(দিনাজপুর২৪.কম) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ ও দার্শনিক কবি কাজী নজরুল ইসলাম ভারত ও বাংলাদেশ দুই দেশেরই সম্পদ। ‘ বাংলা ভাগ হয়েছে কিন্তু নজরুল-রবীন্দ্রনাথ ভাগ হননি, তারা আমাদের সবার। মানুষের কল্যাণের জন্য কবি নজরুল নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। লেখার কারণে জেল খেটেছেন। আমারাও আমাদের অধিকার আদায় করতে অনেক সংগ্রাম করেছি, মুক্তিযুদ্ধ করেছি, অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি আমাদের চেতনায় ছিলেন। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও অনেক প্রতিকূলতা অতিক্রম করতে হয়েছে। জীবনের অনেক সময় জেলে কাটিয়েছেন তিনি। কবি নজরুল ও বঙ্গবন্ধুর মধ্যে চেতনার মিল ছিল।’

শনিবার (২৬ মে) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের আসানসোল শহরে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তন বক্তব্যে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট অব লিটারেচার (ডি-লিট) ডিগ্রি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

কাজী নজরুল ইসলামের জীবনদর্শনের প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাস করতেন। একদিকে যেমন ইসলাম ধর্মের হামদ-নাত রচনা করে সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামের বক্তব্যকে পৌঁছে দিয়েছেন। তেমনি শ্যামা সংগীত রচনা করে হিন্দু ধর্মকেও আপামর জনতার দোরগোড়ায় নিয়ে গেছেন। এমন প্রতিভা বিরল।’

এসময় কবি কাজী নজরুল আসলাম ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘কবি যদিও চুরুলিয়াতে জন্মগ্রহণ করেছেন, কিন্তু আমাদের বাংলাদেশেও অনেক জায়গায় গিয়েছেন তিনি। ময়মনসিংহে গিয়েছেন, সেখানে আমরা তার নামে বিশ্ববিদ্যালয় করেছি। কুমিল্লায় গিয়েছেন, সেখানেও আমরা তার নামে গবেষণা প্রতিষ্ঠান করেছি। বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে জানা যায়, কবির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দেখা হয়েছিল ফরিদপুরের জেলে। এটাও তাদের একধরনের আত্মিক টান। কবির প্রতি মুগ্ধতার কারণেই তাকে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে নিয়ে গিয়েছেন, জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়েছে তাকে। কবি নজরুলের ‘চল চল চল’ গানটি আমরা রণ সংগীত হিসেবে নিয়েছি।’

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার জনপ্রিয় ‘‘জয় বাংলা’’ শ্লোগানটি নজরুল ইসলামের কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ‘‘জয় বাংলা’’ শ্লোগান কবি নজরুল ইসলামের কবিতার লাইন থেকে গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ‘‘বাংলা বাঙালির হোক, বাংলার জয় হোক, জয় বাংলা’’ এই লাইন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বঙ্গবন্ধু ‘‘জয় বাংলা’’ শ্লোগানটি সবার কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। একদিকে যেমন বাংলা সাহিত্যের কবি নজরুল ইসলাম, তেমনি রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখায় ভারতীয়দের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ভারত সেসময় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। আমরা কৃতজ্ঞ। আশা করি আমাদের সুদৃঢ় সম্পর্ক আরো অনেক দূর এগিয়ে যাবে। ’

সমাবর্তনে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘জীবনের কর্মক্ষেত্রে নয় শুধু, সর্বক্ষেত্রে আপনারা মানবতাকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দেবেন। নজরুল সাম্যের গান গেয়েছেন। দেশকে ভালোবাসার অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। মানুষের মুক্তির জন্য তিনি জেল খেটেছেন।’ এসময় শিক্ষার্থীদের মানুষের জন্য কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের চেতনার প্রসারে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সাধন চক্রবর্তীসহ শিক্ষামন্ত্রী ও আয়োজকদের প্রত্যেকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি।

উপমহাদেশকে দারিদ্রমুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে এসময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বকে সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত করার জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’ এসময় বাংলাদেশ ভারত বন্ধুত্ব আরও দৃঢ় হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এর আগে, কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব লিটারেচার (ডি-লিট)’ ডিগ্রি গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তনে শনিবার বেলা ১২টা ২০মিনিটে শেখ হাসিনাকে সম্মানসূচক এই উপাধি দেওয়া হয়।

শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং গণতন্ত্র, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং আর্থ সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অসাধারণ ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এই উপাধি দেওয়া হয় বলে সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক সাধন চক্রবর্তী জানান।শেখ হাসিনা তাকে দেওয়া এ সম্মান ‘সমগ্র বাঙালি জাতিকে উৎসর্গ’করার ঘোষণা দেন।

রাজনৈতিক জীবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেকগুলো পুরস্কার ও সম্মননা পদক পেয়েছেন। এর কোনটি পেয়েছেন ব্যক্তিগত অর্জনের জন্য, আবার কোনটি পেয়েছেন সরকারপ্রধান হিসেবে বাংলাদেশের সামগ্রিক সাফল্যের জন্য। এর মধ্যে জাপানের ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্যের এবারেট ডান্ডি ও ব্রিজপোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতের বিশ্বভারতী, অস্ট্রেলিয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি।

শেখ হাসিনার যেসব পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- এজেন্ট অব চেঞ্জ পুরস্কার (২০১৬), প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন (২০১৬), চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ (২০১৫), আইসিটি টেকসই উন্নয়ন পদক (২০১৫), সাউথ-সাউথ ভিশনারি পুরস্কার (২০১৪), শান্তি বৃক্ষ (২০১৪), রোটারি শান্তি পুরস্কার (২০১৩), GAVI পুরস্কার (২০১২), সাউথ- সাউথ পুরস্কার (২০১১), ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার (২০১০), এমডিজি পদক (২০১৩ ও ২০১০), M K Gandhi পুরস্কার (১৯৯৮), CERES মেডেল (১৯৯৯), Pearl S. Buck পুরস্কার (২০০০), মাদার তেরেসা শান্তি পুরস্কার (১৯৯৮), ইউনেস্কো’র Felix Houphouet- Boigny শান্তি পুরস্কার (১৯৯৮) ইত্যাদি।

এসব অর্জনের পাশাপাশি শেখ হাসিনা নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বের কারণে বিভিন্ন স্বীকৃতিও অর্জন করে নিয়েছেন। এর মধ্যে বিশ্বখ্যাত ফোর্বস সাময়িকীর দৃষ্টিতে বিশ্বের ক্ষমতাধর একশ নারীর তালিকায় ৩৬তম স্থান পান শেখ হাসিনা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নিউ ইয়র্ক টাইমস সাময়িকীর জরিপে ২০১১ সালে বিশ্বের সেরা প্রভাবশালী নারী নেতাদের তালিকায় সপ্তম স্থান দখল করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। -ডেস্ক