(দিনাজপুর২৪.কম) ‘দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসে পূর্বপ্রস্তুতি টেকসই উন্নয়নে আনবে গতি’ স্লোগানে আগামীকাল উদ্যাপিত হতে যাচ্ছে জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস-২০২০।

দিবসটিকে অর্থবহ করতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর এ বছরে দেশের গৃহ ও ভূমিহীন ৬ লাখ ৮ হাজার পরিবারকে একটি করে পাকাবাড়ি নির্মাণ করে দেবে সরকার।

প্রতিটি বাড়ির সম্ভাব্য নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছে ৪ লাখ টাকা। সে হিসাবে এ কর্মসূচিতে মোট ব্যয় হবে ২৪ হাজার ৩২০ কোটি টাকা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প, ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ সহনীয় বাড়ি প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের নিয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।

শনিবার আওয়ামী লীগ আয়োজিত ঐতিহাসিক ৭ মার্চের আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মুজিববর্ষে বাংলাদেশের কোনো মানুষ ভূমিহীন-গৃহহীন থাকবে না। আমরা মুজিববর্ষ উদ্যাপনে অনেক কর্মসূচির চিন্তা করছি।

জাতির পিতা বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ যেন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান পায়। তার স্বপ্ন ছিল একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না। এ জন্য তিনি গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। এখনও আমাদের দেশে নদীভাঙনে মানুষ গৃহহারা হয়।

দেশে কিছু মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়, যারা ভূমিহীন ও গৃহহীন। আমি চাই, মুজিববর্ষের ভেতরেই গৃহহীনদের ঘর করে দেব। বাংলাদেশের একটা মানুষও গৃহহীন থাকবে না।

২০১৮ সালের জুলাই মাসে সরকার জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনে ২০২০-২১ সালকে ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করে। জাতির পিতার জন্মতারিখ অর্থাৎ ১৭ মার্চ থেকে শুরু হয়ে ২০২১ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত চলবে মুজিববর্ষের কর্মকাণ্ড।

জানা যায়, গত ২ মার্চ মন্ত্রিসভার অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনে কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে মুজিববর্ষের কর্মসূচি গ্রহণের নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি ‘অহেতুক’ নতুন কর্মসূচি না নিয়ে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে নিজেদের বাজেট থেকে মানুষের কল্যাণ ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে এমন কর্মসূচি নেয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।

এরপরই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয় হতদরিদ্রদের জন্য দুর্যোগ সহনীয় বাড়ি দেয়ার প্রকল্পটি মুজিববর্ষ উপলক্ষে কর্মসূচি হিসেবে ঘোষণা দেয়া যেতে পারে। তাদের লক্ষ্য ছিল প্রতিটি গ্রামের একজন করে মোট ৬৮ হাজার ৩৮টি পাকাবাড়ি নির্মাণ করে দেয়া।

দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবটি বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আশ্রয়ণ প্রকল্প ও গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের কর্মকর্তাদের নিয়ে ৩ মার্চ একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করে এটি চূড়ান্ত করে।

সেখানে জানানো হয়, দেশে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৫১৪টি গৃহহীন পরিবার রয়েছে। এ ছাড়া ২ লাখ ২৬ হাজার ভূমিহীন পরিবার রয়েছে।

এই ৬ লাখ ৮ হাজার ৫১৪টি পরিবারকেই পাকাবাড়ি করে দেয়া হবে। এটিই মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার। প্রতিটি ঘরের নির্মাণ ব্যয় ৪ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।

এক তলাবিশিষ্ট দুই বেডের এই পাকা বাড়িতে থাকবে ড্রয়িংরুম, বারান্দা, টয়লেট, কিচেনসহ একটি পরিবারের বসবাসের উপযোগী বাসগৃহ।

আপাতত এ প্রকল্পে দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের টিআর-কাবিখা কর্মসূচির সোলার প্যানেল ও বায়োগ্যাস বাবদ ৫০ শতাংশ খরচ স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ওই বৈঠকের পর ৪ মার্চ আবার বৈঠকে বসে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. শাহ কামালের সভাপতিত্বে বৈঠকে বলা হয়- আগামী এক বছরের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।

চলতি অর্থবছরে এ খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেই চলবে। বাকি টাকা পর্যায়ক্রমে সংস্থান করা হবে। বৈঠকে ৫টি সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ১২ মার্চের মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছ থেকে গৃহহীনদের তালিকা সংগ্রহ করতে হবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের (স্কাউট, গার্লস গাইড, সিপিপির স্বেচ্ছাসেবক) সহায়তা তালিকা যাচাই করে প্রেরণ করবেন।

গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত ঘোষণা বা ক্রোড়পত্র দিতে হবে। বাসগৃহ নির্মাণে নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে হবে। কর্মসূচির নকশা, এস্টিমেট ও ডিজাইন করার জন্য আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প, গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের প্রকৌশলীদের নিয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করতে হবে।

এরপরই বিষয়টির চূড়ান্ত সম্মতি দিয়ে শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে ঘোষণা দেন।

এ প্রসঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা এবার সারা দেশের ৬ লাখ সাড়ে ৮ হাজার গৃহ ও ভূমিহীন পরিবারকে পূর্ণাঙ্গ পাকাবাড়ি নির্মাণ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

এ জন্য সুবিধাভোগীকে কোনো ধরনের টাকা-পয়সা খরচ করতে হবে না। তার কাজ শুধু সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে গিয়ে নিজের অবস্থা তুলে ধরে নাম নিবন্ধন করে আসবেন। বাকি দায়িত্ব সরকারের। ঘর বানানোর সব খরচ দেবে সরকার।

গৃহহীনদের ঘর দেয়ার বিষয়ে দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. শাহ কামাল বলেন, আমাদের প্রথমে টার্গেট ছিল প্রতিটি গ্রামে একজন করে হতদরিদ্রকে ৬৮ হাজার ৩৮টি পাকাবাড়ি নির্মাণ করে দেয়া।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে আমরা সেই কর্মসূচিকে কয়েকগুণ বড় করে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বরাদ্দের নিজস্ব অর্থ, টিআর-কাবিখা কর্মসূচির সোলার প্যানেল ও বায়োগ্যাসের ৫০ শতাংশ বরাদ্দ ইতিমধ্যে এ কর্মসূচিতে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষভাবে সুবিধাভোগী নির্বাচন করতে সংশ্লিষ্টদের ইতিমধ্যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

সচিব আরও বলেন, জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস উপলক্ষে সোমবার (আজ) দেশের সব মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির মহড়া অনুষ্ঠিত হবে।

এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগ, এনজিওবিষয়ক ব্যুরো এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরকে চিঠি দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবসের কর্মসূচি জানাতে আজ মন্ত্রণালয় সংবাদ সম্মেলন করবে বলে জানান তিনি।-ডেস্ক