(দিনাজপুর২৪.কম) আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং তদারকিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই)। তারা বলছে, এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত না করা গেলে বিশাল আকারের এই বাজেট বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে। দেশের ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিচার দাবি করেছে সংগঠনটি। গতকাল এফবিসিসিআই কার্যালয়ে বাজেট প্রতিক্রিয়ায় এ কথা বলেন ব্যবসায়ী নেতারা। একইসঙ্গে রাজস্ব আদায়ে এনবিআরের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা।  সংগঠনের সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যে গতিতে বাড়ছে, রাজস্ব আয় যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই হারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়নি। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানোরও দাবি জানান তিনি। বাজেট প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ব্যবসায়ী নেতারা ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা নিয়েও কথা বলেন।
এফবিসিসিআই সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ব্যাংকিং খাত নিয়ে সমালোচনা শোনা যাচ্ছে। মুষ্টিমেয় কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে ব্যাংকিং খাতে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে, যা আমাদের পলিসির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন বজায় রাখতে বিষয়টি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বেসিক ব্যাংক ও ফারমার্স ব্যাংকের অব্যবস্থাপনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংকের টাকা খেয়েছে, আমরা তাদের শাস্তি চাই। একইসঙ্গে তাদের জন্য যেসব ব্যবসায়ী হোঁচট খেয়েছেন তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বলেন, ব্যাংকের কাছে জনগণের আমানতের পয়সা থাকে। সেই পয়সা যারা মেরে খায় তাদের অবশ্যই বিচার করতে হবে।
লিখিত বক্তব্যে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, বাজেট বাস্তবায়নে অর্থায়ন ও অর্থব্যয় সঠিকভাবে করতে না পারায় প্রতি বছরই বাজেট সংশোধন করতে হয়। বাজেট বাস্তবায়নে বছরের শুরু থেকেই সুষ্ঠু মনিটরিং জোরদার করা জরুরি। এক্ষেত্রে দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং তদারকের মান নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে।
তিনি বলেন, নতুন বাজেটে ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা যা জিডিপির ৪.৯ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য সরকারের ব্যাংক খাত থেকে ঋণ হবে। অভ্যন্তরীণ ঋণ ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ২১ হাজার ২৪২ কোটি টাকা (ব্যাংক ব্যবস্থা ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা এবং জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্প থেকে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা) নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরশীলতা উৎপাদনশীল খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বেসরকারি খাতে ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে যাতে প্রতিবন্ধকতা বা বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, উচ্চ সুদের হারের কারণে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে।

এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা যা গত বছরের চেয়ে ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা অর্থ্যাৎ ১৯.৩৪ শতাংশ বেশি। রাজস্ব আদায়ের এই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য অনেক ক্ষেত্রে করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা হয় এবং আইন-কানুনের অপপ্রয়োগ ও কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছা ক্ষমতার কারণে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা হয়ে থাকে। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যে গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং রাজস্ব আয় যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই হারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়নি। বর্তমানে মোট নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা ৩৫ লাখেরও বেশি উল্লেখ করে শফিউল ইসলাম বলেন সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ৫ বছরের মধ্যে রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা ৮০ লাখে উন্নীত করতে হলে দক্ষ এবং অভিজ্ঞ কর প্রশাসন ব্যতীত বেশ কঠিন। তাই কর প্রশাসনকে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অটোমেশনসহ সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে অধিক নজর দেয়ার প্রয়োজন।

প্রস্তাবিত বাজেটে পোশাক শিল্পের কর্পোরেট করের হার ১২ থেকে ৩ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ এবং গ্রীণ কারখানার জন্য ১০ থেকে বাড়িয়ে ১২ শতাংশ যা বর্তমানে ১০ শতাংশ সমালোচনা করা হয়। বলা হয়, এতে পোশাক শিল্পে পুনঃবিনিয়োগের অর্থের জোগানে স্বল্পতা সৃষ্টি হবে যা এ শিল্পের বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। পোশাক শিল্পের উৎপাদন সংশ্লিষ্ট পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি চালু আছে, কিন্তু অন্যান্য খরচের ক্ষেত্রে যেমন ল্যাবরেটরি টেস্টিং চার্জ, গাড়ি বা যন্ত্রাংশ মেরামত, পেশাগত ব্যয়, স্টেশনারি ব্যয়, মালামাল লোডিং-আনলোডিং ও শ্রমিকদের যাতায়াত ব্যবহৃত পরিবহন ব্যয়, ক্লিনিং এন্ড সেনিটেশন, প্রভূতি ব্যয়সমূহে মূসক অন্তর্ভুক্ত থাকায় পণ্য রপ্তানি ব্যয় প্রচুর পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে এসব খাতসমূহে মূসক প্রত্যাহার এবং রিটার্ন দাখিল করা থেকে অব্যাহতি দেয়ার প্রস্তাব করেন এফবিসিসিআই সভাপতি।

শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন আরো বলেন, অ্যাপসভিত্তিক পরিবহনের রাইড শেয়ারিং সেবার (উবার, পাঠাও ইত্যাদি) ওপর ৫ শতাংশ মূসক আরোপ করা হয়েছে। বর্তমান যানজটে দ্রুত যাতায়াতের জন্য এ ধরনের সেবার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গণপরিবহন বিশেষ করে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল প্রভৃতি মেগা প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নের পূর্ব পর্যন্ত অ্যাপসভিত্তিক পরিবহনের রাইড শেয়ারিং সেবাকে মূসকের আওতামুক্ত রাখার প্রস্তাব করেন। এফবিসিসিআই সভাপতি করদাতাদের হয়রানি এড়াতে কর কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছা ক্ষমতা হ্রাস করার কথাও বলেন। সামনে নির্বাচন, একটি বড় দলের প্রধান জেলে। এই দেশে অস্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, সেক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের ভূমিকা কি হবে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে শফিউল ইসলাম বলেন, খালেদা জিয়ার বিষয়টি বিচারিক বিষয়। বলেন, অতীতে জ্বালাও পোড়াও ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ হয়েছে।

এতে ব্যবসায়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছিল। বিএনপির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এবার তারাও এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি দিচ্ছে না। আশা করা যায়, এই ধারা অব্যাহত রাখবে। এতে এবার ব্যবসায়ে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- এফবিসিসিআই সিনিয়র সহ-সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম, সহ-সভাপতি মো. মুনতাকিম আশরাফ, সংগঠনের পরিচালকবৃন্দ ও সদস্য সংস্থার প্রতিনিধিরা। -ডেস্ক