(দিনাজপুর২৪.কম) করোনা মহামারিতে বিশেষ সুবিধা এবং বিভিন্ন ছাড়ের ফলে কাগজে-কলমে কমেছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। ফলে ব্যাংকগুলোর মন্দ ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) কম সংরক্ষণ করতে হয়েছে।

তারপরও প্রভিশন রাখতে ব্যর্থ হয়েছে দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের ১১টি ব্যাংক। এসব ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা। যার সিংহভাগই রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংকের। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা ডিসেম্বর-২০ প্রান্তিকের সর্বশেষ প্রতিবেদন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

ব্যাংক ব্যবস্থার ঋণের শ্রেণীমান অনুযায়ী, নির্ধারিত পরিমাণ নিরাপত্তা সঞ্চিতির অর্থ সংরক্ষণের বিধান রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী, বেসিক ও অগ্রণী ব্যাংক। বেসরকারি খাতের বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, মিউচ্যুয়াল টাস্ট ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক।

জানা গেছে, ব্যাংকগুলো প্রাহকদের যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ করে তার বেশিরভাগই আমানতকারীদের অর্থ। আমানতকারীদের অর্থ যেন কোনো ধরনের ঝুঁকির মুখে না পড়ে সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা আছে। এর একটি হলো প্রভিশন সংরক্ষণ। নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের অশ্রেণীকৃত বা নিয়মিত ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ থেকে পাঁচ শতাংশ হারে প্রভিশন রাখতে হয়। নিম্নমান বা সাব স্ট্যান্ডার্ড ঋণের বিপরীতে রাখতে হয় ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা কুঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। ব্যাংকের আয় খাত থেকে অর্থ এনে এ প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়। খেলাপি ঋণ বাড়লে, আর সে অনুযায়ী ব্যাংকের আয় না হলে প্রভিশন ঘাটতি দেখা দেয়। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, প্রভিশন ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শেয়ারহোল্ডাদের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না।

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ঋণগ্রহীতা ঋণের কি‌স্তি শোধ না করলেও তা‌কে খেলাপির তালিকায় দেখানো যাবে না, ২০২০ সালজুড়ে এমন সুবিধা পেয়েছেন গ্রাহক। এছাড়া খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল, পুনঃগঠনে বিভিন্ন নীতিমালার শর্তে শিথিলতা আনা হয়। এতে গত এক বছরে ঋণের কিস্তি না দিয়েও নতুন করে কোনো ঋণ খেলাপি হয়নি। এসব কারণে খেলাপি ঋণ কমেছে। ফলে সার্বিক প্রভিশন ঘাটতিও কমে গেছে। তবে ঋণ গ্রহীতাদের বিশেষ সুবিধার পরও যেসব ব্যাংক খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের মূলধন ঘাটতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৭৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি ৬ লাখ টাকা। যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

আলোচিত সময়ে ১১টি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি ৩ ব্যাংকের ঘাটতি ৫ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সব চেয়ে বেশি ঘাটতি বেসিক ব্যাংকের তিন হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। এর পরই অগ্রণী এক হাজার ৩১৯ কোটি টাকা এবং রূপালী ব্যাংকের ৮২১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।

বেসরকারি খাতের ৬ ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ১ হাজার ৫৫২ কোটি টাক। এর মধ্যে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ৫০৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা, ঢাকা ব্যাংকের ১৯০ কোটি ৮৭ লাখ, মিউচুয়াল টাস্ট ব্যাংকের ২১০ কোটি ৬৬ লাখ, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৪৩৫ কোটি ৩৮ লাখ সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭৩ কোটি এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ১৩২ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এছাড়া বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ১৬৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ৭৮ লাখ টাকা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে সার্বিক প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ৬৪ হাজার ৮০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এর বিপরীতে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৬৪ হাজার ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ফলে সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে মোট নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি দাঁড়ায় ১২৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। কোনো কোনো ব্যাংক প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত (উদ্বৃত্ত) অর্থ নিরাপত্তা সঞ্চিতি হিসেবে রাখায় সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে ঘাটতির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। -ডেস্ক