-পুরনো ছবি

এস.এন.আকাশ, সম্পাদক (দিনাজপুর২৪.কম)

“তবু তোমাকে ভালোবেসে
মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এসে
বুঝেছি অকূলে জেগে রয়
ঘড়ির সময়ে আর মহাকালে
যেখানেই রাখি এ হৃদয়”

সময়ের চক্রে বাধা পড়েনি জীবনানন্দের প্রেম। তাই তাঁর কাছ থেকেই আজ ধার করে নেওয়া যাক এ সংবাদের শিরোনাম। কিন্তু সবার প্রেম কি জীবনানন্দের মতো? হৃদয় তো আজ অনেকেরই ঘুরপাক খাচ্ছে জুলিয়াস সিজারের বানানো ক্যালেন্ডারে। ঘুরেফিরে মনে পড়ছে, আহা! আজই তো ১৪ই ফেব্রুয়ারি! নিন্দুকেরা যা-ই বলুক ভাই, আজ একটা ফুল কেনা চাই। ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র দরকার আছে? থাকুক বিতর্ক। সাধ করে বিতর্কে বহুদূর যেতে চায় কে? তারচেয়ে দুমুঠো অবসর পেলে থাকা যায় আরেকটু কাছাকাছি।

ভালোবাসা দিবস নিয়ে বিতর্ক বিস্তর। পশ্চিমা বিশ্বের আমদানি করা সংস্কৃতি বলে গালমন্দও কম শুনতে হয়নি একে। তবে শুরুর গল্পটা সিনেমাটিক বটে। প্রাচীন রোমে ভ্যালেন্টাইন নামে ছিলেন এক চিকিৎসক। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে নিভৃতে ধর্মপ্রচারের কাজ করতেন তিনি। ওই সময়কার শাসক ক্লডিয়াস আবার বিষয়টি মোটেও পছন্দ করতেন না। খিস্টধর্মে বিশ্বাসীদের দেওয়া হতো কঠিন শাস্তি। যথারীতি ভ্যালেন্টাইনকে ধরে নিয়ে যায় সেনারা। কারাগারে বসেই বন্দিদের চিকিৎসা করে আসছিলেন তিনি। একদিন কারাপ্রধান তার অন্ধ মেয়েকে নিয়ে আসেন ভ্যালেন্টাইনের কাছে। ভ্যালেন্টাইন সুস্থ করে তোলেন মেয়েটিকে। প্রেমেও পড়ে যান। কিন্তু ততদিনে জনপ্রিয়তার কারণে ক্লডিয়াসের ঈর্ষার পাত্র হয়ে যান ভ্যালেন্টাইন।

ভ্যালেন্টাইন বুঝতে পেরেছিলেন, তাকে মেরে ফেলা হবে। ২৬৯ সালে (কারও মতে ২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি) রোম সম্রাটের আদেশে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। মৃত্যুর আগে প্রেমিকাকে বিদায় জানিয়ে একটি চিরকুট লিখে যান। তাতে লেখা ছিল, ‘ফ্রম ইওর ভ্যালেন্টাইন’। এ কথাই হয়ে গেল কালজয়ী। কার্ডের নিচে এখনও প্রেমিক-প্রেমিকারা লিখে দেয়- ইতি তোমার ভ্যালেন্টাইন।

কিন্তু ইতিহাস যতই প্রেমময় হোক, এ দিবস নিয়ে চিন্তা-দুশ্চিন্তাও আছে ঢের। ভালোবাসা দিবসের নামে আবার কেউ বড় অংকের ব্যবসা ফেঁদে বসে নেই তো? এসব দিবস পালনের নামে আবার আমাদের সংস্কৃতি রসের অতলে হাবুডুবু খাবে না তো?

সাংস্কৃতিক অ্যাক্টিভিস্ট ও নাট্যঅভিনেতা মাসুম রেজা মনে করেন, অন্যান্য দিবসের ক্ষেত্রে তারিখটার একটা গুরুত্ব থাকে বলেই তা পালন করা হয়।  তিনি বলেন, ‘মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয় ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিকে স্মরণ করতে, ভাষা শহীদদের সম্মান জানাতে। প্রতিদিনই আমার ভাষা বাংলা ভাষা। কিন্তু তারপরও আমরা ২১শে ফেব্রুয়ারি পালন করি। কারণ ওইদিন আমাদের জন্য মহান। সেভাবেই একটি বিশেষ দিনে ভালোবাসা দিবস পালনের মাধ্যমে একটি দিনকে হাইলাইট করা হয়। কিন্তু ওইদিনই কি শুধু ভালোবাসা বা ভালোবাসা সারা বছরের জন্য কিনা এই বিতর্কের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৪ ফেব্রুয়ারির এমন কোনও গুরুত্ব নেই যে আমাদের পালন করতেই হবে। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামে এই দিবসের নামকরণ। তার নামে যে গল্পটি আছে সেটিও স্বীকৃত না। একেকজন একেকভাবে বলে। ফলে দিবসটির ইতিহাস নিয়েই বিতর্ক আছে। সেই দিবস পালনকে আমি খুব বেশি যৌক্তিক মনে করি না। এই দিবসে কিছু বাণিজ্য হয়। সেটা হয়তো অর্থনীতিতে কিছু অবদান রাখে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফাজরীন হুদা বলেন, ‘ভালোবাসা সব সময়ের জন্য। কয়েক দশক হলো পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে এটা আমাদের এখানে ফলাও করে এসেছে। ভালোবাসা দিবসকে কেন্দ্র করে একটা বড় ধরনের কনজিউমারিজম সৃষ্টি হয়েছে। দিনটিকে কেন্দ্র করে ব্যবসাপ্রবণ হয়ে ওঠে সবাই। উপহার বিক্রির একটা প্রবণতা তৈরি হয়। আমি মনে করি ভোগবাদ বাদ দিয়ে একটু পরিমিতভাবে আমাদের সংস্কৃতি ও অনুশাসন অনুযায়ী এটি পালন করা উচিত।’

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিক বলেন, সবকিছুই সারা জীবনের জন্য। ঈদের আনন্দ দুদিনের তারপর কি সারাবছর নিরানন্দ থাকবো? এরপর আছে পহেলা বৈশাখ, এটি আরেকটা বছর, আরেকটা মাস, তো এটি কি আমরা উদযাপন করবো না? অবশ্যই করবো। আমাদের জীবনে উৎসবের প্রয়োজন আছে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশের যে সংস্কৃতি, একসময় আমরা ছোট ছোট ঘটনা নিয়ে প্রচুর উৎসব করেছি। এই সংস্কৃতি দুঃখজনক ভাবে কমে যাচ্ছে। প্রাণের দিকে যাওয়ার যে আকাঙ্খা এটি জাতিগতভাবে আমাদের মধ্যে আছে। শুধু ভ্যালেন্টাইনস ডে বলে ভালোবাসবেন বিষয়টা কিন্তু তা না, ভালোবাসাকে উদযাপনের প্রয়োজন আছে। আমার যে প্রিয় মানুষটি তাকে ভালবাসি মুখে বলা, তার মানে এই নয় যে ভালোবাসি না। এটি প্রদর্শনের প্রয়োজন আছে, বলারও প্রয়োজন আছে। একজন মানুষ আরেকজনের কাছে যে স্পেশাল এটা অনুভব করতে দেওয়া জীবনের আরেকটি আনন্দ। তবে আজকে ১৪ ফেব্রুয়ারি আজই ভালোবাসা দিবস পালন করতে হবে এমনটা বলছি না। ভালোবাসা থাকবে পুরো বছর জুড়ে। একটি নির্দিষ্ট দিনকে বেছে নিয়ে ভালোবাসা দিবস পালন করাটা ঠিক নয়। অনেকে বলে যারা একদিনের ভালোবাসা দিবস পালন করে তাদের ভালোবাসার ঘাটতি রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমি নিজে একমত। কারণ ভালোবাসা সব সময় ঘিরে থাকবে। বাঙালির ভালোবাসা একদিনের নয়। সারা জীবনের।

দিবস নিয়ে তর্ক-বিতর্কের গ্যাঁড়াকলে যেতে রাজি নন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের স্নাতক পড়ুয়া নাফিসা তৃষা। বললেন, ‘ধরুন, প্রত্যেক ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ঘৃণা দিবস পালন করা হচ্ছে। এ দিন সবাই সবাইকে দেখলেই তেড়ে আসছে, নয়তো মুখ বাঁকিয়ে চলে যাচ্ছে। এমনটা হলে ভালো হতো? এরচেয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারিই ভালো নয় কি?’

দিবস পালন নিয়ে খুব একটা সমস্যার কথা বলছেন না কেউ বটে। দিবসটাও যেহেতু ভালোবাসার, তাই তর্ক-বিতর্ক কিংবা যাবতীয় চোখ রাঙানি না হয় একদিন পকেটেই থাকুক। তবে টিকটক আর ভাইরাল ভিডিওর এ যুগে নিষ্পাপ দিবস নিয়েও যে মা-বাবাদের টেনশন কমে না, সেটা হালের তরুণ-তরুণীদের আরেকবার মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন রোকেয়া ইসলাম নামে রাজধানীর বনশ্রীর এক অভিভাবক। -ডেস্ক