(দিনাজপুর২৪.কম) বন্যায় সারা দেশের ২০টি জেলায় ২২০০-এর বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় এই সংখ্যা আরো বাড়ছে। সর্বোচ্চ দেড় মাস থেকে শুরু করে গেল এক সপ্তাহে বন্ধ থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করতে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তিন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এগুলো হচ্ছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। ডিপিই’র গতকালের সর্বশেষ তথ্যমতে, শুধু প্রাথমিক স্কুলগুলোর প্রায় ১২ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। এটা দিন দিন বাড়বে। তবে বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হলে এই ক্ষতির হার ধীরে ধীরে কমবে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি ও অন্যান্য বিষয়ে মনিটরিং করার জন্য আলাদা সেল গঠন করা হয়েছে। এই সেলগুলো বন্যা শেষ হলে বন্যার সময় একাডেমিক, প্রশাসনিক ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির রিপোর্ট তৈরি করবেন। তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১ হাজার ৩শ’ আর নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার সংখ্যা প্রায় ১ হাজার। গতকাল পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) পরিসংখ্যানে এমন তথ্য জানা গেছে।
সূত্রে জানা গেছে, এর মধ্যে কুড়িগ্রাম, রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, শেরপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, মাদারিপুর, টাঙ্গাইল, শরিয়তপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে পানিতে ডুবে যাওয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১ হাজার ৩০০টিতে প্রায় ১২ কোটি টাকা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে জামালপুরে সবচেয়ে বেশি ২২৮টি, টাঙ্গাইলে ১৪৭টি, কুড়িগ্রামে ১০০টি, মানিকগঞ্জে ৯০টি এবং সিরাজগঞ্জে ১৬০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। সেগুলোতে প্রায় ১০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা চলার কথা থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না।
চলমান বন্যায় কী পরিমাণে ক্ষতি হয়েছে তার সঠিক হিসাব নির্ণয় করতে মাঠপর্যায়ে ও বেশ কিছু দপ্তর অবিরাম কাজ করছে। কিন্তু বন্যার পানি এখনো না নামায় ক্ষতির সঠিক হিসাব নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে মাঠপর্যায় থেকে আসা ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী প্রায় ২৫ কোটি টাকার অঙ্ক দেখানো হয়েছে। ইতিমধ্যে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাঠাতে।
এ ছাড়াও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ সব নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিঠি দিয়ে বলেছে, বন্যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব শিক্ষা প্রকৌশল দপ্তরে পাঠাতে। আর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত ভবন মেরামতের পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ক্ষতি পুষিয়ে দেয়া হবে।
বুয়েটের শিক্ষক ও বন্যা বিশেষজ্ঞ ড. একে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, অমাবস্যার প্রভাবে সাগরে নিম্নচাপ থাকায় খুব বেশি পানি নামতে পারছে না। ধারণা করা হচ্ছে বন্যার পানি শিগগির না নামলে পিরোজপুর ও বরিশাল বিভাগের আরো কিছু এলাকা প্লাবিত হবে। সেক্ষেত্রে আরো কিছু এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোস্তফা কামাল জানান, উত্তর থেকে নিম্নাঞ্চলের দিকে বন্যার পানি নামার কারণে প্রতিদিন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বন্যার পানির কারণে দুর্যোগকবলিত এলাকায় মাধ্যমিক স্তরের বিদ্যালয় এবং কলেজগুলোতে ক্লাস বন্ধ রয়েছে। বন্যার পানি এখনো না নামায় ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব নিরূপণ করা যাচ্ছে না। তবু বসে নেই কর্মকর্তারা। কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা জানার জন্য বেশ কিছু দপ্তর অবিরাম কাজ করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ও ভালনারবেলিটি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মাহবুবা নাসরিন বলেন, আইনে বলা আছে দুর্যোগকবলিত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্লাস-পরীক্ষা আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে নিতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশের এমন অনেক এলাকা রয়েছে যেখানে এর বিকল্প করা সম্ভব না। সে ক্ষেত্রে আমরা প্রস্তাব করেছি দুর্যোগকবলিত এলাকায় ফ্লেক্সিবল ক্যালেন্ডার করার। বলেছি বন্যা শেষ হলে ওই সব এলাকার প্রতিষ্ঠানে বাড়তি ক্লাস নিয়ে আলাদাভাবে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে। সেটা প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমেও হতে পারে। আবার শিক্ষা অফিসারদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকায় নির্দেশ দেয়ার মাধ্যমেও এই ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন মেরামতের পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার বিষয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি। একাধিক কর্মকর্তা বলেন, অতিরিক্ত ক্লাস কখন নেয়া হবে সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি। বলা হয়েছে, স্থানীয় কর্মকর্তারা এই অতিরিক্ত ক্লাসের বিষয়টি নজরদারি করবেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আলমগীর মানবজমিনকে বলেন, আমরা এখনও তথ্য সংগ্রহ করছি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও একাডেমিক ক্ষতি পুষাতে করণীয় ঠিক করতে শিগগিরই বৈঠক করা হবে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মো. হানজালা মানবজমিনকে বলেন, বন্যায় প্রতিষ্ঠানে ভৌত অবকাঠামে কী ক্ষতি হয়েছে, তার পরিসংখ্যান বের করতে দেশের সব নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিঠি দেয়া হয়েছে। জেলাপর্যায়ে অবস্থানরত নির্বাহী প্রকৌশলীরা ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন মেরামতে কত টাকা লাগবে তার তালিকা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে পাঠানোর পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মতে কাজ শুরু হবে। -ডেস্ক রিপোর্ট