(দিনাজপুর২৪.কম) বাংলাদেশে আরো বেশি বিদ্যুৎ রপ্তানির পরিকল্পনা করেছে পশ্চিমবঙ্গ৷ যা উসকে দিয়েছে নতুন বিতর্ক৷ পশ্চিমবঙ্গে শিল্পক্ষেত্রে অচলাবস্থার জন্যই কি উদ্বৃত্ত থাকছে বিদ্যুৎ? বিদ্যুৎ বিক্রি করে কি যথেষ্ট আয় হবে ঋণগ্রস্ত রাজ্যটির?

প্রশ্ন হলো, অর্ধেক গ্লাস জলকে ঠিক কীভাবে দেখা হবে? অর্ধেক ভর্তি, না অর্ধেক খালি? পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যুৎ উদ্বৃত্তের বিষয়টিকে ঠিক এভাবেই দেখেন রাজ্যের অনেকে৷ কেউ বিষয়টিকে অহংকার এবং গর্বের বলে মনে করেন৷ কেউ আবার মনে করেন, শিল্পক্ষেত্রে অচলাবস্থাই আসলে বিদ্যুৎ উদ্বৃত্তের কারণ৷

খবর, পশ্চিমবঙ্গ পরিকল্পনা করেছে, তাদের উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করবে৷ এ নিয়ে ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে দরবার করেছে৷ বস্তুত, এখনও বাংলাদেশে প্রায় ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করে পশ্চিমবঙ্গ৷ সম্প্রতি এক সম্মেলনে বাংলাদেশকে আরও ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যুৎমন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়৷ তিনি বলেছেন, ‘‘ইতিমধ্যেই কেন্দ্রের কাছে এ বিষয়ে আর্জি জানিয়েছি আমরা৷ সব ঠিকঠাক চললে, দ্রুতই বাংলাদেশের কাছে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করা যাবে৷”

পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে মোট পাঁচটি কার্যকরী তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে৷ কোলাঘাট, বক্রেশ্বর, ব্যান্ডেল, সাগরদিঘি এবং সাঁওতালডিহি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে সব মিলিয়ে প্রায় ছ’হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়৷ এছাড়াও বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প শক্তি উৎপাদনের কেন্দ্র আছে৷ নিন্দকদের অভিযোগ, যথেষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও পশ্চিমবঙ্গে সেই বিদ্যুৎ খরচ করার উপায় নেই৷ কারণ, শিল্পক্ষেত্রে দেশের বাকি অংশের তুলনায় এখনো অনেকটাই পিছিয়ে পশ্চিমবঙ্গ৷ বাম আমলে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় শিল্পক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের মোটেই কোনো উন্নতি হয়নি৷ মমতার সরকার বারংবার বড় শিল্প আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও কার্যক্ষেত্রে তা সফল হয়নি৷ ফলে বিদ্যুৎ খরচ করার মতো পরিসরই তৈরি হয়নি৷

বাকি রাজ্যগুলোর ছবি কিন্তু অন্যরকম৷ সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত তো নয়-ই, বরং ঘাটতি রয়েছে৷ ঘাটতির পরিমাণ বছরে প্রায় ১ শতাংশের মতো৷ উত্তরপ্রদেশের মতো শিল্পবান্ধব রাজ্যে ঘাটতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৪ দশমিক ১ শতাংশের মতো৷ বড় শহরগুলির দিকে যদি চোখ রাখা যায়, দেখা যাবে, রাজধানী শহর দিল্লিতেও বাৎসরিক বিদ্যুৎ ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ০ দশমিক ৫ শতাংশ৷ সময় সময় তা আরও বৃদ্ধি পায়৷

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ছবিটি একেবারেই অন্যরকম৷ এবং সে কারণেই পার্শ্ববর্তী দেশে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে চাইছে পশ্চিমবঙ্গ৷ এ বিষয়ে ডয়চে ভেলের তরফ থেকে তৃণমূলের প্রবীণ নেতা নির্বেদ রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘‘যদি সত্যিই এমন সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তাহলে তাকে স্বাগত জানানো উচিত৷ এরফলে একদিকে পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক মুনাফা হবে, অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী রাজ্যটিরও উপকার হবে৷ বাংলাদেশ শুধু আমাদের প্রতিবেশী নয়, বৃহত্তর বঙ্গের অংশ৷ তাদের সঙ্গে বরাবরই আমাদের সম্পর্ক ভালো৷ এই পদক্ষেপ আরও একটি মাইলফলক হবে৷” তবে রাজনৈতিক প্রশ্ন এড়িয়ে যান তিনি৷ পশ্চিমবঙ্গের শিল্প পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে তিনি রাজি হননি৷

সিপিএমের পলিটব্যুরো সদস্য এবং সাংসদ মহম্মদ সেলিম স্বভাবতই কঠোর সমালোচনা করেছেন বিষয়টির৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেছেন, ‘‘একসময় বলা হতো পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যুৎ নেই বলে কারখানা হচ্ছে না৷ দীর্ঘদিন ধরে বামফ্রন্ট রাজ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছে৷ এবং সেই বিদ্যুৎ থেকে যাতে নতুন কারখানা তৈরি করা যায়, তার চেষ্টাও করেছিল৷ কিন্তু বর্তমান সরকার শিল্প নিয়ে যে কোনো নীতিই গ্রহণ করতে পারেনি, এটাই তার প্রমাণ৷ বলা হচ্ছে, লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা নাকি শিল্পক্ষেত্রে বিনিয়োগ হচ্ছে৷ আসলে যে হচ্ছে না, বিদ্যুৎ বিক্রির পরিকল্পনাই তার প্রমাণ৷ এর ফলে রাজ্যের আরও ক্ষতি হবে৷”

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত বছর বেঙ্গল সামিটে ২ লক্ষ ৩৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছিল বলে জানিয়েছিল রাজ্য সরকার৷ তার আগের বছরের হিসেব ছিল ২ লক্ষ ৫০ হাজার৷ এ বছর বেঙ্গল সামিটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী জানান, গতবছরের বিনিয়োগের ৫০ শতাংশের কাজ চলছে৷ কিন্তু সমালোচকরা বলেন, কোথায় চলছে, কীভাবে চলছে, কারা বিনিয়োগ করছে, তার কোনো কিছুই স্পষ্ট নয়৷ পশ্চিমবঙ্গে ২ লক্ষ ৫০ কোটি টাকা শিল্পখাতে বিনিয়োগ হলে রাজ্যের চেহারাই বদলে যেতো৷ যেমন বদলানোর কথা ছিল সিঙ্গুরে ১০০০ একর জমির ওপর টাটার কারখানা তৈরি হলে কিংবা ৪০০০ একর জমির ওপর জিন্দালদের সম্পূর্ণ কারখানা তৈরি হলে৷

কিন্তু বাস্তবে টাটা’রা ফিরে গেছে৷ জিন্দালদের কারখানাও সেভাবে গড়ে ওঠেনি৷ একটি ছোট সিমেন্ট কারখানা তৈরি হয়েছে মাত্র৷সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগের কথা রাজ্য সরকার বলছে, বাস্তবে তার কোনো চিহ্ন এখনো পর্যন্ত দেখা যায়নি৷ এবং সত্যিই যদি সেই বিনিয়োগ হতো তাহলে ১২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভাবতেই পারত না রাজ্য সরকার৷ প্রমাণস্বরূপ তাঁরা দেশের অন্যান্য শিল্পসমৃদ্ধ রাজ্যগুলির উদাহরণ দিচ্ছেন৷ প্রভূত পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করেও সেই রাজ্যগুলোতে শিল্পের কারণে বিদ্যুতের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে৷ উত্তরপ্রদেশ যার অন্যতম উদাহরণ৷

কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ইন্দ্রজিৎ রায় অবশ্য বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখার চেষ্টা করছেন৷ তাঁর মতে, বিদ্যুৎ তৈরি করে তা বিক্রি করে রাজ্য সরকার আর্থিক মুনাফার কথা ভাবতেই পারে৷ যদিও অন্য রাষ্ট্রকে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে হলে কেন্দ্রীয় সরকারের শিলমোহর দরকার৷ অর্থাৎ, বিষয়টি কেবলমাত্র আর রাজ্যের হাতে থাকে না, কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ বিষয় হয়ে যায়৷ তবে বিক্রির আগে বুঝে নেওয়া দরকার, পশ্চিমবঙ্গের উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সাময়িক নাকি, দীর্ঘমেয়াদী৷ সাময়িক হলে বাংলাদেশের সঙ্গে এত বড় কমিটমেন্টে গেলে ভুল হবে৷ আর যদি দীর্ঘমেয়াদী হয়, তাহলে বুঝতে হবে আগামী বহুদিনের মধ্যে বড় শিল্পের কোনো পরিকল্পনা নেই পশ্চিমবঙ্গের৷ রাজ্যের মন্ত্রীদের কথা শুনলে তা মনে হয় না৷ ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মুখের কথা নয়৷ এত বিদ্যুৎ দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গ সত্যিই দিতে পারবে কি না, তা বুঝে নেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি৷

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দীপঙ্কর দাশগুপ্তের মতে, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ একটি ঋণগ্রস্ত রাজ্য৷ গত কয়েক দশকে বিপুল পরিমাণ ধার জমেছে৷ ফলে বিদ্যুৎ বিক্রি করে যদি কিছু অর্থ ঢোকে কোষাগারে, তাতে অন্যায়ের কিছু নেই৷ কিন্তু এ ঘটনা প্রমাণ করে, অদূর ভবিষ্যতে এ রাজ্যে শিল্পের কোনো সম্ভাবনা নেই৷ সরকার তা বুঝে গিয়েছে৷ সে জন্যই বিকল্প মুনাফার ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা চলছে৷ যদি তা-ই হয়, তাহলে রাজ্যের মানুষকে স্বপ্ন দেখানো হয় কেন?

সাম্প্রতিকতম শিল্প বিষয়ক বেঙ্গল সামিটে সরকার ঘোষণা করেছে, রাজ্যে নাকি ১ দশমিক ৯ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে৷ সত্যিই যদি তা আসতো, তাহলে বিদ্যুৎ বিক্রির কথা কল্পনাও করা যেতো না৷ উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ শিল্পখাতে প্রয়োজন হতো৷” দীপঙ্কর দাশগুপ্তের মতে, বাম আমলের শেষ পর্যায়ে রাজ্যে শিল্প তৈরির কিছু প্রয়াস দেখা গিয়েছিল৷ কিন্তু বর্তমান সরকার শিল্পবান্ধব ভাবমূর্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করলেও বাস্তবে তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন নেই৷ বিদ্যুৎ বিক্রি করা তাই একরকম লজ্জার দৃষ্টান্তই বটে৷

রাজ্য সরকার ঘনিষ্ঠ অর্থনীতিবিদেরা অবশ্য অর্ধেক পূর্ণ গ্লাসের দিকেই তাকাতে চাইছেন৷ তাঁরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প৷ একসময় পশ্চিমবঙ্গে প্রবল বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল৷ ক্রমশ সেই ঘাটতি কমানো সম্ভব হয়েছে৷ বিদ্যুৎ উৎপাদন শিল্পে পশ্চিমবঙ্গ এখন ভারতের অন্যতম রাজ্য৷ প্রতিবেশী দেশকে সেই বিদ্যুৎ বিক্রি করা অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ৷ বিতর্ক ছিল, আছে, থাকবে৷ এখন দেখার, পশ্চিমবঙ্গ শেষপর্যন্ত ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশকে বিক্রি করার ছাড়পত্র পায় কিনা৷ সবই এখন নির্ভর করছে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির উপর৷ -ডেস্ক