(দিনাজপুর২৪.কম) একই দিনে তিনটি দেশে জঙ্গি হামলা চালানো হয়েছে- ফ্রান্স, কুয়েত ও তিউনিসিয়ায়। হামলার সময় হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে মুসলমানদের পবিত্র মাস রমজানের পবিত্র শুক্রবার দিনটিকে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তিনটি হামলার মধ্যে কোন যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত কেবল কুয়েতের মসজিদে হামলার দায় স্বীকার করেছে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস। তিনটি হামলায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিহত হয়েছে কমপক্ষে ৫২ জন। এর মধ্যে তিউনিসিয়ার উপকূলবর্তী পর্যটন শহর সাসেতে ২ বন্দুকধারীর হামলায় ২৭, কুয়েতের রাজধানীর শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ২৪ এবং ফ্রান্সের একটি গ্যাস কারখানায় হামলায় শিরশ্ছেদকৃত একজনের লাশ ও দুজনকে আহত অবস্থায় পাওয়া যায়। তিউনিসিয়া ও কুয়েতে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ফ্রান্সের ঘটনায় একজন সন্দেহভাজনকে আটক করা সম্ভব হলেও, কুয়েত ও তিউনিসিয়ায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি। তবে তিউনিসিয়ায় এক বন্দুকধারী নিহত হয়েছে।
তিউনিসিয়ায় আবার পর্যটকদের ওপর হামলা, নিহত ২৭
তিউনিসিয়ার জনপ্রিয় পর্যটন স্পট সসেতে দুটি হোটেলের পাশে সমুদ্রসৈকতে এক সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৭ জন। নিহতদের বেশির ভাগই বিদেশী। আহত হয়েছেন ছয়জন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এক বন্দুকধারী পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। আরেকজনকে ধরতে অভিযান চলছে। এ খবর দিয়েছে বিবিসি। তিউনিসিয়ায় পর্যটকদের ওপর হামলার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে গত মার্চে রাজধানী তিউনিসের একটি জাদুঘরে হামলা চালিয়ে বহু বিদেশী পর্যটকসহ ২২ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। এবার জনপ্রিয় পর্যটন স্পট উপকূলবর্তী সসেতে হামলার ঘটনা ঘটলো। দেশটিতে ছুটি কাটাতে যাওয়া এক বৃটিশ নাগরিক বিবিসিকে জানান, পাশের একটি হোটেলে অবস্থানের সময় তিনি হামলার শব্দ শুনতে পান। কক্ষ থেকে তিনি পিস্তল সহকারে এক ব্যক্তিকে দেখতে পান। যদিও ওই ব্যক্তি হামলাকারী নাকি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, তা বুঝতে পারেননি তিনি। কর্মকর্তারা বলছেন, হোটেল ইমেপরিয়াল মারহাবার পাশের একটি সৈকতে ঘটনাটি ঘটে। প্রসঙ্গত, আইএস জঙ্গিরা এর আগে নিজেদের অনুসারীদের ওপর পবিত্র রমজান মাসে হামলার পরিমাণ বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছিল। এ ছাড়া গত মার্চের হামলার সঙ্গে আইএস জড়িত থাকতে পারে অনেকে ধারণা করেছিলেন। এবারের হামলা সমপর্কে এখন পর্যন্ত কেউই দায় স্বীকার করেনি। আগেরবারের মতো এবারও পর্যটকদের উদ্দেশে হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আল জাজিরা জানিয়েছে, নিহতদের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। আরেকটি সূত্র বলেছে, হামলাকারীরা পুলিশের পোশাক পরে ছিল বলে অনেক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, কয়েক মাসের মধ্যে দুটি বড় হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তিউনিসিয়ার অর্থনীতি। কেননা, দেশটি ব্যাপকভাবে পর্যটনশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বিবিসি জানিয়েছে, ২০১৪ সালে দেশটিতে প্রায় ৬১ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। পর্যটন ও ভ্রমণ খাতে দেশটিতে চাকরি করছেন প্রায় ৪৭৩০০০ জন, যা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ১৩ শতাংশ। তিউনিসিয়ার জাতীয় প্রবৃদ্ধির মোট ১৫.২ শতাংশই আসে পর্যটন ও ভ্রমণ খাত থেকে।
কুয়েতে মসজিদে বোমা হামলা, নিহত কমপক্ষে ২৪
কুয়েতের রাজধানী কুয়েত সিটিতে শিয়া ইমাম সাদিক মসজিদে জুমার নামাজের পর ভয়াবহ এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় কমপক্ষে ২৪ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরও বেশ কয়েকজন। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। হামলার দায় স্বীকার করে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস জানিয়েছে, তাদেরই একটি গোষ্ঠী ওই হামলা চালিয়েছে। কুয়েতে এ ধরনের হামলার ঘটনা এটিই প্রথম। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা অনলাইন। ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, মসজিদের মেঝেতে ভেঙ্গে যাওয়া ইটের টুকরোর উপর বেশ কয়েকজনের শরীর পড়ে আছে। আশেপাশের সর্বত্র ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, আহত অনেকের অবস্থা সংকটজনক। হামলার পর কুয়েতের আমীর সাবাহ আল-আহমাদ আল-জাবের আল-সাবাহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। কুয়েতের সাবেক তথ্যমন্ত্রী সাদ আল-আজমি বলেন, কোন দেশই যে সন্ত্রাসবাদ থেকে মুক্ত নয়, এ হামলাটি তারই প্রমাণ। হামলার পর জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। সেখানে আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীর নাম আবু সুলেইমান আল মুয়াহেদ বলে দাবি করা হয়। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বোমা হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল ‘প্রত্যাখ্যানকারীদের একটি মন্দির’। প্রসঙ্গত শিয়া মুসলিমদের ও তাদের মসজিদকে এ নামেই বর্ণনা করে আইএস জঙ্গিরা। বিবৃতিতে বলা হয়, হামলায় কয়েক ডজন ব্যক্তি আহত বা নিহত হয়েছে।
কুয়েতে এ ধরনের হামলা প্রথম হলেও, উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রথম নয়। কয়েক সপ্তাহ আগে সৌদি আরবের দুইটি শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস। কুয়েতের প্রধানমন্ত্রী শেখ জাবের আল-মুবারক আল-সাবাহ বলেন, শুক্রবারে রাজধানীতে হামলা হচ্ছে কুয়েতের জাতীয় ঐক্য নস্যাতের একটি প্রচেষ্টা। প্রসঙ্গত, তেলসমৃদ্ধ ছোট এ দেশটির জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ হলো শিয়া জনগোষ্ঠী। এক প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেন, মসজিদে জুমাহ’র নামাজ পড়তে জড়ো হয়েছিলেন প্রায় ২ হাজার মানুষ। নামাজের পরপরই হামলাটি চালানো হয়। একটি নিরাপত্তা সূত্র এএফপিকে নিশ্চিত করে বলেন, এটি ছিল একটি আত্মঘাতী হামলা। একই ধরনের বর্ণনা এসেছে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে। তারা জানান, একজন আত্মঘাতী বোমারু হঠাত করে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে বিস্ফোরণ ঘটান।
ফ্রান্সে সন্ত্রাসী হামলায় ১ জনকে শিরশ্ছেদ, আহত ২
ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলের একটি গ্যাস কারখানায় শুক্রবার সন্ত্রাসী হামলায় ১ জনকে শিরশ্ছেদ করা হয়েছে। হামলায় আহত হয়েছে আরও ২ জন। ঘটনাস্থলে পাওয়া গেছে আরবি ভাষায় লেখা একটি বার্তা। হামলার পরপর এক বক্তৃতায় এসব জানিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদে। এ খবর দিয়েছে সিএনএন। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কাজেন্যুভে জানান, সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। ওই ব্যক্তিকে আগে থেকেই নজরদারিতে রাখা হয়েছিল, যদিও কোন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে তার জড়িত থাকার প্রমাণ এর আগে পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, অপরাধ সংঘটনের পরপরই বিপজ্জনকই ওই ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। তার সহযোগীদের সন্ধানে তদন্ত করছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। অপরদিকে নিজের ভাষণে শুক্রবারের ওই হামলাকে ‘পুরোপুরি সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ওঁলাদে। গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ১০টার একটু আগে ওই ঘটনাটি ঘটে। এ সময় উচ্চগতিতে একটি গাড়ি ঢুকে পড়ে একটি গ্যাস কারখানার অভ্যন্তরে। সেখানে একটি ভবনে রাখা ছিল বেশ কয়েকটি গ্যাস ক্যানিস্টার। সেদিকেও ঢুকে পড়ে গাড়িটি। ওঁলাদে বলেন, সন্দেহাতিতভাবে প্রমাণিত হয়, হামলা তথা বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্যই ওই প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি নিজের সমবেদনাও জানান তিনি। বার্তাসংস্থা এএফপি এর আগে জানিয়েছে, সন্দেহভাজন এক ইসলামী হামলাকারী কারখানার ফটকে শরীর থেকে আলাদা করা একটি মুণ্ডু ঝুলিয়ে রেখেছে। সেখানে আরবি ভাষায় লেখা বার্তাও পাওয়া যায়। এর পাশেই একটি ইসলামি পতাকা পাওয়া যায়। নিজেকে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে দাবি করা এক ব্যক্তি বলেন, ইসলামি পতাকাবাহী কয়েকজনের একটি দল জোর করে কারখানায় প্রবেশ করে। এরপর কারখানার এক ব্যক্তিকে শিরশ্ছেদ করে গ্যাস ট্যাঙ্কগুলোকে টার্গেট করে তারা। ফ্রান্সের লে মন্ডে পত্রিকা কয়েকটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, দুই জন লোক একটি গাড়ি ঢুকিয়ে দেয় গ্যাস ক্যানিস্টার রাখা ভবনে। এর ফলে বিস্ফোরণ ঘটে সেখানে। আরবি ভাষায় লেখা একটি ব্যানার উদ্ধার করা হয় ঘটনাস্থল থেকে, যদিও এর মর্মার্থ উদ্ধার করা যায়নি। প্যারিসের সরকারি কৌঁসুলির কার্যালয় জানিয়েছে, ঘটনার তদন্তে তাদের সন্ত্রাসবাদবিরোধী বিভাগ কাজ শুরু করেছে।  -(ডেস্ক)