বি. এম. জুলফিকার রায়হান, তালা (দিনাজপুর২৪.কম) তালার বালিয়া টিআরএম ভুক্ত কপোতাক্ষ নদের সংযোগ খালে তীব্র পানির স্রোত এবং বালুবাহী কার্গো ট্রলারের ধাক্কায় কাচা-পাকা প্রায় ২৫টি বসত ঘর পানিতে ধ্বসে গেছে। শুক্রবার রাত ১২টার দিকে আকস্মিক ভাবে ঘর-বাড়ি ভেঙ্গে পানিতে ভেঁসে যাওয়ায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষদের মাঝে। মায়েরা তাদের কোলের শিশু সন্তানদের নিয়ে সারা রাত খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করে। বাড়ির পুরুষরা ঘরের আসবাব পত্র ও গৃহ পালিত পশুদের অন্যত্র সরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ঘটনায় গোটা এলাকায় মানুষের মাঝে আতংক ও হতাশা নেমে আসে। ক্ষতিগ্রস্থদের হাহাকারে এলাকার বাঁতাশ ভারি হয়ে ওঠে। শনিবার সকালে ঘটনার সংবাদ পেয়ে তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাহবুবুর রহমান, খেশরা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এস. এম. লিয়াকত হোসেন, সমাজ সেবিকা ও চেয়ারম্যান প্রার্থী মুর্শীদা পারভীন পাপড়ী এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. রাশেদ সানা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
বালিয়া ওয়ার্ডের ইউপি মো. সদস্য রাশেদ সানা জানান, বালিয়া বিলে টিআরএম করার জন্য কপোতাক্ষ নদের সংযোগ খাল ব্যবহার করা হচ্ছে। যে কারনে এই খালে পানির তীব্র স্রোত তৈরি হয়ে খাল অববাহিকায় বসবাসকারী মানুষদের বাড়ি-ঘর হুমকির মূখে পড়ে। ইতোপূর্বে একাধিক ব্যক্তির ঘর খালের পানিতে ভেঁসে যায়। স্থানীয় কবরস্থান সহ খাল পাড়ের বহু জমি পানিতে বিলিন হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ভরা কাটালের প্রভাবে শুক্রবার কপোতাক্ষ নদে জোয়ারের পানির তীব্র চাঁপ সৃষ্টি হয়। এতে করে বালিয়া সংযোগ খাল পাড়ের মাটি ধ্বসে পড়তে থাকে। এরমধ্যে রাত ১২টার দিকে নদের ভাঙ্গন ঠোকাতে সিমেন্টের ব্লক তৈরির জন্য ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বালুবাহী কার্গো ট্রলার খালের মধ্যে প্রবেশ করলে পানির চাঁপ আরো বৃদ্ধি পায়। পানির এই চাঁপ এবং তীব্র স্রোতের মূখে মুহুর্তের মধ্যে খাল পাড়ে বসবাসকারী আফছার গাজী, নাজিম উদ্দীন, রাহাদুল, শহিদুল ও আজহারুল ইসলাম এর পাঁকা বাড়ি-ঘর এবং সাহাদ আলী, জাহিদ, আহাদ আলী, ফরহাদ, মনিরুল, সাজ্জাদ, নজরুল, হাবিবুর, আকবর, রিজিয়া বেগম, আব্দুল্লাহ, হায়দার, মমতাজ বেগম, জাহাঙ্গীর, আব্দুস সাত্তার, রুহুল আমীন, মিঠু, শফি, গোলাম বারী, সিরাজুল, মরিয়ম বেগম ও হাসনা বেগমের কাঁচা ঘর-বাড়ি খালের মধ্যে ধ্বসে পড়ে। আর খাল পাড়ের অপর বাসিন্দা মাজেদ শেখ এর বাড়ি ইতোপূর্বে পানিতে ভেঁসে যাওয়ায় সে অন্যত্র বসবাস শুরু করেছে। শুক্রবার নদের তীব্র পানির স্রোতে এলাকার ৩০টি বাড়ি ভেঁসে যায়, আর জামাল, সামাদ, কালাম, নাজমুল, আলীম ও জাহাঙ্গীর এর বাড়ি বর্তমানে হুমকির মধ্যে রয়েছে। যেকোনও সময় এই বাড়িগুলো ধ্বসে পড়া সহ খালের কপোতাক্ষ নদ সংলগ্ন বাঁধ ধ্বসে যেয়ে বালিয়া, শুভংকাটি ও শ্রীমন্তকাঠি চর বিলের প্রায় সাড়ে ৫ শত বিঘা জমির বোরো ধান তলিয়ে যাবার আশংকা সৃষ্টি হয়েছে। আকস্মিক ভাবে পানির স্রোতে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া ৩৫টি পরিবারের ২ শতাধিক মানুষ শনিবার থেকে সরকারি রাস্তা ও পাশ্ববর্তি আফছার গাজীর জমির উপর টোং ঘর বেঁধে বসবাস শুরু করেছে। ঘর-বাড়ি, আসবাবপত্র হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাসকারী পরিবারগুলো অর্ধহারে-অনাহারে অসহায় এর মত দিনাতিপাত শুরু করেছে।
ক্ষতিগ্রস্থ আফছার গাজী, মমতাজ বেগম, জাহাঙ্গীর ও শহিদুল সহ একাধিক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জনদাবী উপেক্ষা করে কর্তৃপক্ষ পুলিশ ও র‌্যাব ব্যবহার করে টিআরএম চালু করে। সেসময় খাল পাড়ের ভাঙ্গন ঠেকানোর ব্যবস্থা করলে আজ আমাদের বাড়ি-ঘর খালের মধ্যে ধ্বসে পড়তো না। খাল পাড়ের মানুষদের অভিযোগ, শুক্রবার রাতে কপোতাক্ষ নদের জোয়ারের চাঁপের সাথে বালুবাহী কার্গো ট্রলারের ধাক্কায় ৩০টি কাঁচা ও পাকা বসত বাড়ি-ঘর খালের বুকে ধ্বসে পড়ে। খালপাড়ে বসবাসকারী সবাই হতদরিদ্র এবং ভূমিহীন। তাৎক্ষনিক তাদের খাদ্য না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা এবং ইউপি সদস্য রাশেদ সানা প্রাথমিক ভাবে চাল, ডাল দিয়ে খিচুড়ি রান্নার ব্যবস্থা করেছেন। ইউপি সদস্য রাশেদ সানা বলেন, হত দরিদ্র মানুষগুলো একরাতের মধ্যে সব হারিয়ে নি:স্ব হয়ে পড়েছে। অতি শীঘ্রই তাদের পূনর্বাসন সহ খাদ্য ও স্যানিটেশন জরুরী। এজন্য তিনি প্রশাসনের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এব্যাপারে তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোকে পূনর্বাসন করার জন্য জায়গা দেখা হচ্ছে। জায়গা পেলে রোববার তাদের সেখানে পুনর্বাসন সহ ঘর করার জন্য প্রত্যেক পরিবারকে ২ বান করে টিন ও নগদ ৬ হাজার টাকা দেয়া হবে।
এদিকে, বালুবাহী কার্গো ট্রলারের ধাক্কায় বাড়ি-ঘর ধ্বসে যাবার বিষয় অস্বীকার করে ব্লক নির্মানের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান যশোরের মো. নূর হোসেন এর স্বত্তাধিকার মো. শামীম চাকলাদার বলেন, কপোতাক্ষ নদের সংযোগ খালের ভাঙ্গন রোধ করার জন্য রোববার থেকে কাজ শুরু হচ্ছে। এছাড়া মানবিক কারনে, প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ভাঙ্গন ঝুকিতে থাকা বিলের বাঁধ ও বাড়ি-ঘরের পাশে বালির বস্তা দেওয়া হবে।
অন্যদিকে, শনিবার দুপুরে সরজমিন পরিদর্শনকালে দেখা যায়, খালে কপোতাক্ষ নদের জোয়ারের তীব্র চাঁপে বাড়ি-ঘর এবং খাল পাড়ের মাটি ধ্বসে পড়ছে। অনেক পরিবার ভেঁসে যাওয়া ঠেকাতে, খালের  পানিতে ডুবে থাকা তাদের ঘরের চাল ও বেড়া মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছে। তারপরও স্রোতের টানে বাঁশের চাল-বেড়া দড়ি ছিড়ে ভেঁসে যাচ্ছে। এছাড়া পরিবারগুলো যতটুকু আসবাবপত্র বা চাল-বেড়া উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে তা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।