন্য আবেদন এলেও বাড়তি সতর্কতার কারণে ব্যাংকাররা এ মুহূর্তে ঋণ দিতে চাইছেন না। ফলে অক্টোবর পর্যন্ত দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।

যদিও এ সময়ে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বেসরকারি খাতে অর্ধলাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ হয়েছে। করোনায় বড় ধাক্কা খাওয়া দেশের আমদানি খাত এখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় জুলাই-অক্টোবর সময়ে আমদানি কমেছে ১২ দশমিক ৯৯ শতাংশ। যদিও সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা দেশের ব্যাংক খাতের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অলস তারল্য।

অতিরিক্ত তারল্যের চাপ সামলাতে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার সর্বনিম্নে নামিয়ে এনেছে। এক বছর আগেও যেখানে কোনো কোনো ব্যাংক ৮ শতাংশের বেশি সুদে তিন-ছয় মাস মেয়াদি আমানত সংগ্রহ করেছে, এখন তা ৩-৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। তারপরও অতিরিক্ত তারল্যের রক্ষণাবেক্ষণে ব্যাংকারদের হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী জানিয়েছেন।

তারা বলেন, ব্যাংক আমানতের গড় সুদহার ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। পরিস্থিতি যা তাতে বিনিয়োগ বা ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে না পারলে অচিরেই ব্যাংক আমানতের সুদহার ১-২ শতাংশে নেমে আসবে।

ব্যাংক এশিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আরফান আলী বলেন, করোনায় নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে না। ফলে তারল্য জমছে। এটা সাময়িক। করোনা পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হলে বিশেষ করে ভ্যাকসিন এলে মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরে আসত। তখন বিনিয়োগও বাড়বে। আর বিনিয়োগ বাড়লে তারল্য কমে যাবে। -ডেস্ক