(দিনাজপুর২৪.কম) হঠাৎ করে বিএনপিতে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। দলে ভাঙন ধরাতে ভেতরে ভেতরে সরকারের নানা তৎপরতা ও কিছু আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে এ অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আকস্মিকভাবে ওমরাহ পালন ও সৌদি আরব সফর স্থগিতে এ অস্বস্তির মাত্রা বেড়েছে এবং তা কেন্দ্র থেকে নিচের দিকেও ছড়াচ্ছে। কারণ, খালেদা জিয়ার সৌদি সফর স্থগিতের নেপথ্যে যে কারণগুলো দলে আলোচিত হচ্ছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল, ওমরাহে গেলে তাঁর অনুপস্থিতিতে বিএনপিকে ভাঙা বা দলের ভেতরে উপদল সৃষ্টির করে গোলমাল বাধাতে সরকার পরিকল্পনা আঁটছিল। এমন আশঙ্কা বা তথ্যের ভিত্তিতে খালেদা জিয়া পূর্বনির্ধারিত সৌদি সফর স্থগিত করেছেন। এরপর বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আমান উল্লাহর (আমান) একসঙ্গে ৪২টি মামলায় আগাম জামিন পাওয়ায় দলে ওই ধারণা আরও গতি পায়।
এর কারণ হিসেবে দলের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা দিনাজপুর২৪.কমকে বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যাতে জামিন না পান, সে জন্য হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে সরকারের পক্ষে অনেক চেষ্টা করা হয়েছে, যা আমানের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। অবশ্য আপিল বিভাগ গতকাল সোমবার মির্জা ফখরুলের ছয় সপ্তাহের জন্য জামিন মঞ্জুর করেছেন।
এসব নেতা জানান, একদিকে কারাবন্দী নেতাদের জামিন পেতে বেগ পাওয়া, আবার কারও একসঙ্গে ৪২ মামলায় আগাম জামিন পাওয়ার বিষয়টি দলের অনেকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। এখন পরিস্থিতি এমন জায়গায় গেছে, আইন-আদালতের এসব বিষয়-আশয়ও সন্দেহের উদ্রেক করছে দলের নেতা-কর্মীদের। এতে দলের ভেতর একধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
তা ছাড়া দলের উচ্চপর্যায়ের কোনো নেতা কারামুক্তি পেলে বা জামিন পেলে দলীয় প্রধানের সঙ্গে দেখার করার রীতি আছে। কিন্তু আত্মগোপনে থাকা আমান উল্লাহ আমান গতকাল সোমবার পর্যন্ত চেয়ারপারসনের বাসভবন, তাঁর রাজনৈতিক কার্যালয় বা নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, কোথাও যাননি। এতে তাঁকে নিয়ে নানা গুঞ্জনের মাত্রা বাড়ছে। তাঁর সঙ্গে গাজীপুর ও ভোলার সাবেক দুই সাংসদের নামও আলোচিত হচ্ছে।
বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একজন নেতা দিনাজপুর২৪.কমকে বলেন, আমানসহ কয়েকজন নেতা সর্বশেষ আন্দোলনের সময় নিষ্ক্রিয় ছিলেন। এ কারণে হয়তো তাঁদের নিয়ে মাঠপর্যায়ে নানা কথাবার্তা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই নেতা এ-ও বলেন, অনেক সময় বিএনপিতে সন্দেহ-অবিশ্বাস তৈরি করার জন্য সরকারও মামলা, জামিন ইত্যাদি নিয়ে কূটকৌশল আঁটে, যা হয়তো সংশ্লিষ্ট নেতা জানেনও না।
এ বিষয়ে চেষ্টা করেও আমানের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি সচরাচর যেসব মুঠোফোন নম্বর ব্যবহার করেন, সেগুলো বন্ধ পাওয়া গেছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের কয়েকজন জানিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গেও আমানের যোগাযোগ নেই।
অবশ্য কিছুদিন ধরে বিএনপিতে বলাবলি হচ্ছিল যে কারাবন্দী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে সরকারের একটি কূটতৎপরতা রয়েছে। নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে এবং জামিনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তাঁকে বশে নেওয়ার চেষ্টা চলছিল বলেও আলোচনা ছিল। খালেদা জিয়ার সৌদি সফর স্থগিতের এটিও একটি কারণ ছিল বলে দলীয় একটি সূত্রের দাবি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মুখপাত্র আসাদুজ্জামান (রিপন) দিনাজপুর২৪.কমকে বলেন, ‘হ্যাঁ, এ ধরনের কথা বিচ্ছিন্নভাবে শুনছি। কারাগারে নেতাদের সঙ্গে সরকারের হয়ে কথা বলা হয়েছে।’ তিনি এ-ও বলেন, ‘আমরা যে বলছি কারাগারে নেতারা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, সরকার হয়তো নেতাদের স্বাস্থ্যের প্রকৃত খোঁজখবর নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করেছে। এর সঙ্গে দল ভাঙার বিষয়টি যুক্ত হওয়ার কথা না।’
বিএনপির দায়িত্বশীল অপর একটি সূত্র জানায়, ৬ জুলাই খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দলের স্থায়ী কমিটি, উপদেষ্টা পরিষদ, ভাইস চেয়ারম্যান ও যুগ্ম মহাসচিবদের নিয়ে বৈঠকের পর জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতা অস্বস্তিতে পড়েছেন। এর আগে স্থায়ী কমিটির তিন নেতা মওদুদ আহমদ, মাহবুবুর রহমান ও আবদুল মঈন খানের ‘এই বিএনপি দিয়ে হবে না’ বা ‘বিএনপির আদর্শিক বিচ্যুতি হয়েছে’ বলে হতাশা প্রকাশ করা ফোনালাপের অডিও ফাঁস হয়। এ নিয়ে সর্বশেষ বৈঠকে তাঁরা খালেদা জিয়ার উষ্মার মুখে পড়েন।
এ ছাড়া খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ও প্রেস সচিব মারুফ কামাল খানসহ গুলশান কার্যালয়কেন্দ্রিক কর্মকর্তাদের মধ্যে কারও কারও ব্যক্তিগত বিরোধ-বৈরিতাও দলে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এ নিয়ে নেতাদের মধ্যেও পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি হয়েছে বলে একাধিক সূত্র বলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা বলেন, এটা এমন পর্যায়ে গেছে যে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ৬ জুলাইয়ের বৈঠকে নিজেই বিষয়টি তোলেন। তিনি গুলশান কার্যালয় নিয়ে অহেতুক কথা বলা থেকে বিরত থাকতে বলেন।
অবশ্য বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান দাবি করেন, ‘সরকার বিএনপিকে দুর্বল করার জন্য দলে ভাঙনসহ নানা ষড়যন্ত্র করছে। এটা আমরা টের পাচ্ছি। কিন্তু সরকারের এ চেষ্টা সফল হবে না। দল অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ঐক্যবদ্ধ।’(ডেস্ক)