(দিনাজপুর২৪.কম) “হে নতুন এসাে তুমি- সম্পূর্ণ গগণ পূর্ণ করে, ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে, ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা, পুড়িয়ে ফেলে বাজুক, প্রাণে প্রাণে মঙ্গল বারতা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর সৃষ্টি ‘এসাে হে বৈশাখ এসাে এসাে, তাপস নিঃশ্বাস বায়ে, মুমুষুরে দাও উড়ায়ে, বছরের আবর্জনা, দূর হয়ে যাক যাক, এসাে এসাে’। কবিগুরুর সাথে সুর মিলিয়ে বিশ্বের সকল বাঙালি আজ স্বাগত জানাবে শুভ বাংলা বর্ষ ‘১৪২৫’কে। আজ বাংলা বছরের প্রথমদিনে নানা আয়ােজনে বিশ্ববাঙালি উদ্যাপন করবে বর্ষবরণের বর্ণাঢ্য উৎসব, বাঙালি জীবনের প্রাণের উৎসব, বাঙালি সংস্কৃতিতে স্নাত হওয়ার উৎসব। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ সকল শ্রেণি-পেশার সব বয়সি মানুষের মনের গভীরে দারুণভাবে রেখাপাত করে আজকের এ দিনটি। শুধু বাঙালিই নয়, বাংলা ভাষাভাষী আদিবাসী ও নৃ-জনগােষ্ঠী, | ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের জীবন জগতের। স্বপ্নময় নতুন বছরের শুভযাত্রা সুচিত হয় এ বৈশাখে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের ভাষায়- “নতুনের কেতন ওড়ে এ বৈশাখে, তাই তিনি সবাইকে নতুনের জয়ধ্বনি করার আহ্বান জানান। বৈশাখের এ প্রথম দিবসটি আবহমানকাল থেকেই বাঙালির সত্তায়, চেতনায় ও অনুভবের জগতে এক গভীরতর মধুর সম্পর্ক নিয়ে বিরাজ করছে। পহেলা বৈশাখ পুরনাে জীর্ণকে ঝেড়ে ফেলে বাঙালিদের যাপিত জীবনে নতুন সম্ভাবনা আর নতুন প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলতেই শুধু নয়, সকল ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে একাকার হওয়ার প্রেরণা জোগায়।প্রথম পৃষ্ঠার পর তাই পহেলা বৈশাখই হচ্ছে বাঙালিজীবনের সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক, সবানি ও আবহমান উৎসব। বাংলা ও বাঙালির লােক সংস্কৃতির মূল বিষয়টি হলাে- “উৎসবের মধ্য দিয়ে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। এ উৎসবের মধ্য দিয়েই প্রকাশ ঘটে, বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, গৌরব আর সংস্কৃতির। বাঙালির চৈত্র সংক্রান্তির ইতিহাস প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরনাে হলেও বাংলা সন বা পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের ইতিহাস বেশি প্রাচীন নয়। মােগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে কুম্বকের ফসল কাটার মৌসুমে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্যে বাংলা সনের প্রবর্তন হয়। তিনি তৎকালীন বাংলার কৃষক সমাজের ফসল ঘরে তোলার সময়টাকেই গুরুত্ব দিয়ে হিজরি সন এবং শব্দের সঙ্গে সৌর সন তথা খ্রিস্টাব্দের সমন্বয় করে বঙ্গাব্দের প্রবর্তন করেন। ওই সময় আজকের এ বাংলা সনকে বলা হতাে ফসলি সন। এতে মােগল সম্রাটদের খাজনা আদায়ের সুবিধার পাশাপাশি বাঙালি জাতি পেয়ে যায় নিজস্ব বাংলা বর্ষপঞ্জি। পরবর্তী সময়ে ঢন্দুমাস অনুযায়ী হিজরি সন বা প্রেগরিয়ান ক্যালোর অনুযায়ী ইংরেজি সনসহ নানা হিসাব-নিকাশ করে ৪৬১ বছর যাবৎ ইংরেজি বর্ষের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের ধারা সূচিত হয়। বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনে পাকিস্তান আমলে বাঙালির এ প্রাণের উৎসবে রবীন্দ্রসঙ্গীতচর্চাকে হিন্দুয়ানি ও মুসলিম বিদ্বেষী বলে প্রচার চালিয়ে ছিলাে। এমনকি বেতার-টেলিভিশন ও সকল অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়। সে সময় শুধু ঘরোয়া অনুষ্ঠান ছাড়া আর কোথাও রবীন্দ্রনাথের গান শােনা যেতাে না। সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার এমনই এক শোচনীয় ও কঠিন মুহূর্তে সে সময়কার সাহসী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওয়াহিদুল হক ও সানজিদা খাতুনের নেতৃত্বে কয়েকনি সাংস্কৃতিককর্মী মিলে ইংরেজি ১৯৬৭, বাংলা ১৩৭৪ সনের পহেলা বৈশাখ ঢাকার রমনা বটমূলে প্রথম ছায়ানটের বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়ােজন করেন। পাকিস্তানি সামরিক শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ছায়ানট সেই যে শুরু করেছিলাে পহেলা বৈশাখে সূর্যোদয়ের আগমনী সঙ্গীত“এসাে হে বৈশাখ এসাে এসাে” তা৫১ বছর ধরে আজও বহমান। রাজধানীতে পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের গানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহবান। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে রমনার বটুমালে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগত =ানান। আজ দেশ-মা ও মাটির গন্ধে পহেলা বৈশাখ আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি অন্যতম স্তম্ভ। এ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই আমাদের শুধু ঐক্যবদ্ধই করে নাবিশ্বে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মানুষকে কাছে রাখার সেতুবন্ধ হয়ে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে আসন করে নিয়েছে এদিনটি। বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান এখন ফুলে-ফলে, পত্র-পল্লবে বিকশিত হয়ে রাজধানীকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলার গ্রামগঞ্জ পেরিয়ে বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে বাঙালিপ্রাণের সর্বজনীন এ বৈশাখী উৎসব। বর্ষবরণ উৎসবের প্রধান আকর্ষণ, বর্ণাঢ্য “মঙ্গল শোভাযাত্রা” এখন বাংলার প্রতিপ্রান্তরে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এখানেও নানা পােশাকে, বিভিন্ন ধরনের বাঙালি কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি বৈশাখী মেলা, বিভিন্ন রকম খেলাধুলা, বই মেলা, ঘােড়দৌড় এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পান্তা ইলিশসহ বিভিন্ন ধরনের মুখরােচক খাবারের আনন্দে মেতে ওঠে পুরাে বাঙালি জাতি। এ দিনের আরেকটি পুরনাে সংস্কৃতি হলাে গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযােগিতা। এর মধ্যে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তি একসময় প্রচলিত ছিল। বাংলাদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি হয় চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে ১২ বৈশাখ, যা জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিত। এমনিকরেই হাজার বছরের বাঙালির বৈশাখী উৎসব চলছে এবং অনন্তকাল। -ডেস্ক