(দিনাজপুর২৪.কম) টেনেটুনে ১৯০। আধুনিক ক্রিকেটে লক্ষ্য খুবই ছোট। তাই বলে ১০ উইকেটের হার! শুরু হয় টাইগারদের মুন্ডুপাত। অনেকে ব্যঙ্গ করে বলেছে নারীদের বিপক্ষে খেলতে! আবার কেউতো টেস্ট স্ট্যাটাস কেড়ে নেওয়ার পক্ষে। নানা সমালোচনায় ক্ষতবিক্ষত টাইগাররা। কিন্তু আহত বাঘ যে কতোটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তা পরদিনই টের পেয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। আড়াইশ রানের লক্ষ্য তাড়া করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অসিদের মাটিতে নামিয়ে এনেছিল বাংলাদেশ। আর সেই রূপকথার জয়ের রূপকার ছিলেন সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল। বাংলাদেশকে নিয়ে কটূক্তি ও সমালোচনার জবাব দিতেই জ্বলে উঠেছিল দেশের ইদিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যানের উইলো। খেলে ফেলেছিলেন শতরানের এক মহাকাব্যিক ইনিংস।
আজ এতদিন পর আবার সেই কার্ডিফ ফিরে এসেছে সামনে। ২০০৫ সালের পর সেই সোফিয়া গার্ডেনেই অস্তিত্বের পরীক্ষায় মাশরাফির দল। সেই অস্ট্রেলিয়া বধ কাব্য লেখা দলের টিকে থাকা একমাত্র সেনানী এখন সেনাপতি। আর কোন জেদে সেদিন ১০১ বলে ১০০ রানের ধ্বংসাত্মক ইনিংস খেলতে পেরেছিলেন সেটাই এই দূরে বসে আশরাফুলের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে। ঐতিহাসিক সেই ইনিংস নিয়ে কথা বলতে বলতে অতীতে পাড়ি জমান আশরাফুল, ‘ওই সিরিজে প্রথম ম্যাচে আমরা ১০ উইকেটে হেরেছি। এরপর অনেক সমালোচনা হয়েছিল। সবাই বলছিল বাংলাদেশের আসলে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার যোগ্যতা নেই। আরও নানা রকম কথা। আমাদের সবার উপরই একটা চাপ ছিল। আমার সেই ইনিংসটায় আমরা জয় পাই। এতে সবাই ঠাণ্ডা হয়েছিল। তখন বলছিল না বাংলাদেশকে আরও সুযোগ দেওয়া দরকার। আসলে ঐ সময়ে এ জয়টা আমাদের খুব প্রয়োজন ছিল।’
সেবার ন্যাটওয়েস্ট সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটিতে ১৬তম ওভারে উইকেটে এসেছিলেন আশরাফুল। প্রথম দুই ওভারে চার বল খেলেও কোনো রান নিতে পারেননি। তবে পরের ওভারে দুটি সিঙ্গেল। কিন্তু এর পর তিন ওভারেই একটি করে চার। পুল করেছেন, সুইপ খেলেছেন, দৃষ্টিনন্দন কাভার ড্রাইভ, সব কিছুতেই সফল। পারফেক্ট শট খেলতে পারায় প্রেশার কমে বেড়ে যায় আশারাফুলের আত্মবিশ্বাস। তখনই বুঝে নিয়েছিলেন, হয়তো দিনট তারই। হয়েছিলোও তাই। সেই ইনিংসেই ক্রিকেট মোড়লদের উপযুক্ত জবাব দিয়েছিল বাংলাদেশ।
‘মাঠে যখন গেলাম প্রথমেই কয়েকটা শট থেকে বেশ কিছু চার পেয়ে গিয়েছিলাম। পুল, সুইপ, কাভার ড্রাইভ যাই করেছি তাতেই চার পেয়েছি। এতে আরও আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল আজকের দিনটি আমার। আর যাই হোক উইকেট দেবনা। শেষ পর্যন্ত খেলার ইচ্ছে ছিল। দুর্ভাগ্যবশত তা হয়নি।’ তা না হলেও তরুণ টগবগে আশরাফুল তো নিজে অমরকীর্তি গড়ে দেশের একটি জয়কেই অমরত্ব দিতে পেরেছিলেন। এক যুগ পরেও যা মুখে মুখে ফেরে। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্য প্রেরণা হয়ে ফিরে আসে বারবার। যেমন ফিরেছে এই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও।
ক্যারিয়ারের অধিকাংশ সময় ততোটা ধারাবাহিক ছিলেন না আশরাফুল। এক ম্যাচ ভালো খেললে পরের ম্যাচেই খারাপ খেলতেন। নিজেও স্বীকার করছেন সে কথা। তবে জানতেন তিনি ভালো খেললেই জয় পায় বাংলাদেশ। তাই অসিদের বিপক্ষে ভালো কিছু করার তাগিদ অনুভব করেছিলেন সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান। সফলও হয়েছিলেন।
এমন দিনে স্মৃতি হাতড়ে ফেরা আশরাফুল বলে চলেন, ‘আসলে আমার ক্যারিয়ারে দেখলেই দেখবেন আমি কয়েকটা ম্যাচ খারাপ খেললে একটা ম্যাচ ভালো খেলতাম। কার্ডিফের ঐ ম্যাচের আগেও কয়েকটা ইনিংস আমার খুব খারাপ হয়েছিল। কিছু করে দেখানোর ইচ্ছা ছিল। আর আমি ভালো খেললে তখন বাংলাদেশ জিতত। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো। আমার ভাগ্য ভালো ছিল। আসলে ক্রিকেটে ভালো করতে হলে ভাগ্যটাও দরকার হয়।’ সাহসীর পক্ষে তো ভাগ্য থাকেই।
এক যুগ মোটেও কম সময় নয়। কিউইদের বিপক্ষে বাঁচা-মরার ম্যাচ শুক্রবার। তার আগে কার্ডিফের ঘাসে বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা খুঁজে ফিরছেন আশরাফুলের সেই অমর কীর্তির ছোঁয়া। ওটাই তো বড় প্রেরণা এখন। বাংলাদেশের ক্রিকেট যে মাঝের সময়টাতে আরো বহুদূর এগিয়েছে। আশরাফুলের ব্যাটে ভর করে সোফিয়া গার্ডেনে লেখা রূপকথা তাহলে এই সময়ের ক্রিকেট বীরেরা ফেরাতে পারবেন না কেন! জবাব মিলতে অপেক্ষা সামান্যই। -ডেস্ক