(দিনাজপুর২৪.কম) পেঁয়াজের মতোই যেন মাওকা পেয়ে বসেছে এক শ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ী। করোনাভাইরাসের কারণে হঠাৎ করে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ১০ টাকার মাস্ক ৫০ টাকা এবং ২০ টাকার মাস্ক একশ’ টাকা দরে বিক্রি করছে। কোথাও কোথাও দোকানে ‘মাস্ক নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়ে আরো বেশি দামে বিক্রির জন্য কৃতিম সংকট সৃষ্টি করছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিক্রেতাদের দাবি, হেক্সিসল, স্যানিটাইজারসহ বিভিন্ন জীবাণুনাশক বাজারে ছাড়ছে না কোম্পানিগুলো। বিশেষ করে এসিআই, এসকে ফার্মা, স্কয়ার, অ্যারিস্টো-ফার্মা এসব জীবাণুনাশক তৈরি করে থাকে। বারবার অর্ডার দেয়ার পরও মার্কেটিংয়ের লোকেরা বলছে, সাপ্লাই নেই। অনেক সময় চাহিদার তুলনায় কম পাচ্ছেন তারা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এভাবে ‘মাস্কের কৃতিম সংকট সৃষ্টি এবং বেশি দামে বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। আর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের প্রতি মানবিক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখ্য চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেছেন, করোনাভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না। সংক্রমণের শিকার রোগীকেই শুধু মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ানোর জন্য সুস্থ মানুষের মাস্ক ব্যবহারের দরকার নেই। গতকাল আইইডিসিআরে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সরকারের রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেছেন, আতঙ্ক নয় সতর্ক থাকতে হবে। সবার মাস্ক ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। এদিকে গতকাল মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের কৃতিম সংকট সৃষ্টি এবং বেশি দামে বিক্রি বন্ধে অভিযানে নেমেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

বিশ্বের অন্তত ১১৫টি দেশের মতো বাংলাদেশেও দেখা দিয়েছে করোনাভাইরাস। এই ছোঁয়াছে রোগ থেকে রক্ষার আগাম প্রস্তুতি হিসেবে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবহার করতে বলে থাকেন বিশেষজ্ঞরা। এতে করে মাস্কের চাহিদা বেড়ে গেছে সারাদেশে। এ সুযোগে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার।

জনদুর্ভোগ কমাতে বাড়তি দামে এসব পণ্য বিক্রি বন্ধ করতে দেশজুড়ে অভিযান চালাচ্ছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এর অংশ হিসেবে গতকাল রাজধানীতে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে নামে।

রাজধানীর মিডফোর্ট হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) সদর দফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম। মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের দাম বেশি রাখায় তিনটি প্রতিষ্ঠানকে মোট দুই লাখ টাকা জরিমানা করেন তিনি। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় অভিযান পরিচালনা করছেন র‌্যাব-২ এর কোম্পানি কমান্ডার এসপি মহিউদ্দিন ফারুকি। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দেশে করোনাভাইরাস শনাক্তের খবর প্রকাশের পর এ সংক্রান্ত মেডিক্যাল সামগ্রীর চাহিদা বেড়ে গেছে। আর এর সুযোগ নিচ্ছেন অসাধু বিক্রেতারা। তারা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এসব পণ্য কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করছেন। দোকানে ২০ টাকার মাস্ক বিক্রি হচ্ছে দুইশ’ টাকায়।

রাজধানীর গুলশান এলাকায় অভিযান চালায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মনিটরিং টিম। ঢাকা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল বলেন, হঠাৎ বাজার থেকে মাস্ক আর হ্যান্ডওয়াশ উধাও হয়ে গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন ফার্মেসি এবং সুপার শপ ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। কেউ যেন বাড়তি দাম না নিতে পারে, সেজন্য মাঠে কাজ করছি। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রোসলিনা পারভীন জানান, তার নেতৃত্বে গুলশান ১, গুলশান ২, বনানী ও মহাখালী এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। বেশি দামে মাস্ক বিক্রি ও পণ্যের রশিদ সংরক্ষণ না করায় কয়েকটি ফার্মেসির জরিমানা করা হয়েছে।

জানতে চাইলে ভোক্তা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, প্রতিষ্ঠানটির চারটি টিম রাজধানীর গুলশান, ফার্মগেট, তেজগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়েছে। কোথাও বেশি দামে এসব পণ্য বিক্রি করতে দেখা যায়নি। তবে বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকলেও আমদানি কম। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার উপ-পরিচালক মেজর রইসুল আজম জানিয়েছেন, মিটফোর্ড, মোহাম্মদপুর ছাড়াও আরও দুটি এলাকায় পৃথক অভিযান চালানো হয়।

রাজধানী ঢাকার বাইরে গতকাল নারায়ণগঞ্জে অতিরিক্ত দামে মাস্ক বিক্রির অভিযোগে ৮ ফার্মেসিকে জরিমানা করেছে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসময় একজনকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয়। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান ফারুক, আবদুল মতিন ও নাছরীন আক্তার যৌথভাবে শহরের কালিরবাজারের বিভিন্ন ফার্মেসিতে এ অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে কালিরবাজারের নুরুল মেডিক্যাল কর্ণার, রাজু মেডিক্যাল কর্ণার, হাসান ফার্মেসি, হক ফার্মেসিসহ ৮ ফার্মেসিকে মোট ১ লাখ ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া বেশি দামে মাস্ক বিক্রি করার অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ন‚রুল মেডিক্যাল কর্ণারের কর্মচারী বিশ্বজিত দাসকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড দেয়।

সারাদেশের মতো রাজশাহীতে অসাধু ব্যবসায়ীরা মাস্কের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও চিকিৎসকরা বলছেন, সবার মাস্ক ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সেই মাস্ক নিয়েই তেলেসমাতি শুরু করেছে রাজশাহীর ফার্মেসিগুলো। রীতিমতো দোকানে দোকানে মাস্ক নেই বলে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। কৃত্তিম সংকট তৈরি করতেই এভাবে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেন ক্রেতারা। এ নিয়ে চরম বিড়ম্বনায় পড়েছেন ক্রেতারা। রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সরবরাহ কম থাকার অজুহাত দিয়ে ১০-১২ গুণ বেশি দামে মাস্ক বিক্রি করা হচ্ছে ফার্মেসিগুলোতে। দোকানি ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সার্জিক্যাল, কাপড়ের ও ফিল্টার মাস্কের কয়েকগুণ দাম বেড়েছে। পাঁচ টাকার জিনিস রাজশাহীর বাজারে বিক্রি হচ্ছে এখন ৫০-৬০ টাকা দামে। রাজশাহী নগরীর ল²ীপুর দাদু ফার্মেসি, শাহীন ফার্মেসি, ওল্ড রাজশাহী ফার্মেসি, রাজশাহী ফার্মেসি, সার্জিক্যাল স্টোরসহ বিভিন্ন দোকানে ঝুলে দেয়া হয়েছে মাস্ক নেই সাইনবোর্ড।

রংপুর বিভাগীয় শহরে মাস্ক, হ্যান্ডওয়াশ এবং ওষুধের দাম বেশি নেয়ায় গতকাল পাঁচটি ফার্মেসির মালিককে চল্লিশ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। রংপুর নগরীর কাচারী বাজার, ধাপ, পৌরবাজার ও গ্রান্ড হোটেল মোড়ে অভিযান চালিয়ে এ জরিমানা আদায় করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আফরিন জাহান ও তনুকা ভৌমিক। নগরীর ধাপ এলাকায় অভিযানের সময় বেগম ফার্মেসি ও ঢাকা সার্জিক্যাল পনেরো টাকার একটি ফেস মাস্ক দুশ’ টাকায় বিক্রির অভিযোগে কর্মচারীকে হাতে নাতে ধরা হয়।

অভিযানের সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আফরিন জাহান বলেন, ওষুধ ব্যবসায়ীদের এমন কর্মকান্ড নীতি নৈতিকতা বিবর্জিত। মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অতিরিক্ত মুনাফার চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।

করোনাভাইরাস নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখ্য চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেছেন, এই ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না। শুধু যারা সংক্রমিত হয়েছেন তাদের সংস্পর্শে গেলেই অন্যদের সংক্রমণের ভয় আছে। সংক্রমণের শিকার রোগীকেই শুধু মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ানোর জন্য সুস্থ মানুষের মাস্ক ব্যবহারের দরকার নেই। অযথাই মানুষ মাস্ক কিনতে ছুটছেন। এ কারণে খামোখা শুধু দাম বেড়ে যাচ্ছে। সূত্র: ইনকিলাব