(দিনাজপুর২৪.কম) গত কয়েক বছরে দেশজুড়ে যেসব ভয়াবহ নৃশংসতা ও পৈশাচিক ঘটনা ঘটছে- তা অবক্ষয়ী সমাজেরই চিত্র। ক্ষমতার দ্বারা অবদমিত সমাজে বিকারগ্রস্ততাই উঠে এসেছে ওইসব ঘটনায়।

সমাজের মানুষ যখন নিপীড়নকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না, তখন নিজেরাই বদলে যায়। এতে কেউ হয়ে পড়ে নিপীড়নের সহযোগী আর কেউ তার শিকার। শিকার ও শিকারি ছাড়া জংলি এ বাস্তবতায় আর কাউকে দেখা যায় না।

তাই ভাই-ভাইকে করে হত্যা, প্রতিবেশী তোলে প্রতিবেশীর ছাল। তেমনি ঘটেছে বরগুনার শরীফ হত্যাকাণ্ডেও। বর্তমান সমাজ ও বিচারব্যবস্থায় আমরা যেন জীবনমৃত্যুর খেলার লটারি কিনেছি, যেখানে কবে কার নাম উঠবে, তা আগাম বলার উপায় নেই।

তবে এটা নিশ্চিত যে, কারো কারো জন্য হয়তো আজই শেষদিন। জেনে রাখা ভালো— প্রথম হত্যাটা হয় অবিচারের মাধ্যমে তৈরি হওয়া খুনের পরিবেশ, দ্বিতীয় হত্যা জনতার দর্শক হয়ে যাওয়ার মধ্যে। তৃতীয় যে হাতটি হত্যার ঘটনা ঘটায় সেটা করে খুনিরা।

বরগুনার রিফাত হত্যাদৃশ্যে এ তিনপক্ষই ছিলো যার যার ভূমিকায়। নুসরাত হত্যায়ও জড়িত ছিলো বহুপক্ষ। তবে জনতা দর্শকের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হয়ে বড়জোর খুনের প্রত্যক্ষ হাতটার বিচারই চায় অথচ প্রথম দুই হাত রেহাই পেলে মৃত্যুর লটারিতে যে কারোর নাম ওঠানোর সংস্কৃতি আর বন্ধ হবে না।

সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গি নামক খুনিদের হামলার সময়ও ভয় না পাওয়া সাধারণ মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছিল বিভিন্ন জায়গায়। বনানীর সুউচ্চ ভবনের সেই আগুনে মানবতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিল অগ্নিসেনা সোহেল।

ভয় তাকেও অবশ দর্শক করেনি। রানা প্লাজার নরকের গর্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ বাঁচাতে ভয় পায়নি অসংখ্য তরুণ। কিন্তু যখন প্রকাশ্যে বিশ্বজিৎ হত্যা হয়, বদরুল চাপাতি তোলে খাদিজার গায়ে, প্রকাশ্যে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় ফেনীর একরামকে, হাতুড়ি পিটিয়ে কোমর ভাঙা হয় ছাত্রের, আর যখন বরগুনার রিফাত শরীফকে কোপানো হয়, তখন মানুষ জড় পদার্থের মতোই দাঁড়িয়ে থাকে।

কারণ— বর্তমান বিচারব্যবস্থায় বিচারের দড়ি লম্বা করতে করতে এতোটাই লম্বা হচ্ছে যেখানে কয়েক বছর পার হওয়ায় অপরাধে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে অপরাধারীরা, পক্ষান্তরে বাধাদানকারীরা তো বটেই, তাদের আপনজনরাও পড়ছে ঝুঁকিতে।

ফেনীর সোনাগাজীর আগুনে শহীদ নুসরাতের বাড়িতে পুলিশ পাহারা দিতে হয়েছিল কেন? অপরাধীদের পুলিশে দিয়েও ভয়ে থাকতে হয়, এই বুঝি খুনিরা জামিনে ছাড়া পেয়ে প্রতিশোধ নিতে এলো?

এমনকি বিচারে শাস্তি হওয়ার পরও নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না, মহান ক্ষমার ছায়া যদি অপরাধীদের বিদেশ পাঠিয়ে দেয়! তাই অনকেই বলছেন, প্রত্যক্ষদর্শী মানুষকে দুষে লাভ নেই।

বিচারের দড়ি লম্বা হওয়ার দরুন জামিন সহজলভ্য হওয়ার পাশাপাশি ক্ষমতার প্রভাবে জনসমক্ষে হত্যার প্রতিবাদও আজ বিলুপ্তির পথে। প্রকাশ্যে সশস্ত্র সন্ত্রাস দেখামাত্রই মানুষ বুঝে যায় তাদের পরিচয়।

কারা এখন বর্তমান বাংলাদেশে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে ঘুরতে পারে? কোপাতে পারে যাকে-তাকে? তারা কারা? চাপাতি-হাতুড়ি-বন্দুক কয়েকজনকে খুন করতে সক্ষম হলেও প্রকৃতপক্ষে হত্যা করা হয় মানবতা ও সাহসিকতাকে।

রিফাত শরীফের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেশের সচেতন মহল বলছে, এ কোন চেতনা অবশ করা ভয়ের পরিবেশে বাস করছি আমরা।

যে ক্ষমতার চাপাতি রিফাত-খাদিজা-তনু-সাগর-রুনীকে কোপায়, যে ক্ষমতার হাতুড়ি মাজা ভাঙ্গে ছাত্রের, সেই চাপাতি হাতুড়ি বন্দুকই ক্ষমতার আসল চরিত্র-বাকিসব লোকভোলানো বিজ্ঞাপন।

যে কারণে বিশ্বজিতের খুনিদের ছাড়া পেতে দেখা গেলেও সাগর-রুনি-তনু-মিতু খুনের বিচার হতে দেখা যায় না বরং দেখা যায় প্রতিবাদীকে আরও বিপদে ফেলতে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঠপর্যায়ে অপরাধীরা অপরাধ করার আগে, পকেটে পিস্তল বা হাতে চাপাতি নেওয়ার সময়ই যাতে ভয় পায় পুলিশকে।

পুলিশ যাতে ভয় পায় জনতার কাছে জবাবদিহিকে। জনতাকে যাতে ভয় পায় প্রশাসক ও শাসকরা। এতে গণতন্ত্র যেমন লাগবে, তেমনি আইনের গণপাহারাও লাগবে।

কিন্তু যখন জনতার মধ্যে সুবিধাবাদ, পুলিশ-শাসক-প্রশাসকের মধ্যে জবাবদিহির অভাব খুব বেশি, তখন সমাজ হয়ে ওঠে মুরগির খোঁয়াড়। অপরাধী পায় না ভয়, পুলিশ যেমন উচিত তেমন করে নড়ে না, তখন ক্ষমতাসীনেরা সুবচন দিয়ে শিশু ভোলানোর মতো কোটি কোটি মানুষকে ভোলান।

যেমন করে কোটি মানুষকে ভোলানো হয়েছে ২০১৬ সালের ৫ জুন চট্টগ্রামের ওআর নিজাম রোডে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাত ও গুলি করে পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা বাবুলের স্ত্রী মিতু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা, কুমিল্লার সোহাগী জাহান তনু ধর্ষণের ঘটনা, সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনির হত্যাসহ অসংখ্য ঘটনাকে।

বরগুনার রাস্তায় প্রকাশ্যে স্ত্রীর সামনে স্বামীকে সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে মারলো অথচ জনগণ সেই দৃশ্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিডিও করল, কিন্তু কেউ বাধা দিল না বলে গতকাল ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট।

‘দেশের জনগণ তো এমন ছিল না’— এ অসহায়োক্তি তুলে হাইকোর্ট বলেন, আমরা জনগণের বিষয়ে কী আদেশ দেব? আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতে বলেন, যতটুকু জেনেছি, এখনো মামলা হয়নি।

এ ঘটনার বিচার যদি কোনো কারণে বিলম্বিত হয় ও বিচারহীন হয়, তাহলে এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে। এ সময় পাশ থেকে অপর এক আইনজীবী আদালতকে জানান, রিফাত শরীফকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকালে ১২ জনকে আসামি করে নিহত যুবক রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ এ মামলা করেন। এর আগে ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, এমন একটি হত্যার ঘটনা প্রকাশ্যে ঘটল। এটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ প্রভাবও ফেলেছে।

এ ঘটনায় মর্মাহত হয়ে জনগণের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে হাইকোর্ট এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কী পদক্ষেপ (অ্যাকশন) নেয়া হয়েছে, গতকাল দুপুর দুইটার মধ্যে জানাতে বলেছেন সংশ্লিষ্টদের। বরগুনার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারের (এসপি) সঙ্গে কথা বলে সংশ্লিষ্ট কোর্টের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার এবিএম আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশারকে এ তথ্য জানাতে বলা হয়।

এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আদালত বলেন, সবাই পাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো আর ভিডিও করলো। এটা আমাদের জনগণের ব্যর্থতা। দেশের মানুষ তো এমন ছিল না।

সামাজিকতা এখন কোথায় দাঁড়িয়েছে? এছাড়াও এ ঘটনায় জড়িতরা যেন দেশত্যাগ করতে না পারে সে বিষয়ে দেশের সব থানায় অ্যালার্ট জারি করতে বলে পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) ব্যবস্থা নিতেও বলেছেন আদালত।

বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন জানিয়েছেন, নেয়াজ রিফাত শরীফকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় চন্দন নামের এক যুবককে বুধবার রাতেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যদিও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়েছে মূলহোতারা।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে জানিয়ে তিনি বলেন, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। ঘটনাস্থলের থাকা সিসি ক্যামেরা পুলিশের নজরদারির মধ্যেই ছিল বলে জানালেও কেন পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়নি— এ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার মারুফ হোসেনকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।

এদিকে, ঘটনার পুরো ভিডিও ফুটেজ দেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি হত্যাকারীদের যেকোনো মূল্যে গ্রেপ্তারের নির্দেশও দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

এদিকে বুধবার রূপগঞ্জে আওয়ামী লীগের এক ইউপি সদস্যকেও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে এটা কি বলা যায়— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে তিনি দাবি করেন এগুলো দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা।

আইন ও সালিসকেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নুর খান লিটন বলেন, বিচারহীনতার সুযোগেই এসব অপরাধ ঘটছে। কেউ প্রতিবাদ করেন না সাম্প্রতিককালে এমরকম ঘটনা বহু ঘটেছে কিন্তু আমরা প্রতিবাদ করি না।

প্রতিবাদহীনতার কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, রাষ্ট্র প্রতিবাদকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারছে না। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়ের কারণে প্রতিবাদহীনতার সংস্কৃতির দেখা দিচ্ছে।

গণতন্ত্রকে সংকুচিত করা হচ্ছে, কথা বলার ক্ষেত্রে কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সমাজের চালিকা শক্তি রাজনীতি। সেই রাজনীতি বর্তমানে আদর্শহীন বরং দুর্বৃত্তায়ণের কবলে পতিত হয়েছে। যে কারণে সমাজকে সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না।

বরগুনার ঘটনার মূলহোতা নয়ন বন্ড মাদক মামলার আসামি এবং হাজতবাসীও ছিল- কিন্তু জামিন সহজলভ্য হওয়ায় জেল থেকে বের হয়ে এরকম একটি হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পেরেছে, এ বিষয়ে তার মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, জামিন পাওয়ার অধিকার সবারই রয়েছে এবং দেওয়ার এখতিয়ার সম্পূর্ণ আদালতের।

তবে মূল কথা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা যথাযথভাবে আদালতে ঘটনার বিবরণ উপস্থান করছে না বলেই এ ধরনের আসামিরা সহজেই জামিন লাভ করছে এবং পুনরায় অপরাধে জড়াচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এ আইজি (মিডিয়া) সোহেল রানার মুঠোফোনে অপরাধী ও তাদের মামলা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে— ‘পুলিশ সদস্যরা যথাযথ তথ্য উপস্থাপন না করায় জামিন সহজলভ্য হয়ে উঠেছে এবং জামিনে বের হয়ে ফের অপরাধে জড়াচ্ছে অপরাধীরা, বরগুনার ঘটনার মূল আসামি নয়ন বন্ডও মাদক মামলার আসামি ছিলো, তার জামিন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে— এবিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের বক্তব্য কী?

জানতে চেয়ে এসএমএস করা হলে জবাব আসে এভাবে— ‘আসামিকে জামিন দেওয়া না দেওয়া আদালতের এখতিয়ার। পুলিশ তথ্য উপস্থাপন না করায় আদালত জামিন দিয়ে দেয়- ঢালাওভাবে এমন অভিযোগ সঙ্গত নয়।’ সূত্র : আ. সংবাদ -ডেস্ক