পদ্মা সেতুর অসমাপ্ত কাজ বিবেচনায় এনে মনে হচ্ছে প্রকল্পের কাজ পূর্বনির্ধারিত সময়ে শেষ হবে না। পুরোনো ছবি

(দিনাজপুর২৪.কম) সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকার প্রকল্প পদ্মা সেতু নির্মাণে মেয়াদ বাড়ছে। প্রকল্প কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান কাজের অগ্রগতি এবং অসমাপ্ত কাজ বিবেচনায় এনে মনে হচ্ছে প্রকল্পের কাজ পূর্বনির্ধারিত সময়ে শেষ হবে না। চলমান মহামারী করোনাসহ একাধিক যুক্তি দেখিয়ে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে। নতুন প্রস্তাবে লায়াবিলিটি পিরিয়ডসহ ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ ধরা হয়েছে। সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের মাধ্যমে প্রস্তাবটি অনুমোদন দেবে ভৌত অবকাঠামো বিভাগ।

সেতু বিভাগের সচিব বেলায়েত হোসেন এ বিষয়ে বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়াতে হচ্ছে। তবে ব্যয় বাড়বে না। এ জন্য প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে।

প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, এ প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি ৮৩ শতাংশ। কাজ শেষ করতে আবার সময় বাড়াতে হচ্ছে। প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রকল্পের সর্বশেষ মেয়াদ ধরা হয় চলতি বছরের জুন পর্যন্ত। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে শেষ হবে না কাজ। সেতুর নির্মাণকাজে ব্যাঘাত ঘটেছে চলমান করোনায়। ২০২০ সালের মার্চ থেকে শুরু হওয়া এ মহামারীর কারণে প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হয়েছে। পদ্মা সেতুর কাজে নিয়োজিত বিদেশি পরামর্শক এবং চীনা ঠিকাদারের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক লোক এখনো সাইটে ফিরতে পারেননি। এ ছাড়া যারা প্রকল্পের সাইটে অবস্থান করছেন, তাদের মধ্যেও রয়েছে কোভিড-ভীতি। এর ফলে কাজের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তা ছাড়া প্রবল ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যার প্রভাবে পদ্মা নদীর পানির উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ে। তীব্র স্রোতের কারণে মাওয়া কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে ভাঙন ধরে। এতে পদ্মা সেতুর ১২৫টি রোডওয়ে সø্যাব এবং ১৯২টি রেলওয়ে সø্যাব স্ট্রিনজার নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এ ছাড়া কোভিড ১৯-এর কারণে প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত দক্ষ জনবল, বিশেষ করে বেশ কয়েকজন বিদেশি বিশেষজ্ঞ কাজে যোগদান না দেওয়ায় প্রকল্পের অগ্রগতি কাক্সিক্ষত মাত্রায় অর্জন করা সম্ভব হয়নি বলে মনে করছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

নির্মাণকাজের মেয়াদ বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে আরও বলা হয়েছে- চলমান কাজের অগ্রগতি বিবেচনায় মূল সেতু ও নদীশাসন কাজসহ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ধরা হয়েছে। আর দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী রক্ষণাবেক্ষণ কাজ ও ঠিকাদারের দেনা-পাওনা মিটিয়ে দিতে আরও এক বছর ধরা হয়েছে। সে হিসাবে মেয়াদ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত।

১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের মেয়াদ প্রথমে ধরা হয় ২০১৫ সালের জুনে। এর পর ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২১ সাল পর্যন্ত ধরা হয়। এখন ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রকল্পের বর্তমান ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৮ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২৪ হাজার ২৮৯ কোটি ২৬ লাখ ২২ হাজার টাকা।

সূত্র জানায়, পদ্মার মূল সেতু হচ্ছে বেশ কয়েকটি প্যাকেজে। মূল সেতুর ঠিকাদারের নাম চায়না মেজর ব্রিজ। ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৮ সালের ২৫ নভেম্বর চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ করার কথা। এর পর মেয়াদ বাড়িয়ে এ বছরের জুন পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। তাতেও কাজ শেষ করতে পারবে না বলে জানিয়েছি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। মূল সেতুতে মোট ৪১টি স্প্যানের সব কয়টি বসানো হয়েছে। সেতুতে রোডওয়ে সø্যাব ২ হাজার ৯১৭টির মধ্যে স্থাপিত হয়েছে ১ হাজার ৪৮২টি। রেলওয়ে সø্যাব ২ হাজার ৯৫৯টির মধ্যে ২ হাজার ৮২টি বসেছে। এ ছাড়া সুপার-টি গার্ডার ৪৩৮টির মধ্যে বসেছে ৩৪৪টি। প্রকল্পের নদীশাসন কাজ করছে সিনো হাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর এর কাজ শুরু হয়। বর্ধিত সময়সহ এ বছরের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা। এ কাজের বাস্তব অগ্রগতি ৭৮ শতাংশ।

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বহুমুখী সেতুর মূল আকৃতি হবে দোতলা। কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মিত হচ্ছে পদ্মা সেতুর কাঠামো। সেতুর ওপরের অংশে যানবাহন ও নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। পদ্মা সেতুর জন্য অপেক্ষা প্রায় দুই যুগের। ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই দিয়ে এই অপেক্ষার শুরু। এর মাঝখানে অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকসহ দাতাদের সঙ্গে জটিলতা স্বপ্নের সেতুর ভবিষ্যতই শঙ্কায় পড়ে যায়। এর মধ্যে সরকার বিশ্বব্যাংকের ঋণ না নিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। নকশা জটিলতার কারণে এক বছর পিছিয়ে যায়। ২২টি খুঁটির নিচে নরম মাটি পাওয়া যায়। শুরুতে প্রতিটি খুঁটির নিচে ছয়টি করে পাইল (মাটির গভীরে স্টিলের ভিত্তি বসানো) বসানোর পরিকল্পনা ছিল। যুক্তরাজ্যের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নকশা সংশোধন করে একটি করে পাইল বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেয়। এ জন্য খুঁটি নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হতে গত বছরের মার্চ পর্যন্ত লেগে যায়। সব মিলিয়ে এই কাজে প্রায় এক বছর বাড়তি লাগে। এ জন্য মাঝে কাজে কিছুটা গতি হারায়। ঠিকাদারকে ২ বছর ৮ মাস বাড়তি সময় দেওয়া হয়।

মূল সেতু ও নদীশাসনের কাজ শুরুর পর নানা চ্যালেঞ্জ এসেছে। কখনো পদ্মার ভাঙন, আবার কখনো কারিগরি জটিলতায় কাজ আটকে গেছে। ফেরিঘাট স্থানান্তরেও সময়ক্ষেপণ হয়। কিন্তু কাজ থেমে থাকেনি। তা ছাড়া করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি এবং বন্যার অত্যধিক স্রোত পদ্মা সেতুর কাজে কিছুটা গতি কমিয়ে দিয়েছিল। করোনা ও বন্যা পরিস্থিতির ধকল কাটিয়ে গত ১১ অক্টোবর ৩২তম স্প্যান বসানোর পর অনুকূল আবহাওয়া পাওয়া যায়। কারিগরি কোনো জটিলতা তৈরি হয়নি। ফলে টানা বাকি স্প্যানগুলো বসানো সম্ভব হয়।

২০০১ সালের ৪ জুলাই পদ্মা সেতু নির্মাণে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিস্তারিত সমীক্ষার পর ২০০৪ সালে মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতু নির্মাণের পরামর্শ দেয় জাপানের দাতা সংস্থা জাইকা। ২০০৭ সালে একনেকে পাস হওয়া পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় ছিল ১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। ২০১১ সালে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে দ্বিতীয় দফা সংশোধনের পর ব্যয় দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। এর পর প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন না করে ২০১৮ সালের জুনে আবার ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। -ডেস্ক