(দিনাজপুর২৪.কম) নতুন আইনে মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) হার ১৫ শতাংশই থাকছে- অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের আকস্মিক এ ঘোষণায় ব্যবসায়ী মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ভ্যাটের হার কমানোর বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ব্যবসায়ীরা। অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, নতুন আইন বাস্তবায়ন হলে অর্থনীতিতে এক ধরনের ‘সহানুভূতিশীল’ মূল্যস্ফীতি তৈরি হতে পারে। বরং হার সহনশীল থাকলে করদাতারা তা দিতে উৎসাহিত হবেন।
এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীরা জানান, অর্থমন্ত্রী এতদিন হার কমানোর কথা বলছিলেন। তাই তাদের (ব্যবসায়ীদের) মধ্যে আশার আলো দেখা দেয়। উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা বলেন, ‘কিন্তু হঠাৎ করে এমন কী ঘটল, যে কারণে অর্থমন্ত্রীকে সুর বদলে ফেলতে হলো?’ তারা বলেন, ভ্যাটের হার অবশ্যই কমাতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক ‘হ্রাসকৃত হারে’ ভ্যাট আদায় করতে হবে। ভ্যাট হার অপরিবর্তিত রেখে নতুন আইন কার্যকর করলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে। ব্যাহত হবে রাজস্ব আদায়। ক্ষতি হবে দেশীয় শিল্প খাতের।
আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হবে। আসছে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে এর ঘোষণা দেবেন অর্থমন্ত্রী। ২০১২ সালে নতুন ভ্যাট আইন প্রণয়নের পর এবার তা কার্যকর হচ্ছে। গত শনিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে সাংবাদিকদের নিশ্চিত করে বলেন, ‘ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশই থাকছে এবং রেট হবে একটিই।’ যদিও সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ফোরামে ভ্যাটের হার কমছে- এমন বার্তা একাধিকবার দেন তিনি। কিন্তু বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে আগের অবস্থান থেকে দূরে সরে আসার ঘোষণায় সর্বমহলে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই বলছেন, ব্যবসায়ীদের অসন্তোষে রেখে কোনোমতেই এ আইন কার্যকর করা সম্ভব নয়। এতে আদায় ব্যাহত হলে তখন পুরো বাজেট বাস্তবায়ন করাই দুরূহ হয়ে পড়বে।
নতুন আইনে সর্বক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায়ের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি স্তরে উপকরণে কর রেয়াত নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। বর্তমানে ১৯৯১ সালের মূল্য সংযোজনের ওপর বিশেষ ছাড় দিয়ে একাধিক হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট আদায় করা হয়। এফবিসিসিআইসহ ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট আদায়ের নিয়ম রাখতেই হবে। যেসব খাতে প্রয়োজন সেগুলোতে তা বহাল রেখে নতুন আইন কার্যকর করতে হবে। কিন্তু সরকার চাচ্ছে সর্বক্ষেত্রে একক রেট- ১৫ শতাংশ। এ পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে দুটি পথ খোলা আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা- হয় নতুন আইন বাস্তবায়ন করা অথবা এফবিসিসিআইসহ ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে নিয়ে পুরনো আইনে ফিরে যাওয়া। যদিও সরকারের পক্ষে পুরনো আইনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ আর নেই। সে ক্ষেত্রে নতুন আইনই বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে সরকারকে।
ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, রেট কত হলো বা না হলো তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, হিসাব সংরক্ষণের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বেশিরভাগ ব্যবসায়ী হিসাব ঠিক মতো রাখেন না। ফলে আইন বাস্তবায়নে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হবে। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, নতুন আইন বাস্তবায়ন হলে এক ধরনের ‘সহানুভূতিশীল’ মূল্যস্ফীতি অর্থনীতিতে দেখা দিতে পারে। যেমন- এ আইনের ফলে হয়তো পাঁচটি পণ্যের মূল্য বেড়ে গেল; তখন দেখাদেখি অন্য ব্যবসায়ীরাও পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারেন। তা ছাড়া হার বেশি থাকায় ফাঁকির প্রবণতাও দেখা দিতে পারে। তাদের মতে, হার সহনশীল রাখলে বরং করদাতারা কর দিতে আগ্রহী হবেন।
আন্তর্জাতিক এক গবেষণা জানাচ্ছে, ১০ ভাগ লোকের কাছ থেকে ৯০ শতাংশ রাজস্ব আসে। বাকি ৯০ ভাগের কাছ থেকে সংগৃহীত হয় মাত্র ১০ শতাংশ। তাই তদারকি বাড়িয়ে বিত্তবানদের কাছ থেকে বেশি রাজস্ব আদায় করতে হয়। অন্যদিকে, ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তা আদায় করতে হয় অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে। ভ্যাট বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমরা হাঁটছি এর উল্টো পথে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী রেট হতে হবে কমপক্ষে ১০ শতাংশ এবং তা হবে একক রেট। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অন্যান্য দেশের মতো বহু স্তরে ভ্যাট আদায়ের নিয়ম রাখতে হবে। যারা রেয়াত নিতে পারবে না, তাদের জন্য কম হারে বহু স্তরে ভ্যাট আরোপ করতে হবে।
যোগাযোগ করা হলে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যত কথাই বলা হোক না কেন, নতুন ভ্যাট আইনে অবশ্যই মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে।’ ভ্যাটের হারের বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে মির্জ্জা আজিজ আরও বলেন, ‘এতদিন ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের আশা ছিল। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর এ ঘোষণায় নতুন করে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।’
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমরা এখনও শঙ্কিত। কারণ যেসব দাবি করা হয়েছে, তার কোনো প্রতিফলন দেখছি না। তাই আমাদের উদ্বেগ রয়েই গেছে।’ তিনি স্বীকার করেন, তাদের দেওয়া দাবিগুলো মেনে না নিলে এ আইন বাস্তবায়ন করা খুবই কঠিন হবে। দেখা দেবে সংকট। বাড়বে দ্রব্যমূল্য। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত এসে পড়বে সাধারণ ভোক্তার ওপর। তবে তিনি আশাবাদী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের নিরাশ করবেন না।
মেট্রোপলিটন চেম্বারের সাবেক সভাপতি নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘এমনিতেই দেশে ব্যবসার খরচ বেশি। নতুন আইনে এ খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ এফবিসিসিআইর প্রথম সহসভাপতি ফজলে ফাহিম বলেন, ‘ভয়ভীতি কিংবা চাপ দিয়ে কোনো আইন বাস্তবায়ন করা যায় না। এ আইন নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখনও নানা আশঙ্কা রয়েছে।’
এ প্রসঙ্গে এনবিআরের সাবেক সদস্য ফরিদ উদ্দিনও বলেন, ‘নতুন আইন অর্থনীতিতে সংকট তৈরি করবে। কারণ, এখনও আমাদের উপকরণে কর রেয়াত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি। আমাদের সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় ভ্যাটের চালান রাখা হয় না। লেনদেনে স্বচ্ছতা নেই। এ ছাড়া অর্থনীতির বড় একটি অংশ রয়েছে হিসাবের বাইরে বা ইনফরমাল ইকোনমিতে। এ মুহূর্তে সিঙ্গেল রেট কার্যকর হওয়ার সুযোগ নেই।’ সর্বক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করলে পণ্য ও সেবার দাম প্রভাবিত হবে বলে মনে করেন তিনি। -ডেস্ক