(দিনাজপুর২৪.কম) গ্রাহকসেবা নিশ্চিতে টেলিযোগাযোগ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সময় সময় নানা নির্দেশনা দিয়ে আসছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। টেলিযোগাযোগ আইন অনুযায়ী বিটিআরসির এসব নির্দেশনা অনুসরণে বাধ্য অপারেটররা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দেয়া অনেক নির্দেশনাই উপেক্ষা করছে সেলফোন অপারেটররা।
জানা গেছে, সেলফোন অপারেটরদের বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় সংযোগের অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থ এবং এ-সংক্রান্ত ডাটাবেজ প্রদানে বিটিআরসি সংশ্লিষ্ট সব অপারেটরকে নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়ন করেছে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান। এমনকি এ বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিস দিলেও তার জবাব দেয়নি অপারেটররা। একে বেআইনি ও অসৌজন্যমূলক বলে মনে করছে খোদ কমিশন।
অন্যদিকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার উপবৃত্তি প্রদানের জন্য নির্দিষ্ট শর্টকোডে সেলফোন অপারেটরগুলোকে ইউএসএসডি (আনস্ট্রাকচারড সাপ্লিমেন্টারি সার্ভিস ডাটা) কানেক্টিভিটি দেয়ার নির্দেশ প্রদান করে বিটিআরসি। সে নির্দেশনাও পরিপালন করা হয়নি। দুটি অপারেটর এ সংযোগ প্রদানে অপারগতা প্রকাশ করে। অন্য একটি অপারেটর প্রাথমিকভাবে সংযোগ দিলেও পরবর্তীতে তা বন্ধ করে দেয়। সেলফোন অপারেটরদের এ আচরণকে অসহযোগিতামূলক ও নির্দেশনা প্রতিপালনে অস্বীকৃতি বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, নির্দেশনা অনুযায়ী শুধু একটি অপারেটর অর্থ ফেরত দিয়েছে। অন্যগুলোকে এরই মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কিছু জটিলতা রয়েছে। এটি কাটিয়ে উঠতে পদক্ষেপ নিচ্ছে বিটিআরসি। আর প্রাথমিক শিক্ষার উপবৃত্তি প্রদানের বিষয়টি এখন মন্ত্রণালয় দেখছে।
গত ৩১ জানুয়ারি সব সেলফোন অপারেটরের প্রতি অব্যবহূত সেলফোন নম্বর পুনর্বিক্রয়-সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে চিঠি দেয় বিটিআরসি। তাতে বলা হয়, সঠিকভাবে পুনর্নিবন্ধন না করার কারণে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সেলফোন অপারেটরদের যেসব সিম ও রিম নিষ্ক্রিয় বা বন্ধ করা হয়েছে এবং ওইসব সিম ও রিমের যেগুলো এখন পর্যন্ত বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে, সংশ্লিষ্ট অপারেটর সেগুলো বিক্রি করতে পারবে। এছাড়া ২০১৪ সাল পর্যন্ত সিম বক্স ডিটেকশন সিস্টেম ও সেলফোন অপারেটরদের সেলফ রেগুলেশন প্রক্রিয়ায় বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় সিম ও রিম আবারো বিক্রি করতে পারবে সংশ্লিষ্ট অপারেটর। দুটি ক্ষেত্রেই নিষ্ক্রিয় বা বন্ধ সিমের অ্যাকাউন্টে থাকা অব্যবহূত অর্থের সুস্পষ্ট হিসাব ও ডাটাবেজ সংশ্লিষ্ট অপারেটর সংরক্ষণ করবে। এসব সংযোগের অ্যাকাউন্টে থাকা সব অর্থ ও ডাটাবেজ ১০ দিনের মধ্যে বিটিআরসিকে প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয় চিঠিতে। তবে ফৌজদারি মামলায় সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিংবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কোনো বিশেষ কারণে বন্ধ করেছে, এমন সিম বা রিমকে এ নির্দেশনার বাইরে রাখা হয়।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, ৩১ জানুয়ারি দেয়া নির্দেশনা অনুসরণ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ ফেরত দিয়েছে শুধু গ্রামীণফোন। বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে থাকা ৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা কমিশনের কাছে জমা দিয়েছে অপারেটরটি। বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় ২৫ লাখ সংযোগের অ্যাকাউন্টে এ পরিমাণ অর্থ ছিল বলে গ্রামীণফোন বিটিআরসিকে হিসাব দিয়েছে।
নির্ধারিত সময়ে তথ্য ও অর্থ না দেয়ায় গ্রামীণফোন ছাড়া অন্য সব অপারেটরের কাছে ১০ দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা চেয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি চিঠি দেয় বিটিআরসি। বাংলালিংক, রবি, সিটিসেল ও টেলিটক ছাড়াও সম্প্রতি রবির সঙ্গে একীভূত হওয়া এয়ারটেলকেও আলাদাভাবে এ চিঠি দেয়া হয়। এতে বলা হয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হিসাব ও অর্থ জমা না দিয়ে কমিশনের নির্দেশনা লঙ্ঘন করা হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে কমিশনের নির্দেশনা অনুসরণ না করা এবং লাইসেন্সের সংশ্লিষ্ট শর্ত লঙ্ঘন করায় টেলিযোগাযোগ আইনের ৭৩ ধারার বিধান অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা কেন নেয়া হবে না, ১০ দিনের মধ্যে তা জানাতে বলা হয়। পাশাপাশি সাতদিনের মধ্যে ডাটাবেজ ও অর্থ কমিশনে জমার নির্দেশ দেয়া হয়।
তবে নির্দেশনা অনুসরণ না করায় গত মার্চে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১-এর ধারা ৬৪(১)-এর আওতায় বাংলালিংক, রবি, সিটিসেল, টেলিটক ও এয়ারটেলকে আলাদাভাবে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় বিটিআরসি। নোটিসে বলা হয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অমান্য করায় টেলিযোগাযোগ আইন এবং টুজি ও থ্রিজি লাইসেন্সিং নীতিমালার শর্ত লঙ্ঘন হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের টেলিযোগাযোগ আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কমিশন।
জানতে চাইলে বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান বলেন, সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সব ধরনের নীতি ও আইন সবসময়ই মেনে চলছে বাংলালিংক। দেশের বিদ্যমান আইন অনুসরণ করে আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন ইস্যু সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়। বাংলালিংককে নিয়ে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, তার অনেকগুলোই সঠিক নয়।
সিমের অব্যবহূত ব্যালান্স প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিটিআরসির সঙ্গে আলোচনা চলছে। আলোচনা শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো যাবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দেয়া চিঠিতে রূপালী ব্যাংকের ‘শিওর ক্যাশ’ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার উপবৃত্তি বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ৮০ হাজার গ্রামের ১ কোটি ৩০ লাখ শিক্ষার্থীর কাছে এ সেবার মাধ্যমে উপবৃত্তি পৌঁছে দেয়া হবে। এ সেবা প্রদানে শিওর ক্যাশ ১৬৪৯৫ শর্টকোড ব্যবহার করছে। এটির সঙ্গে সংযোগ প্রদানে গত ফেব্রুয়ারিতে সেলফোন অপারেটরগুলোকে চিঠি দেয় বিটিআরসি। তবে এ নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামীণফোন ও রবি আজিয়াটা সংযোগ প্রদানে অপারগতা প্রকাশ করে। অন্যদিকে বাংলালিংক সংযোগ দিলেও পরবর্তীতে তা বন্ধ করে দিয়েছে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার মাহমুদ হোসেন বলেন, রূপালী ব্যাংক ও গ্রামীণফোনের মধ্যে কোনো পরিচালন চুক্তি নেই, যেটি যেকোনো সংযোগ বা কারিগরি সহযোগিতার পূর্বশর্ত। এছাড়া যেকোনো সংযোগ স্থাপনের জন্য উভয় পক্ষের মধ্যে বাণিজ্যিক চুক্তি থাকতে হবে। গ্রামীণফোন গত বছরের ৯ আগস্ট রূপালী ব্যাংককে একটি বাণিজ্যিক প্রস্তাব দিয়েছে, যা নিয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়াও আমরা বিটিআরসির কাছে ইউএসএসডির মূল্য অনুমোদনের আবেদন করেছি। কারণ রূপালী ব্যাংককে বিটিআরসি যে শর্টকোড অনুমোদন করেছে, তার ৫ নং শর্ত অনুযায়ী সেবা প্রদান শুরু করার আগে সংশ্লিষ্ট টেলিকম অপারেটরের কল রেট বিষয়ে বিটিআরসির অনুমোদন নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিটিআরসি ইউএসএসডি ট্যারিফ অনুমোদন করলে আমরা চুক্তির বিষয়ে অগ্রসর হতে পারব।
তিনি জানান, ইউএসএসডি সংযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যৌক্তিকতা ও এর টিকে থাকার সক্ষমতার বিষয়ে জটিলতা রয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ ও জটিলতা সমাধানে অ্যামটবের মাধ্যমে সেলফোন অপারেটররা ইউএসএসডির সেশনভিত্তিক ট্যারিফ অনুমোদনের জন্য রেগুলেটরকে অনুরোধ করেছে। সংশ্লিষ্ট রেগুলেটর এখন ইউএসএসডির মূল্য নিয়ে কাজ করছে।
ইউএসএসডি একটি মূলবান টেলিকম সম্পদ উল্লেখ করে তাইমুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত সরকারের দেয়া সব নির্দেশনা অনুসরণ করে আসছি আমরা। যদিও আমরা মনে করি, আর্থিক সেবা দিতে সেলফোন অপারেটররা ন্যায্য আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ইউএসএসডির সঠিক মূল্য নির্ধারণে আমরা সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করছি।
যদিও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বলছে, যেহেতু ইউএসএসডি প্রাইসিং নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, তাই এটি নির্ধারণের আগ পর্যন্ত বিদ্যমান রেভিনিউ শেয়ারিং মডেলেই রূপালী ব্যাংকের সেবাটিতে সংযোগ প্রদানের জন্য গ্রামীণফোন ও রবি আজিয়াটাকে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্দেশ দেয়া হয়। এ নির্দেশনার পরও সংযোগ প্রদানে অপারগতা প্রকাশ করে অপারেটর দুটি।
এসব বিষয়ে রবির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ও সেবার উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় বিটিআরসি। ২০০১ সালে প্রণীত টেলিযোগাযোগ আইনের আওতায় স্বাধীন এ কমিশনের জন্ম হয়। ২০১০ সালে সংশোধন করা আইনে লাইসেন্স প্রদান ও ট্যারিফ নির্ধারণসহ বেশকিছু ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা দেয়া হয়। এতে খর্ব হয় সংস্থাটির ক্ষমতা।
বর্তমানে খাত-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স দেয়া হয় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অনুমোদনের ভিত্তিতে। এছাড়া অপারেটরগুলোকে ট্যারিফের অনুমোদনও দেয়া হয় মন্ত্রণালয়ের সম্মতিসাপেক্ষে। আইন সংশোধনের আগে এসব বিষয় কমিশনের এখতিয়ারে ছিল। -ডেস্ক