(দিনাজপুর২৪.কম) বিপুল প্রত্যাশা জাগিয়ে যাত্রা শুরু করলেও দায়িত্ব পালনে দেড় বছর হতে না হতেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম নানা গুরুতর অনিয়মে জড়িয়ে ইতিমধ্যে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে দলীয় ও স্বজনপ্রীতিকরণ, বিতর্কিতদের পদায়ন, প্রশাসনিক ধীরগতি, প্রাকৃতিক সম্পদ বিনষ্ট করাসহ নানা অভিযোগে বিতর্কিত হয়ে পড়েছে তার প্রশাসন। চাটুকারদের প্রভাব ও ভিসির শারীরিক অক্ষমতাকেই চলমান অনিয়মের নেপথ্য কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্র জানায়, গত ১৩ই জুলাই কোন ধরনের বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে দলীয় ও স্বজনপ্রীতি করে ৬ জনকে নিয়োগ  দেন ভিসি অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম। ঈদ উপলক্ষে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় তড়িঘড়ি করে এ নিয়োগ দেন তিনি। এতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরের প্রত্যক্ষ মদত আছে বলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা জানান। নিয়োগপ্রাপ্তরা শাখা ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির ২ জন সহ-সভাপতি, ১ জন সাংগঠনিক সম্পাদক ও ১ জন গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক। বাকি ২ জন ভিসির একান্ত সচিবের স্ত্রী ও তার অফিসের ঊর্ধ্বতন সহকারীর ছেলে। এদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে বহিষ্কার, চাঁদাবাজি, সংঘর্ষ, নিজ ও বিরোধী সংগঠনের প্রতিপক্ষ গ্রুপের নেতাকর্মীদের মারধরসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। এমন বিতর্কিত প্রার্থীদের কোন প্রজ্ঞাপন ছাড়াই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মতাদর্শের শিক্ষকরা। এমন নিয়োগের মাধ্যমে উপাচার্য ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ নেতাদেরকে পুনর্বাসন শুরু করেছেন বলে অভিযোগ করেন তারা। ইতিমধ্যে বিতর্কিত নিয়োগ বাতিলের দাবিতে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম। স্মারকলিপিতে তারা এ ধরনের ‘বিতর্কিত’ নিয়োগ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে এ নিয়োগ বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন। এদিকে নজিরবিহীনভাবে ২০১৪ সালের ২৫শে অক্টোবর সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুলের আপন ভাগ্নে কাজী রাসেল উদ্দিনকে (দ্বিতীয় শ্রেণী, ননথিসিসি) প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন এই ভিসি। ওই একই বিভাগে শিক্ষক সংকট না থাকা সত্ত্ব্বেও স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের মাধ্যমে মেধা তালিকায় ১৫তম, ১৪তম, ১৩তম, ১০ম, ও ৬ষ্ঠ তম স্থান অধিকারীদের নিয়োগ দেয়া হয়।  যেখানে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত, পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রিধারী ও শিক্ষকতায় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রার্থীরা বাদ পড়েন। বিতর্কিতদের পদায়ন: উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরই অধ্যাপক ফারজানা সে সময়ে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বরত ১৪ জন শিক্ষককে কোন কারণ ছাড়াই বিনা নোটিশে অব্যাহতি দেন। তাদের জায়গায় বিতর্কিত শিক্ষকদের পদায়ন করেন। সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুলের সময় অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে ‘চার খলিফা’ খ্যাতদের মধ্যে দু’জন অধ্যাপক এসএম বদিয়ার রহমানকে নির্মাণাধীন বেগম সুফিয়া কামাল হল ও অধ্যাপক অসিত বরণ পালকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের প্রভোস্ট হিসেবে নিয়োগ দেন। এর আগের ভিসির সময় দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে প্রক্টর পদ থেকে অব্যাহতি নেয়া রসায়ন বিভাগের বিতর্কিত অধ্যাপক তপন কুমার সাহাকে পুনরায় প্রক্টর হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েন ভিসি। ইতিমধ্যে অধ্যাপক তপনের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি, আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি বিনষ্টসহ নানান অভিযোগ উঠেছে। ছাত্রলীগকে বিভক্তির অপচেষ্টার কারণে একাধিকবার তার পদত্যাগে আন্দোলনে নামে শাখা ছাত্রলীগ। প্রক্টরের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকেও তিনি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব হলের প্রভোস্টের দায়িত্ব বাগিয়ে নিয়েছেন। অধ্যাপক তপনকে নিয়ে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের মধ্যে বিরাজমান ক্ষোভ যেকোন সময় বিস্ফোরণে রূপ নিতে পারে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন আওয়ামীপন্থ্থি শিক্ষক এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। চাকরি স্থায়ীকরণ না করা, ২ বছরের অধিক সময় ধরে বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রভাষক ড. উম্মে সালমা জোহরা, চারুকলা বিভাগের এম.এম ময়েজউদ্দিন, শারমিন জামান, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের সুদীপ পাল কর্মরত থাকলেও তাদের  চাকরি স্থায়ীকরণ না করে একই বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এরা সাবেক প্রশাসনের সময় নিয়োগ পাওয়ায় শরীফ এনামুলের নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমান ভিসি তাদের চাকরি স্থায়ী করছেন না বলে শিক্ষকদের অভিযোগ।
শিক্ষার্থী ভর্তিতে অনিয়ম: পোষ্যদের সুযোগ করে দিতে ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন বিষয়ে ভর্তির শর্ত শিথিল করে দেয়া হয়। এতে কম নম্বর পেয়েও অ-মেধাবীরা ভর্তির সুযোগ পায়; অধিক নম্বর পেয়েও মেধাবীরা বঞ্চিত হয়। ভিসির বিশেষ কোটায় (মুক্তিযোদ্ধা) প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ৪৩তম ব্যাচে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান না হয়েও ভুয়া সনদের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীকে ভর্তি করানোর অভিযোগ রয়েছে।
প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট: বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অবকাঠামোগত’ উন্নয়নের অজুহাতে বারবার নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, লেকের পানি শুকিয়ে ধানচাষ, লেকের চারপাশে রাস্তা নির্মাণসহ নানাবিধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট করছে বলে জানান পরিবেশবিদরা। এদিকে ২৩শে মে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটে চাপে পড়ে ও চলমান আন্দোলনকে দমাতে ছাত্রী লাঞ্ছনার দায়ে পাঁচজন শিক্ষার্থীকে আজীবন বহিষ্কার করার অভিয়োগ উঠেছে এ প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এছাড়া, ভিসি বিভিন্ন সময়ে অসুস্থ থাকেন বলে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে একধরনের ধীরগতির অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. শরীফ উদ্দিন বলেন,  ঈদের ছুটিতে তড়িঘড়ি করে অ্যাডহক মাধ্যমে প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে মাননীয় ভিসি নিজ ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। নৈতিকতার জায়গা থেকে তিনি সরে এসেছেন। এটা অনিয়ম ও দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে। এই নৈতিকতা বিবর্জিত কার্যের কারণেই  প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা কার্যক্রম থেকে শুরু করে অবকাঠামো উন্নয়ন এমনকি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি স্বচ্ছতা আনতে পারেননি। ভিসি যে আশা শিক্ষকদের মধ্যে সঞ্চার করে নিজ দায়িত্বে বসেছিলেন, তার একটিতেও তিনি সফল হতে পারেননি। এসব বিষয়ে সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. নাসিম আখতার হোসাইন বলেন, ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি মেধাহীন লোকদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এখনও তাই হচ্ছে।  দলীয় ও স্বজনপ্রীতির বিবেচনায় নিয়োগ প্রক্রিয়া এ প্রশাসন অব্যাহত রেখেছে। এগুলো যে বন্ধ জরুরি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এসব দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করতে ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রক্ষা করার জন্য আমাদের বড় ধরনের কোন কর্মসূচি হাতে নিতে হতে পারে বলে আমি মনে করি। পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান বলেন, সাবেক ভিসির পতনের মধ্য দিয়ে বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণ করে। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণ করে তারা সুষ্ঠুভাবে ক্যাম্পাস পরিচালনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এরই মধ্যে এই প্রশাসন নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর তপন কুমার সাহা বলেন, আমার বিষয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে তা সম্পূর্ণ বানোয়াট। আর এসব বিষয়ে আমার কোন কিছু বলার নেই। শুধু আমার অফিসে যে কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তার জন্য ভিসিকে অনুরোধ করেছিলাম। এ বিষয়ে ভিসি অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম বলেন, প্রশাসনিক পদ খালি থাকায় সেখানে প্রয়োজনে জরুরিভিত্তিতে ৬ নং ধারা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় ভিসির যে ক্ষমতা রয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া, তাদের সঙ্গে আমার কোন রক্তের সম্পর্ক নেই। চাপে পড়ে ও চলমান আন্দোলনকে দমাতে ছাত্রী লাঞ্ছনার দায়ে পাঁচজন শিক্ষার্থীকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে কিভাবে অনেকজন ছাত্রীকে লাঞ্ছিত করে। এটাতো তাদের সব থেকে বড় অপরাধ। বৃক্ষনিধন করে পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অবকাঠামোগত উন্নয়নে এ গাছগুলো কাটা হয়েছে। তবে আমরা এরই মধ্যে প্রচুর গাছ রোপণ করেছি ও করবো। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের প্রাধান্য দিয়েছি। আর অধিকাংশ নতুন বিভাগে শিক্ষক না থাকায় শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে যার কারণে সকল শিক্ষককে স্থায়ীকরণ করা সম্ভব হয়নি। আমার কোন প্রতিপক্ষ নেই, সকলেই সমান। দায়িত্ব গ্রহণ করার পরেই কিছু শিক্ষক নিজ ইচ্ছায় বিভিন্ন দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। -ডেস্ক