(দিনাজপুর২৪.কম) খট খট খটর খটর। রাত বাড়ছে আর খট খট খটর খটর শব্দ ভারি হচ্ছে। রাতদিন চলছে এই শব্দ। কোথাও হাতল টানছে মানুষ। কোথাও বা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র টানছে সেই হাতল। এই শব্দের সঙ্গে কুণ্ডলি থেকে সুতা আসছে। বুনন চলছে কাপড়ের। সামনে ঈদ তাই দিনরাত নেই তাঁতিদের। তাঁত বুনন চলছে আর নতুন নতুন শাড়ি তৈরি হচ্ছে। যা দেশের নানান প্রান্ত ছুঁয়ে পেঁৗছে যাবে বিদেশেও। সারা বছরের সংসার খরচের অর্থ সংগ্রহে এখন তাঁতি পরিবারের সদস্যরা চাহিদা মতো শাড়ি সরবরাহে শ্রম নিংড়ে দিচ্ছেন। তাঁতশিল্পের কুটির সংস্কৃতির পাশাপাশি এখন বড় কারখানাতেও চলছে নানান রকম শাড়ির উৎপাদন। পাবনা এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। ‘কন্যা কইরো নাগো মন ভারি; পাবনা থিইক্যা আইনা দিমু ট্যাহা দামের মটুরি’। পাবনার শাড়ির সুনাম দেশের সীমানা ছাড়িয়েছে অনেক আগেই।

ঈদ, পূজা ও অন্যান্য উৎসবে পাবনার শাড়ির বেশ কদর দেখা যায়। ঈদ সামনে রেখে মুখর হয়ে উঠেছে পাবনার তাঁতিপাড়া। জামদানি, সুতি জামদানী, সুতি কাতান, চোষা, বেনারসি, শেট নামে শাড়ি তৈরি হচ্ছে পাবনার তাঁতপল্লীতে। এ ছাড়া বিভিন্ন নবাবী নামের লুঙ্গিও তৈরি করছেন তাঁতিরা। শাড়ি-লুঙ্গির পাশাপাশি তাঁতের তৈরি থ্রি পিসের চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। এখন সবাই ব্যস্ত। নারীরা সুতা কাটছেন। কেউ শানা বাঁধছেন, কেউ সুতা রঙ করছেন। কেউ বা শুকাচ্ছেন। এ ছাড়া তৈরিকৃত শাড়ির ওপর নান্দনিক শিল্পকর্ম, ব্লক, বর্ণিল সুতা ও চুমকির কাজও করা হচ্ছে। যেন কারও ফুরসত নেই। বিভিন্ন জেলার পাইকার ও কাপড় ব্যবসায়ীরা তাদের চাহিদার শাড়ি ও লুঙ্গির অর্ডার নিয়ে আসছেন। কেউবা অগ্রিম দিয়ে যাচ্ছেন। যেভাবেই হোক রোজার মধ্যেই তাদের পছন্দের ডিজাইনের শাড়ি লুঙ্গি চাই। তাই পাবনার বাজারে বাহারি ও নানা রঙের তাঁতের শাড়ি উঠতে শুরু করেছে।
বিদেশের বাজারেও পাবনার তাঁতের শাড়ির বেশ কদর। দেশের চাহিদা মিটিয়ে এসব শাড়ি আমেরিকা, কানাডা,
ভারত, শ্রীলংকা, মালদ্বীপসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রফতানি হচ্ছে। ঢাকার বুটিক হাউস কে-ক্রাফট তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে কানাডা ও আমেরিকা এবং নগরদোলা নামক বুটিক হাউস ইংল্যান্ডে পাবনার শাড়ি রফতানি করছে বলে তাঁত মালিকরা জানিয়েছেন। ভারতের দিলি্ল, বারাসাত, হুগলি, কলকাতা, শুভরাজ, গঙ্গা, রামপুর, পাটনাসহ অনেক বড় শহরে পাবনা শাড়ির ব্যাপক চাহিদা ও মার্কেট রয়েছে।

এবারের ঈদ মৌসুমে পাবনার তাঁতিরা কমপক্ষে দুইশ কোটি টাকার শাড়ি ও লুঙ্গি বিক্রির টার্গেট নিয়ে মাঠে নেমে দিনরাত কাজ করছেন। সরেজমিন দেখা গেছে, পাবনা সদর উপজেলার দোগাছি, ভাড়ারা, জালালপুর, নতুনপাড়া, গঙ্গারামপুর, বলরামপুর, মালঞ্চি, কুলুনিয়া, খন্দকারপাড়া, কারিগরপাড়া, সাঁথিয়া উপজেলার ছোন্দহ, ছেচানিয়া, জোড়গাছা, সনতলা, কাশিনাথপুর, বেড়া উপজেলার কৈটলা, পাটগাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকা তাঁতের খট খট শব্দে মুখরিত। দোগাছি ও ভাড়ারা এলাকার তাঁতিরা দেশি তাঁতের সঙ্গে অন্য উপকরণ দিয়ে নানা কারুকার্যখচিত অন্য শাড়িও তৈরি করছেন। এসব শাড়িকে আরও আকর্ষণীয় করতে ব্যবহার করছেন নানা নাম। বলিউড-ঢালিউড নায়িকাদের নামে শাড়ির নাম দেওয়া হয়েছে। কুলুনিয়া গ্রামের আন্নেস আলী তাঁতি সমকালকে বলেন, ‘সুতার দাম বাইরা যাওয়ায় মহাজন তাঁত বন্ধ করছিল। রোজার ঈদকে সামনে রেখে আবার তাঁত চালু করছে।’ তিনি জানান, এবারের ঈদে আগের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মালিক-শ্রমিক দিনরাত কাজ করছেন। পাবনা সদর উপজেলার দোগাছি এলাকার তাঁতমালিক বাদশা মিয়া জানান, ঈদকে সামনে রেখে ১১টি তাঁত চালু করেছি। তাঁতিরা খুশি। পাইকাররাও শাড়ি ও লুঙ্গির আগাম অর্ডার দিচ্ছেন।
বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম বোর্ড সূত্র জানায়, পাবনা জেলার দোগাছি, ভাড়ারা, জালালপুর, নতুনপাড়া, গঙ্গারামপুর, বলরামপুর, মালঞ্চি, কুলুনিয়া, খন্দকারপাড়া, কারিগরপাড়া, ছোন্দহ, ছেচানিয়া, জোড়গাছা, সনতলা, কাশিনাথপুর, বেড়া, কৈটলা, পাটগাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় ঈদকে সামনে রেখে প্রায় ৫০ হাজার তাঁত সচল হয়েছে। এতদিন এসব তাঁত বন্ধ ছিল। ঈদ তাঁতিদের জাগিয়ে তুলেছে।(ডেস্ক)