বিশেষ প্রতিবেদক (দিনাজপুর২৪.কম) বিএনপি দেশে এক সময়কার ক্ষমতাধর রাজনৈতিক দল। এখন হ-য -ব -র- ল। তবে এখনো প্রাণ আছে, মরে যায়নি! পুষ্টিকর নির্দেশনা থাকলে আন্দোলনের মাঠে এখনো চাষাবাদ সম্ভব। ফিরে পাওয়া সম্ভব নিজেদের অধিকার। পেতে পারে আমজনতার সমর্থনও। কিন্তু যখন এই দলের শীর্ষ নেতাদের হাতে সময় থাকে তখন তাদের জোশ থাকে না। আর যখন জোশ আসে তখন হাতে সময় থাকে না। জোশে হুশে অমিলে বরাবরই বৃহত্তর রাজনৈতিক দলটিতে আন্দোলনে গরমিল। যার ফলে কমছে জনপ্রিয়তা। দুর্বল নেতৃত্বের কারণে ঘরের আপনজনও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। মেঘছায়ায় আলো ঘরও অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। তবে নেতারা আশার বাণীও শোনাচ্ছেন। বলছেন কেবল প্রেস রিলিজ, সভা- সেমিনার, সংবাদ ব্রিফিং থেকে নিজেদের শীঘ্রই বের করে আনবেন। কিন্তু এবার কয়েকদিন ধরে নতুন করে আরেকটি ঝড়ের লক্ষণ দেখা দিয়েছে আগামী নির্বাচন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও আন্দোলনকে সামনে রেখে বিএনপিসহ প্রত্যক শাখা প্রশাখায় (অঙ্গ সংগঠন) পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে। বিভিন্ন স্থানে পূর্ণাঙ্গ কমিটিকে মেনে নিতে পারছে না পদবঞ্চিতরা। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর উত্তরের কমিটি ঘোষণার প্রতিবাদে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেছে কমিটিতে পদ না পাওয়া নেতাকর্মীরা। পদ প্রত্যাশীদের অভিযোগ, বিএনপির ইতিহাসে মহানগর উত্তরে এটিই প্রথম ‘পকেট’ কমিটি। এসময় তারা অভিযোগ করেন, ১৪৮টি মামলায় ‘কারা নির্যাতিত’ নেতা দেলোয়ার হোসেন দুলুকেও কোনো পদ পদবীতে রাখা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা বাবুল আহমেদ, আবুল বাশারদের মতো নেতাদেরকেও মূল্যায়ন করা হয়নি। সদ্য কমিটিকে তারা ‘পকেট’ কমিটি হিসেবে দাবী করেন। এ নিয়ে দলের সংস্কারবাদী বেশ কিছু শীর্ষ নেতা আশংকা প্রকাশ করে বলেন, যখন হাতে সময় ছিলো তখন বিএনপিকে এই কমিটি গঠনের উদ্যেগ নেয়া উচিৎ ছিলো। নির্বাচনের আগে কমিটিতে সব ত্যাগি নেতাকে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। এটি আন্দোলনে আরো বড় বিপর্যয় হতে পারে এবং এভাবে কমিটি গঠন হলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আরো বাড়তে পারে। লন্ডনের একটি সূত্র জানায়, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমান গত ৩১ মে এর মধ্যে সব কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তা সম্ভব না হওয়ায় সেই সময় ১০ জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ‘হার্ড’ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ১০ তারিখের মধ্যে দলের সব ধরনের কমিটি গঠন করতে না পারলে পুরাতন সব কমিটি বিলুপ্তি ঘোষণা করে তারেক জিয়ার হস্তক্ষেপেই সব কমিটি সম্পন্ন করা হবে। সেই নির্দেশনা পালনে সম্প্রতি বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলসহ সব আংশিক কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হচ্ছে । তারই ধারাবাহিকতায় এরমধ্যে যেসব জেলার আহ্বায়ক কমিটি রয়েছে সেগুলো পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে লন্ডনে পাঠানো হচ্ছে। সেখান থেকে অনুমোদনের পরে তা ঘোষণা করা হবে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রস্তুত করা হয়েছে। শীঘ্রই তা প্রকাশ করা হবে। এছাড়াও বিএনপি অঙ্গসংগঠনের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, যুবদলের ৩০টি জেলার কমিটি করা হয়েছে। কমিটি গঠন হয়েছে ছাত্রদলেরও অর্ধশত ইউনিটের। এছাড়া পর্যায়েক্রমে স্বেচ্ছাসেবকদল, মুক্তিযোদ্ধা দল, শ্রমিক দল, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থার কমিটি সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া চলছে। এদিকে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ২৫টি থানা এবং ৫৮ ওয়ার্ডের কমিটি করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সব থানা ওয়ার্ডের কমিটিও প্রস্তুত করা আছে। যেকোনও সময় সেটিও আলোর মুখ দেখবে। তবে কমিটিতে বিএনপিতে ত্যাগী, নির্যাতিত নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে ‘অর্থের বিনিময়ে’ কমিটি গঠন হচ্ছে এমন অভিযোগও উঠেছে। নির্বাচনের আগে এ কমিটি গঠন আন্দোলনের সঙ্গে কোন ধরনের সম্পৃক্ততা আছে কিনা জানতে চাইলে ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন অর রশিদ কে বলেন, শুধু ছাত্রদলের নয়, সমানতালে বিএনপিসহ সব অঙ্গসংগঠনের কমিটি গঠন চলছে। হ্যা, এ কমিটি অবশ্যই আন্দোলনে প্রভাব থাকবে। তা ছাড়া বিএনপির সব আন্দোলনে ছাত্রদল সক্রিয় ছিল। আগামী দিনের সব আন্দোলন সংগ্রামে আরও বেশি সক্রিয় থাকার জন্য সারাদেশে জেলা ও মহানগর পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা, উপজেলা, ইউনিভারসিটির কমিটিগুলোও শীঘ্রই পূর্ণাঙ্গ করা হবে। যখন কোনো ইস্যু আসে তখন কমিটি গঠনের মাধ্যমে বিএনপিকে চাঙ্গা রাখার কৌশল দেখা যায়। চলমান কমিটি গঠন আদৌ কী পূর্ণাঙ্গ হবে এবং এটি কী আগামী নির্বাচনে কোনো ভূমিকা পালন করবে এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান দুদুর কাছে জানতে চাইলে তিনি  বলেন, কমিটি গঠন এটি একটি রুটিং ওয়ার্ক। মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে কমিটি গঠন করতেই হবে। যেসব কমিটি মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে সেগুলোতে নতুন নেতৃত্ব আনা হচ্ছে। আর যেগুলো আংশিক কমিটি সেগুলোও পূর্ণাঙ্গ করা হচ্ছে। নতুন নেতৃত্বে, নতুন প্রাণ। নতুন কমিটি অবশ্যই আন্দোলনের অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। তবে আমাদের আন্দোলন এখনো চলমান আছে। এখন যেহেতু রমজান মাস চলছে তবুও রাজনৈতিক আদর্শ অনুসরণ করে আমাদেরও সব প্রক্রিয়া চলছে। ঈদের পরেই আমাদের চূড়ান্ত আন্দোলনের রুপরেখা দেয়া হবে। তখন নেতৃত্বে আসা নতুন মুখগুলো রাজপথের আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকবে এটি বলা যেতে পারে। নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিতে কমিটি গঠন আন্দোলন সফলের কোনো মাধ্যম হতে পারে কিনা জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল  বলেন, প্রত্যেকটি দলে পূর্ণাঙ্গ কমিটি থাকা এটি দলের জন্য প্রাণ। বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিকদল এখানে নেতৃত্বর চর্চা অবশ্যই রয়েছে। মাঠ পরিচালনার জন্য নেতা এবং কর্মীর দুটোই প্রয়োজন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আগামী নির্বাচনের আগে মাঠ পর্যায়ে আন্দোলন সফলের জন্য কমিটি গঠন এটিও আন্দোলনের একটি অংশ। একটি সু-শৃঙ্খল নেতৃত্বর জন্য মাঠে কর্মীদের কাজে লাগানোর এই প্রক্রিয়াও অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।এ বিষয়ে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী  বলেন, আন্দোলন ছাড়া আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া সম্ভব নয়। আন্দোলন ছাড়া আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একমাত্র আন্দোলনই বিএনপির জন্য সুপথ। আর আন্দোলনকে বেগবান করার জন্যই বিএনপি ও অঙ্গসংঠন গুলোর যে কমিটি গুলো হচ্ছে এটি ভূমিকা পালন করবে । তা ছাড়া বিএনপি জনগণের অধিকারের জন্য রাজপথে ছিলো আগামীতেও থাকবে। বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের সূত্র ও লন্ডনের সূত্রে জানা যায়, সমন্বয়হীনতা ও মতানৈক্যে এবং বেশ কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বিএনপি এতদিন আন্দোলনে আলোর মুখ দেখেনি। নানা পর্যবেক্ষণে উঠে আসে দলের শরীকদল জামায়াতে ইসলামীর ইন্ধনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তও বড় ভুল ছিল। এছাড়া বাংলাদেশ সফরে আসা ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে বেগম জিয়ার সাক্ষাৎ না করাও বিএনপির কূটনৈতিক অদূরদর্শিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্দোলন ব্যর্থতার অন্তরালে বিভিন্ন জায়গায় সাংগঠনিক বিরোধও বড় কারণ ছিলো। ঢাকা মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ও বিভিন্ন থানা কমিটি না থাকাও ঢাকা শহরে চলমান সরকার বিরোধী আন্দোলনে ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়েছে। বিগত বিএনপির সব আন্দোলনে জামায়াত-শিবির সম্পৃক্ত থাকায় আন্তর্জাতিক চাপও বিএনপিকে কোনঠাসায় পড়তে হয়েছে।