(দিনাজপুর২৪.কম) পেঁয়াজ ও চালসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছেই। সাধারণ মানুষের ওপর চেপে বসেছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বোঝা। জীবন ধারণের উপযোগী প্রতিটি জিনিসের অগ্নিমূল্য। চাল, ডাল, পেঁয়াজ, মাছ, মাংস, তেল, তরিতরকারি, ফলমূল, চিনি আর লবণসহ সবকিছুই আগের তুলনায় দাম কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে চাকরিজীবী আর খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। অতিরিক্ত মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের জন্যই সাধারণ মানুষকে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে সাধারণ মানুষের ধারণা।
শুধু চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার দুই দফায় কমিয়েছে আমদানি শুল্ককর। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ফলে শুল্ক কমের সুফল মিলছে না ভোক্তাপর্যায়ে। প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে চালের দাম। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব অনুযায়ী এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে দুর্ভোগ বেড়েছে নিম্নআয়ের মানুষের। মূলত চালের দাম যেন পাগলা ঘোড়ার মতো লাগামহীন হয়ে গেছে। একইভাবে অস্বাভাবিক পেঁয়াজের দাম। এককেজি দেশি পেঁয়াজের দাম ১৩০ টাকা। এই টাকা দিয়ে একটি মুরগি পাওয়া যাচ্ছে। পেঁয়াজের আকাশচুম্বি দামে অনেকেই পেঁয়াজ ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। এদিকে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে খুচরা বিক্রেতারা পাইকার আর আড়তদারদের দুষলেও তারা তা মানতে নারাজ। আর বাজার মনিটরিং না থাকার কারণে তা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে মনে করছেন ভোক্তারা।
হায়দার আলী নামের এক ক্রেতা বলেন, প্রতিদিনই চালসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলছে। মোটা এক কেজি চালের দাম ৪৮ থেকে ৫০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। হঠাৎ এমন দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ জনগণ বিপাকে পড়েছেন বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে কাওরানবাজারের এক পাইকার বলেন, ধানের সংকটে বাজারে চাল কম আসছে। তারা যা পাচ্ছে তা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।
এদিকে মিল মালিকরা বলছেন, বোরো ধানের জোগান ভালো না। এ অবস্থায় ধান সংকটে রয়েছে বেশিরভাগ মিল। এই সংকটের কারণে মিল পর্যায়েও দাম কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন কয়েকগুণ। ফলে ভোক্তাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বাদামতলী এলাকার আড়তদাররা জানান, বাজার এখন অটোরাইস মিলারদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তারা যে দাম বেঁধে দিচ্ছেন, সে দামেই চাল বিক্রি করতে হচ্ছে।
রাজধানীসহ সারাদেশে চালের দামে অস্বস্থির সাথে সাথে সবজির দামও চড়া। স্বস্তি নেই অন্যান্য নিত্যপণ্যের বেলাতেও। নানা অজুহাতে এসব পণ্যের দাম বাড়ছে। কোনো কোনো পণ্যে অস্বাভাবিক মুনাফা করছেন ব্যবসায়ীরা। রাজধানীর বাজারে ৪০ থেকে ৪৫ টাকার নিচে মিলছে না তেমন কোনো সবজি। তবে শীতকালীন কিছু সবজির দাম তুলনামূলক কম রয়েছে।
কাওরান বাজারের সবজি বিক্রেতারা বলেছে, ঢাকার বাইরের বিভিন্ন আড়ত ও মোকাম থেকে সবজির সরবরাহ কমে গেছে। ওইসব অঞ্চলেও বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের সবজি। এর প্রভাবে রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলোয় প্রায় সব ধরনের সবজির দামই বেড়েছে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখির কারণেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে বলে মনে করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তিনি গত মে মাসে বলেছিলেন, এসব লেখালেখি বাদ দিলেই দ্রব্যমূল্য আর বাড়বে না।

মূল্যবৃদ্ধির কারণ
অনুসন্ধানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার বেশকিছু কারণ বেরিয়ে এসেছে। গ্রণযোগ্য অনেক কারণের পাশাপাশি অগ্রহণযোগ্য অনেক কারণও মিলেছে। এমন কিছু কারণে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে যা চাইলে সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলো হচ্ছেÑ চাহিদা ও যোগানের মধ্যে অসমতা, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, মজুদদারি ও অতি মুনাফা, বাজারে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কম থাকা বা কোথাও কোথাও একেবারে না থাকা। আবার হঠাৎ করে চাহিদা বৃদ্ধি পেলেও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে পারে। সম্প্রতি ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট ও পরিবেশক প্রথার জটিলতাও মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কাজ করছে বলে জানা গেছে।

চাহিদা ও যোগানের ব্যবধান
বিভিন্নভাবে একটি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ হয়ে থাকে। যে সকল কারণে এই মূল্য নির্ধারিত হয় তার একটি অন্যতম উপাদান হলো পণ্যটির চাহিদা ও যোগানের সমতা আছে কিনা তার ওপর। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় না। যদি চাহিদা ও যোগানের মধ্যে সমতা থাকে তবে মূল্য সহনীয় পর্যায়ে থাকে। যদি তা না থাকে তাহলেই পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ উৎপাদনে চাহিদা ও যোগানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই অসমতা বিদ্যমান রয়েছে। আমাদের দেশে প্রধানত বেশি উৎপন্ন হয় চাল। এটাই স্বাভাবিক, কারণ ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য। কিন্তু অন্যান্য খাদ্যশস্য উৎপাদনে তেমন আগ্রহ দেখা যায় না। যেমন দেশে যে সয়াবিন উৎপন্ন হয় চাহিদার তুলনায় তার পরিমাণ খুবই সামান্য। এর পুরোটাই আমদানি করতে হয়। তারপর চিনি আমাদের চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ উৎপন্ন হয়। অবশিষ্ট ৮০ শতাংশ বিদেশ থেকেই আমদানি করতে হয়। ডাল আমরা আমাদের চাহিদার ৩০ ভাগের বেশি উৎপাদন করতে পারি না। ৭০ ভাগ আমদানি করতে হয়। পেঁয়াজেও রয়েছে ঘাটতি। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ আমাদের আমদানি করতে হয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে আমাদের প্রধান খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে একমাত্র চাল ছাড়া আর সবই আমদানি করতে হয়। সম্প্রতি সেই চালও আমদানি করতে হচ্ছে। একারণেই রয়েছে চাহিদা আর যোগানের বিপুল ব্যবধান। এটাই পণ্যমূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

আমদানি নির্ভরতা
চাহিদার তুলনায় কম উৎপাদনের কারণে বিপুল পরিমাণ পণ্যদ্রব্য আমাদের আমদানি করতে হয়। অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা পণ্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। যেমন আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি হলে জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি প্রভৃতি এর যে কোনো একটির মূল্যবৃদ্ধি পেলে আমদানি খরচও বেড়ে যায়। ফলে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ঘটে।

সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ
৯০ সালের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সরকার একটি নির্দেশ জারি করে যে, ৫০ শতাংশ এলসি মার্জিন দিয়ে পণ্য আমদানি করতে হবে। যাদের ক্ষমতা ছিল তারা শর্ত মেনে পণ্য আমদানি করতে থাকে। কিন্তু এ সময় অনেক ছোটো ব্যবসায়ীরই এই ক্ষমতা ছিল না। ফলে তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বাজার থেকে বিতাড়িত হলো। তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাজারের চাহিদা ও যোগানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এজন্য বাজার কিছু ব্যবসায়ীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

মূল্যবৃদ্ধির আরো কারণ
আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়া, মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টি, জ্বালানি তেল ও সিএনজির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা ইত্যাতি। এভাবে নানা অযুহাতে বেড়েই চলেছে চাল, ডাল, তেল, চিনি, মাছ, মাংস, ডিম ও সবজিসহ নানা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দ্রব্যের দাম। বিক্রেতারাও ইচ্ছা মাফিক জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি করে চলেছে। আর এই দাম বৃদ্ধির জন্য চলছে একে অপরকে দোষারোপের পালা। খুচরা ব্যবসায়ী, পাইকারি ব্যবসায়ী, হোলসেলাররা, মিলমালিক ও আমদানিকারকরা, একে অপরকে দায়ী করে চলছে প্রতিনিয়ত। -ডেস্ক