(দিনাজপুর২৪.কম) ক্রান্তিকাল শব্দটি সম্ভবত অতিব্যবহারে ক্লিশে হয়ে গেছে। যে কারণে পৃথিবী নামক গ্রহ যখন আজ সত্যিকার অর্থেই ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে তখন আমাদের শব্দভান্ডার ফুরিয়ে যাচ্ছে। দেশে দেশে এমন ভয়ঙ্কর দৃশ্য আমরা কখনও কেউ দেখিনি। এই পরিস্থিতির বয়ান দিতে গিয়ে নিউ ইয়র্কে কর্মরত বাংলাদেশি চিকিৎসক সিনহা মনসুর লিখেছেন, শনিবার ভোর! আমি ফিরছি হাসপাতাল থেকে। লকডাউনের মধ্যেও রাস্তায় সারি সারি গাড়ী। লাশবাহী! মিছিলটি ধীর লয়ে এগিয়ে আসছে। ঠিক যেন আমাকে গ্রাস করবে। এই জীবনে আমি অনেক মিছিল দেখেছি।

অনেক মিছিলে অংশ নিয়েছি। কিন্তু এই মিছিল আলাদা। সুনসান, মৌন। অথচ তীব্র ভয় জাগানিয়া!
এই দৃশ্য শুধ নিই ইয়র্কের নয়। মাত্রার ব্যবধান আছে। কিন্তু দেশে দেশে নগরে নগরে এই দৃশ্য। ছোট্ট এক ভাইরাসের কাছে অসহায় পৃথিবী। আমেরিকা, বৃটেন, ইতালির মতো দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। উন্নত বিশ্বের চিকিৎসকরাও প্রয়োজনীয় পিপিই পাচ্ছন না। অথচ এ লড়াইয়ে চিকিৎসকরা সবচেয়ে সামনের সারির যোদ্ধা। মানুষের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে দেশে দেশে অকাতরে জীবন দিচ্ছেন তারা। শুধু ইতালিতেই প্রাণ গেছে শতাধিক চিকিৎসকের।
গত ৮ই মার্চ বাংলাদেশে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে করোনা রোগী শনাক্ত হয়। যদিও এরআগে থেকেই বলে আসা হচ্ছিল, আমরা প্রস্তুত। সবধরনের প্রস্তুতি নেয়া আছে। কিন্তু খুব স্বল্প সংখ্যায় করোনার প্রকোপ দেখা যাওয়ার পরই চারদিকে কেবল নেই আর নেই আওয়াজ ওঠে। বিশেষকরে চিকিৎকরা বলতে থাকেন, পিপিইসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাননি তারা। দেশের বিভিন্নস্থানে বেশ কিছু দুঃখজনক ঘটনাও ঘটতে থাকে। কোথাও কোথা্ও চিকিৎসা না পেয়ে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু অনেককেই নাড়া দেয়। আবার কোথাও কোথাও চিকিৎসকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও চিকিৎসা দিয়ে যান। বেশ কয়েকজন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হন। বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ২৯।
এই পরিস্থিতিতে দৃশ্যত করোনা চিকিৎসায় অনিহা প্রকাশ করায় বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের ছয় জন চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু অনেক বিশ্লেষক বলছেন, এটা দোষারোপ এবং বরখাস্তের সময় নয়। বরং চিকিৎসকদের মনোবল এবং সাহস যুগানোই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। সরকার, জনগণ, মিডিয়া সবারই এখন প্রয়োজন চিকিৎসকদের পাশে দাঁড়ানো। যেন চিকিৎসকরা সাহসের সঙ্গে এ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। একজন সৈনিক যেমন বলতে পারেন না তিনি যুদ্ধে যাবেন না, তেমনি বারুদ, কামান ছাড়া সৈনিককে যুদ্ধে পাঠানোও উচিত নয়। সর্বাগ্রে চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সামগ্রী সরবরাহ করতে হবে। প্রয়োজনে তাদের থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে তাদেরও পরিবার, পরিজন রয়েছে। একইসঙ্গে চিকিৎসকদেরও এটা স্মরণে রাখা দরকার, এটা কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়। ইতিহাসের এক বিশেষ সময়ে তারা দায়িত্ব পালন করছেন। একটি মহান পেশায় কর্মরত এই মানুষদের ত্যাগ শুধু সমকালে নয়, মহাকালেও বিবেচিত হবে। বর্তমানে এই ক্রান্তিকালীন সময়ে বাংলাদেশে সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র্যা বসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, সাংবাদিক, ব্যাংকারসহ অনেক শ্রেণি-পেশার মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। হাসপাতালের একজন ক্লিনারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চিকিৎসক, নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের কাছেই মানুষের চাওয়া সবচেয়ে বেশি।
এ লড়াইয়ে চিকিৎসকদের পাশাপাশি অতিদ্রুত হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত করা প্রয়োজন। আইসিইউ সুবিধা আছে এমন বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেয়া প্রয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে এমন পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করোনা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা দরকার। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ফোকাল পারসনের দায়িত্ব দেয়ারও দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বলা প্রয়োজন, বাংলাদেশে করোনা রোগীদের প্রতি একধরনের বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে যা অত্যন্ত দুঃখজনক। মনে রাখা দরকার, আমরা সবাই কিন্তু করোনায় আক্রান্ত হতে পারি।
আমরা আগেই বলেছি, এটা দোষারোপের সময় নয়। সময় এখন তরিৎ পদক্ষেপ নেয়ার। সামনের দিনগুলো কেমন হবে আমরা নিশ্চিত নই। ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জের পরিস্থিতি এরইমধ্যে নাজুক। সর্বাত্মক লড়াইয়ে নামা উচিত এখনই। ঝুঁকি নিয়ে যেসব চিকিৎসক, নার্স করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন আমরা আপনাদের স্যালুট জানাই। আর যারা দ্বিধাগ্রস্থ তাদের বলি, মানুষের জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ের চেয়ে মহৎ কর্ম নেই। -সূত্র : ম. জমিন