-সংগ্রহীত

(দিনাজপুর২৪.কম) করোনা মহামারিতে তৈরি সংকট উৎরাতে বড় আশার বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার এ বাজেটে নতুন কোন চমক না থাকলেও সঙ্কট সামাল দিতে ঋণ নির্ভরতা বেড়েছে। চলতি অর্থ বছরের বাজেটের চেয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতিও বেড়েছে। অনুদানসহ সামগ্রিক ঘাটতি দেখানো হয়েছে ১লাখ ৮৫৯৮৭ কোটি টাকা। যা জিডিপির ৫.৮ শতাংশ। চলতি বাজেটে এ ঘাটতি ছিল ৫.৩ শতাংশ। বিশাল ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ৮৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা ঋণের কথা বলা হয়েছে। বাজেটে ব্যক্তি পর্যায়ে করসীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়িয়ে তিন লাখ টাকা করা হয়েছে।

নতুন বাজেটে প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ ভাগ এবং মূল্যস্ফিতি ৫.৪ শতাংশে ধরে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এ বাজেটকে বাস্তবতা বিবর্জিত উল্লেখ করে তা বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। অর্থর্নীতির নীতি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ-সিপিডি বাজেটকে বাস্তবতা বিবর্জিত উল্লেখ করে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, বিশাল বাজেটের ব্যয় সংস্থানের সুনির্দষ্ট কোন রূপরেখা নেই। এতে বাজেট বাস্তবায়নের বিষয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তায় ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। যা মোট বাজেটের ১৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ। মোট  দেশজ উৎপাদনের ৩ দশমিক ০১ শতাংশ বরাদ্দ হয়েছে এ খাতে। চলতি সংশোধিত বাজেটে এ খাতে ৮১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। যদিও মূল বাজেটে এর পরিমান আরও কম ছিল।

ভিন্ন এক পরিস্থিতিতে পেশ করা বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী শুরুতেই করোনা সংকটে বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে দেয়া বাজেট সামনের সঙ্কট উত্তরণে সহায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। করোনা ভাইরাসে বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে দেশের স্বাস্থ্য খাতের যে বেহাল চিত্র ফুটে উঠেছে তা সামাল দেয়ার বড় কোন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেই প্রস্তুাবিত বাজেটে। অনেকটা গতানুগতি ধারায় কেবল অর্থ বরাদ্দ বেড়েছে কিছুটা। এই বাজেটের আকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তা বাড়ানো হয়েছে। তবে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১০ হাজার কোটি টাকার একটি থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে বাজেটে।

বৃহস্পতিবার বিকালে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের এই বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। তার আগে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর ওই প্রস্তাবে সই করেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ। আগের বছর বাজেট উপস্থাপনকালে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ছিল। অর্থমন্ত্রী নিজেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। শারিরিক অসুস্থতা নিয়ে বাজেট বক্তৃতা আংশিক উপস্থাপনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাকিটা সংসদে উপস্থাপন করেন। এটি ছিল একটি বিরল ঘটনা। এবারও বাজেট পেশের সময়ে দেশে করোনা ভাইরাসের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব রয়েছে। পরিস্থিতির কারণে বিশেষ নিরাপত্তায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাজেট অধিবেশন। সংসদে শারীরিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বজায় রেখে সদস্যরা অংশ নেন। বয়স্ক ও অসুস্থ অনেক সদস্য বাজেট অধিবেশনে অংশ নেননি। বাজেটের ওপর আলোচনায়ও তাদের অনেকে অংশ নিতে পারবেন না।

প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৩ কোটি টাকা। চলতি সংশোধিত বাজেটে যার আকার ২ লাখ ২ হাজার টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। এবার পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৮০ কোটি টাকা।
এর মধ্যে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় হবে ৬৫ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব খাতে আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর হিসেবে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আদায় করা যাবে বলে আশা করছেন অর্থমন্ত্রী। বিদায়ী বাজেটের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি কর আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে, এক লাখ ২৫ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রিত কর থেকে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজস্ব বোর্ড বর্হিভুত ১৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে নতুন বাজেটে। কর ছাড়া রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বৈদেশিক অনুদান থেকে ৪ হাজার ১৩ কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে বাজেট প্রস্তাবে আশা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটে আয় ও ব্যয়ের হিসাবে সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। যা বিদায়ী বাজেটে ছিল এক লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫.৮ শতাংশ। চলতি অর্থ বছরের সংশোধিত বাজেটে যা ছিল ৫.৩ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে অর্থ সংস্থানের লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে বিদেশ থেকে ৭৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ খাত থেকে এক লাখ ৯হাজার কোটি টাকা ঋণ করে ওই ঘাটতি মেটানোর প্রস্তাবনা রয়েছে বাজেটে। বাজেটে এবারও কালো টাকা সাদা করার বড় সুযোগ রাখা হয়েছে।

নতুন বাজেটে রাজস্ব আয় বাড়াতে বিলাস দ্রব্যসহ বেশকিছু পণ্যে শুল্ক ও কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেটের পর এসব পণ্যের দাম বাড়বে।

একই সঙ্গে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী ও ওষুধ সামগ্রীতে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) অব্যাহতিসহ শুল্ক ও করভার কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সামনে এসব পণ্যের দাম কমতে পারে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তথ্য-প্রযুক্তি খাতের লোডেড পিসিবি, আনলোডেড পিসিবি এবং রাউটারের ওপর পাঁচ শতাংশ মূসক আরোপ করা হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে। আসবাবপত্রের বিপণন  কেন্দ্রের ওপর মূসক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করায় সেখানে বিক্রিত পণ্যের দাম বাড়তে পারে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লঞ্চ সার্ভিসের মূসক দ্বিগুণ করে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে বাড়তে পারে শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত লঞ্চের ভাড়া। কার ও এসইউভির নিবন্ধনসহ বিআরটিএর অন্যান্য মাশুলের ওপর সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করায় গাড়ি নিবন্ধনের খরচ বাড়বে। চার্টাড বিমান ও হেলিকপ্টার ভাড়ার ওপর সম্পূরক শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৩০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সব প্রসাধন সামগ্রীর ওপর সম্পূরক শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করায় এসব পণ্যের দাম বাড়বে। মোবাইল সিম বা রিম কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে  সেবার বিপরীতে সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে বাজেটে। সিরামিকের সিংক, বেসিন ইত্যাদি পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাবে এসব পণ্যেরও দাম বাড়বে। সিগারেটের চারটি স্তরের মধ্যে তিনটি স্তরের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। আমদানি শুল্ক বসানোয় বাড়তে পারে পিয়াজ লবনের দাম। বাজেটে শুল্ক ও কর ছাড় দেয়ায় কমতে পারে বেশ কিছু পণ্যের। এর মধ্যে আছে আইসিইউ যন্ত্রপাতি, করোনাভাইরাস শনাক্তের কীট, মাস্ক, কৃষি যন্ত্রপাতি, সোলার প্যানেল, সয়াবিন তেল, দেশীয় পোশাক, এলজিপি গ্যাস সিলিন্ডার, দেশে উৎপাদিত  মোবাইল ফোন, এসি, রেফ্রিজারেটর, মোটর সাইকেল।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতার সমাপনীতে করোনা ভাইরাস মোকাবিলার যুদ্ধে জয়ী হওয়ার আশা প্রকাশ করে বলেন, যে অমানিশার ঘোর অন্ধকার আমাদের চারপাশে ঘিরে ধরেছে তা একদিন কেটে যাবেই। অর্থমন্ত্রী সুরা বাকারার একটি আয়াত উদ্বৃত করে তার বাজেট বক্তৃতা শেষ করেন। সূত্র : ম. জমিন